১৩/১. অধ্যায়ঃ
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ سُئِلَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ الْجَنَّةَ فَقَالَ تَقْوَى اللهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ وَسُئِلَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ فَقَالَ الْفَمُ وَالْفَرْجُ-
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে? তিনি বলেন, তা হচ্ছে- আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র। আর জিজ্ঞেস করা হল, মানুষকে কোন জিনিস সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করাবে? তিনি বললেন, তা হচ্ছে- মুখ বা জিহ্বা ও অপরটি লজ্জাস্থান’
(তিরমিযী, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৬২১, হাদীস সহীহ)। অত্র হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, মানুষকে জাহান্নামে প্রবেশ করানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে জিহ্বা। কারণ জিহ্বা দ্বারা মানুষ সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করতে পারে। এর কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমাজে বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, অরাজকতা ও নৈরাজ্য নেমে আসে। এজন্য জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করা যরূরী।
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ مَنْ يَضْمَنْ لِيْ مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ-
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কাছে (এই অঙ্গীকার করবে যে, সে) তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত বস্তুর এবং তার দু’পায়ের মধ্যস্থিত বস্তুর যিম্মাদার হবে তবে আমি তার জন্য জান্নাতের যিম্মাদার হব’
(বুখারী, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৬০১)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের হেফাযত করবে, রাসূল (ﷺ) তার জন্য জান্নাতের যিম্মাদার হবেন। কারণ লজ্জাস্থান হচ্ছে সমাজে অশ্লীলতা বিস্তারের মাধ্যম। এর কারণে মানুষ অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়। এসব থেকে বেঁচে থাকার জন্য লজ্জাস্থানের হেফাযত করা আবশ্যক।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ تَجِدُوْنَ شَرَّ النَّاسِ ذَا الْوَجْهَيْنِ الَّذِيْ يَأْتِيْ هَؤُلاَءِ بِوَجْهٍ وَيَأْتِيْ هَؤُلاَءِ بِوَجْهٍ-
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা কিয়ামতের দিন সর্বাপেক্ষা মন্দ লোক ঐ ব্যক্তিকে পাবে, যে দ্বিমুখী। সে এক মুখ নিয়ে এদের কাছে আসে এবং আরেক মুখ নিয়ে তাদের কাছে যায়’
(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৮২২; বাংলা মিশকাত ৯ম খণ্ড, হা/৪৬১১)। অত্র হাদীস দু’টি হতে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের জিহ্বা ও লজ্জাস্থান কবীরা গুনাহ সমূহের উৎস। কেননা মানুষ মুখ দ্বারা মিথ্যাচার, গালমন্দ, চোগলখুরী, ধোঁকাবাজি, গীবত-তোহমত, অভিসম্পাত প্রভৃতি কবীরা গুনাহ করে থাকে। কিন্তু মানুষ এসব পাপ থেকে সাবধান হওয়ার ন্যূনতম চেষ্টা করে না। এগুলি থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের জিহ্বাকে সংবরণ করা অত্যাবশ্যক। কেননা এগুলির ব্যাপারে কঠিন হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘চোগলখোর ও খোটাদানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (বুখারী, মুসলিম, বাংলা মিশকাত হা/৪৬১২)।
عَنْ أَبِيْ الدَّرْدَاءِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ يَقُوْلُ إِنَّ اللَّعَّانِيْنَ لاَ يَكُونُوْنَ شُهَدَاءَ وَلاَ شُفَعَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ-
রাসূল (ﷺ)-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয়ই অভিশাপকারী কখনো কেয়ামতের মাঠে সাক্ষী ও সুপারিশকারী হতে পারবে না’
(মুসলিম, মিশকাত হা/৪৮২০; বাংলা মিশকাত ৯ম খণ্ড, হা/৪৬০৯)।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللهِ لَا يُلْقِيْ لَهَا بَالاً يَرْفَعُهُ اللهُ بِهَا دَرَجَاتٍ وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَهْوِيْ بِهَا فِيْ جَهَنَّمَ، وَفِيْ رِوَايَةٍ لَهُمَا يَهْوِيْ بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ-
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই বান্দা কখনও এমন কথা বলে যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি বিদ্যমান। অথচ সে তার গুরুত্ব জানে না। আল্লাহ এর দ্বারা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। পক্ষান্তরে বান্দা এমন কথা বলে, যাতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি বিদ্যমান। অথচ সে তার অনিষ্ট সম্পর্কে অবগত নয়। আর এ কথাই তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে। বুখারী ও মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, এই কথাই তাকে জাহান্নামের এত গভীরে পৌঁছে দেয়, যার পরিধি পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্ব পরিমাণ’
(বুখারী, মিশকাত হা/৪৮১৩; বাংলা মিশকাত ৯ম খণ্ড, হা/৪৬০২ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়)। উল্লিখিত হাদীস সমূহ দ্বারা বুঝা যায় যে, মানুষের যবান সাংঘাতিক জিনিস, যা মানুষকে জান্নাতের উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়, আবার জাহান্নামের গভীর গহ্বরেও নিক্ষেপ করে।
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِنَّ الصِّدْقَ بِرٌّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِيْ إِلَى الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ صِدِّيقًا وَإِنَّ الْكَذِبَ فُجُورٌ وَإِنَّ الْفُجُوْرَ يَهْدِيْ إِلَى النَّارِ وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ كَذَّابًا-
তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সত্যবাদিতা একটি পুণ্যময় কাজ। আর পুণ্য জান্নাতের পথ দেখায়। যে ব্যক্তি সর্বদা সত্যের উপর দৃঢ় থাকে তাকে আল্লাহর খাতায় সত্যনিষ্ঠ বলে লিখে নেয়া হয়। পক্ষান্তরে মিথ্যা হচ্ছে পাপকাজ। পাপাচার জাহান্নামের পথ দেখায়। যে ব্যক্তি সদা মিথ্যা কথা বলে এবং মিথ্যায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাকে আল্লাহর খাতায় মিথ্যুক বলে লিখে নেয়া হয়’
(বুখারী, মুসলিম, বাংলা মিশকাত ৯ম খণ্ড হা/৪৬১৩)। তাই আমাদের সকলের উচিত কথা বলার পূর্বে চিন্তা-ভাবনা করে বলা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিপূর্ণ কথা বলার চেষ্টা করা। যাতে আল্লাহর অসন্তোষ রয়েছে, সেসব কথা বলা থেকে বিরত থাকা। অনুরূপভাবে সত্য বলার চেষ্টা করা এবং মিথ্যা বলা থেকে বেঁচে থাকা। সেই সাথে আল্লাহর যিকরে মশগূল থাকা।আল্লাহর বাণী ‘নিশ্চয়ই যে সকল নারী-পুরুষ বেশী বেশী আল্লাহকে স্মরণ করে আল্লাহ তাদের জন্য মাগফিরাত ও মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন’ (আহযাব ৩৫)।
عَنْ حُذَيْفَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ
আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, ‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না’
(মুত্তাফাক্ব আলাইহ, বাংলা মিশকাত হা/৪৬১২)।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قِيْلَ يَا رَسُوْلَ اللهِ مَا الْغِيْبَةُ قَالَ ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ قَالَ أَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِيْهِ مَا أَقُوْلُ قَالَ إِنْ كَانَ فِيْهِ مَا تَقُوْلُ فَقَدْ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيْهِ مَا تَقُوْلُ فَقَدْ بَهَتَّهُ-
তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জান গীবত কি’? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক জানেন। তিনি বললেন, ‘তোমার কোন ভাই সম্পর্কে এমন কথা বল, যা সে অপসন্দ করে’। জিজ্ঞেস করা হল, আমি যা বলি যদি তা আমার ভাইয়ের মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তাহলে আপনার কি অভিমত? তখন তিনি বললেন, ‘তুমি যা বল তার মধ্যে তা থাকলে তুমি তার গীবত করলে। আর যদি তার মধ্যে তা না থাকে যা তুমি বল, তখন তুমি তার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করলে’ (মুসলিম, বাংলা মিশকাত হা/৪৬১৭)।
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِنَّ شَرَّ النَّاسِ عِنْدَ اللهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ تَرَكَهُ النَّاسُ اتِّقَاءَ شَرِّهِ، وفي رواية إتِّقَاءَ فَحْشِهِ-
তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট মর্যাদায় সেই ব্যক্তিই মন্দ বলে সাব্যস্ত হবে, যার অনিষ্টের ভয়ে লোকেরা তাকে ত্যাগ করেছে’। অপর এক বর্ণনায় আছে, ‘যার অশ্লীলতার ভয়ে লোকেরা তাকে পরিত্যাগ করেছে’
(বুখারী, মুসলিম, বাংলা মিশকাত হা/৪৬১৮)।
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ مَا النَّجَاةُ قَالَ أَمْسِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ-
একদা আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, নাজাতের উপায় কি? তিনি বললেন, ‘নিজের জিহ্বা আয়ত্তে রাখ, নিজের ঘরে পড়ে থাক এবং নিজের পাপের জন্য রোদন কর’
(আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৪৮৩৭; বাংলা মিশকাত হা/৪৬২৬, সনদ হাসান)।