৩৬/২. অধ্যায়ঃ
জামে‘ আত-তিরমিযী হাদিস ২৫২৬ - তিন কবুল দোয়া, তাওবা ও জান্নাতের নেয়ামত
জান্নাত ও এর উপকরণাদির বর্ণনা
তিন ব্যক্তির দোয়া ও জান্নাতের বর্ণনা: দীর্ঘ হাদিসের মূল শিক্ষা
জামে‘ আত-তিরমিযী : ২৫২৬
জামে‘ আত-তিরমিযীহাদিস নম্বর ২৫২৬
حَدَّثَنَا أَبُو كُرَيْبٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ فُضَيْلٍ، عَنْ حَمْزَةَ الزَّيَّاتِ، عَنْ زِيَادٍ الطَّائِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا لَنَا إِذَا كُنَّا عِنْدَكَ رَقَّتْ قُلُوبُنَا وَزَهِدْنَا فِي الدُّنْيَا وَكُنَّا مِنْ أَهْلِ الآخِرَةِ فَإِذَا خَرَجْنَا مِنْ عِنْدِكَ فَآنَسْنَا أَهَالِيَنَا وَشَمَمْنَا أَوْلاَدَنَا أَنْكَرْنَا أَنْفُسَنَا . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ «لَوْ أَنَّكُمْ تَكُونُونَ إِذَا خَرَجْتُمْ مِنْ عِنْدِي كُنْتُمْ عَلَى حَالِكُمْ ذَلِكَ لَزَارَتْكُمُ الْمَلاَئِكَةُ فِي بُيُوتِكُمْ وَلَوْ لَمْ تُذْنِبُوا لَجَاءَ اللَّهُ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ كَىْ يُذْنِبُوا فَيَغْفِرَ لَهُمْ». قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مِمَّ خُلِقَ الْخَلْقُ قَالَ «مِنَ الْمَاءِ». قُلْنَا الْجَنَّةُ مَا بِنَاؤُهَا قَالَ «لَبِنَةٌ مِنْ فِضَّةٍ وَلَبِنَةٌ مِنْ ذَهَبٍ وَمِلاَطُهَا الْمِسْكُ الأَذْفَرُ وَحَصْبَاؤُهَا اللُّؤْلُؤُ وَالْيَاقُوتُ وَتُرْبَتُهَا الزَّعْفَرَانُ مَنْ يَدْخُلْهَا يَنْعَمْ وَلاَ يَبْأَسْ وَيُخَلَّدْ وَلاَ يَمُوتْ لاَ تَبْلَى ثِيَابُهُمْ وَلاَ يَفْنَى شَبَابُهُمْ " . ثُمَّ قَالَ «ثَلاَثَةٌ لاَ تُرَدُّ دَعْوَتُهُمُ الإِمَامُ الْعَادِلُ وَالصَّائِمُ حِينَ يُفْطِرُ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا فَوْقَ الْغَمَامِ وَتُفَتَّحُ لَهَا أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَيَقُولُ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ وَعِزَّتِي لأَنْصُرَنَّكِ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ».قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ لَيْسَ إِسْنَادُهُ بِذَاكَ الْقَوِيِّ وَلَيْسَ هُوَ عِنْدِي بِمُتَّصِلٍ وَقَدْ رُوِيَ هَذَا الْحَدِيثُ بِإِسْنَادٍ آخَرَ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ .
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আমরা বললামঃ হে আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ)! আমাদের কি হলো যে, আমরা আপনার নিকট থাকাবস্থায় আমাদের অন্তর খুবই নরম হয়ে যায়, আমরা দুনিয়ার প্রতি উদাসীন হয়ে যাই এবং আমাদেরকে পরকালবাসীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করতে থাকি। তারপর আপনার কাছ থেকে সরে গিয়ে পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে গিয়ে দুনিয়াবী কাজে জড়িয়ে পড়ি এবং সন্তানাদির সুগন্ধ পেতে থাকি, তখন আমাদের অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে যায়।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমরা যে অবস্থায় আমার নিকট হতে বেরিয়ে যাও, সবসময় যদি সেই অবস্থায় থাকতে তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের বাড়িতে গিয়ে তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতো। আর তোমরা অপরাধ না করলে আল্লাহ্ তা‘আলা নতুন প্রাণী সৃষ্টি করতেন। যাতে তারা অপরাধ করে আর তিনি তাদেরকে ক্ষমা করেন।আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলামঃ হে আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ)! কী দিয়ে প্রাণী সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি বললেনঃ পানি দিয়ে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, কী দিয়ে জান্নাত তৈরি করা হয়েছে? তিনি বললেনঃ সোনা-রুপার ইট দিয়ে। একটি রুপার ইট, তারপর একটি সোনার ইট, এভাবে গাঁথা হয়েছে। এর গাঁথুনির উপকরণ (চুন-সুরকি-সিমেন্ট) সুগন্ধি মৃগনাভি এবং কঙ্করসমূহ মণি-মুক্তার ও মাটি হলো জাফরান। জান্নাতে প্রবেশকারী লোক অত্যন্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, কোন দুঃখ-কষ্ট ও অভাব-অনটন তাকে স্পর্শ করবে না। সে অনন্তকাল এতে অবস্থান করবে আর মৃত্যুবরণ করবে না। না তার পরনের পোশাক পুরাতন হবে আর না তার যৌবনকাল শেষ হবে (অনন্তযৌবনা হবে)।তিনি পুনরায় বললেনঃ তিনজনের দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় নাঃ ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া, রোযাদারের ইফতারের সময়কালীন দোয়া এবং মাযলুমের দোয়া। আল্লাহ্ তা'আলা একে (মাযলুমের দোয়া) মেঘমালার উপর তুলে নেন, তার জন্য আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ আমার ইজ্জত ও সম্মানের শপথ! কিছু দেরিতে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করবো।
আবূ 'ঈসা (রহঃ) বলেন, এই হাদীসের সনদ খুব একটা মজবুত নয়। আর আমার মতে এর সনদসূত্র মুত্তাসিল (পরস্পর সংযুক্ত) নয়। এই হাদীসটি অন্য সনদেও আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ)-এর সূত্রে নাবী (ﷺ) হতে বর্ণিত হয়েছে। "কী দিয়ে প্রাণী সৃষ্টি করা হয়েছে" অংশটুকু ব্যতীত হাদীসটি সহীহ, সহীহাহ (২/৬৯২-৬৯৩), গাইয়াতুল মারাম (৩৭৩)।
জামে‘ আত-তিরমিযী হাদিস ২৫২৬-এর সারসংক্ষেপ
এই দীর্ঘ হাদিসে কয়েকটি আলাদা শিক্ষা একসঙ্গে এসেছে। সাহাবিরা জানান, নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর কাছে থাকলে তাদের অন্তর নরম হতো এবং আখিরাতের ভাব বাড়ত, কিন্তু পরিবার ও দুনিয়ার কাজে ফিরলে অবস্থার পরিবর্তন হতো। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বোঝান, মানুষ সব সময় একই আধ্যাত্মিক অবস্থায় থাকে না। তিনি গুনাহ ও আল্লাহর ক্ষমার কথাও বলেন। এরপর জান্নাতের নির্মাণের বর্ণনা এসেছে—সোনা ও রুপার ইট, কস্তুরীর গাঁথুনি, মুক্তা-ইয়াকুতের কঙ্কর এবং জাফরানের মাটি। জান্নাতিরা সেখানে সুখে থাকবে, মৃত্যু হবে না, পোশাক পুরোনো হবে না এবং যৌবন শেষ হবে না। শেষে তিন ব্যক্তির দোয়ার কথা বলা হয়েছে: ন্যায়পরায়ণ শাসক, ইফতারের সময় রোজাদার এবং মজলুম। বিশেষভাবে মজলুমের দোয়া ও আল্লাহর সাহায্যের প্রতিশ্রুতি উল্লেখ হয়েছে।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- মানুষের অন্তরের অবস্থা পরিবেশ ও ব্যস্ততার কারণে বদলাতে পারে।
- গুনাহের পর আল্লাহর ক্ষমার আশা রাখা উচিত।
- জান্নাতে দুঃখ, মৃত্যু, পোশাকের পুরোনো হওয়া ও যৌবনের শেষ থাকবে না।
- ন্যায়পরায়ণ শাসক, ইফতারের সময় রোজাদার ও মজলুমের দোয়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
