৬৪/৩১. অধ্যায়ঃ
সহীহ বুখারী হাদিস ৪১১৯ - বনু কুরাইযায় আসর পড়ার নির্দেশ
আহযাব নবী (ﷺ)-এর প্রত্যাবর্তন এবং তাঁর বনু কুরাইযাহ অভিযান ও তাদের অবরোধ
বনু কুরাইযায় আসর সালাত: ভিন্ন বোঝাপড়া ও নবী صلى الله عليه وسلم-এর নীরব অনুমোদন
সহীহ বুখারী : ৪১১৯
সহীহ বুখারীহাদিস নম্বর ৪১১৯
عَبْدُ اللهِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ أَسْمَاءَ حَدَّثَنَا جُوَيْرِيَةُ بْنُ أَسْمَاءَ عَنْ نَافِعٍ عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ النَّبِيُّ ﷺ يَوْمَ الْأَحْزَابِ لَا يُصَلِّيَنَّ أَحَدٌ الْعَصْرَ إِلَّا فِيْ بَنِيْ قُرَيْظَةَ فَأَدْرَكَ بَعْضُهُمْ الْعَصْرَ فِي الطَّرِيْقِ فَقَالَ بَعْضُهُمْ لَا نُصَلِّيْ حَتَّى نَأْتِيَهَا وَقَالَ بَعْضُهُمْ بَلْ نُصَلِّيْ لَمْ يُرِدْ مِنَّا ذَلِكَ فَذُكِرَ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ ﷺ فَلَمْ يُعَنِّفْ وَاحِدًا مِنْهُمْ
ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) আহযাব যুদ্ধের দিন (যুদ্ধ শেষে) বললেন, বনূ কুরাইযায় না পৌছে কেউ আসরের সালাত আদায় করবে না। [৩৮] তাদের একাংশের পথিমধ্যে আসরের সালাতের সময় হয়ে গেলে কেউ কেউ বললেন, আমরা সেখানে পৌছার আগে সালাত আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমরা এখনই সালাত আদায় করব, সময় হলেও রাস্তায় সালাত আদায় করা যাবে না উদ্দেশ্য তা নয়। বিষয়টি নবী (ﷺ)-এর কাছে বলা হলে তিনি তাদের কোন দলের প্রতি অসন্তুষ্টি ব্যক্ত করেননি।
[৩৮]বনূ কুরাইযাহ্র বিশ্বাসঘাতকতার কারণে আহযাব যুদ্ধের দিন যুদ্ধ শেষে নাবী (ﷺ)-এর নির্দেশ মতে মুসলিম বাহিনী বনূ কুরাইযা রওয়ানা হন। নাবী (ﷺ) বনূ কুরাইযাহ্কে তাদের কৃতকর্মের কারণ দর্শানোর জন্য ডেকে পাঠান। কিন্তু নবূ করাইযা তখন দূর্গদ্বার বন্ধ করে দেয় এবং যুদ্ধের পুরোপুরি প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এ সময় মুসলিমগণ জানতে পারেন যে, বনূ নাযীরের নেতা হুইয়াই ইবনু আখতাব যে বনূ কুরাইযাহ্কে মুসলিমদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে এসেছিল সেও দূর্গের মধ্যে বিদ্যমান। বনূ কুরাইযাহ্র বিশ্বাসঘাতকতার এটাই প্রথম ঘটনা ছিল না। বাদ্র যুদ্ধেও এরা কুরায়শদেরকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করলেও রসুলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তারা দূর্গা বন্ধ করে দেয়ায় বাধ্য হয়ে মুসলমানদের যুদ্ধ করতে হয়েছে। যিলহাজ্জ মাসে তাদের দূর্গ অবরোধ করা হয়েছিল যা পঁচিশ দিন স্থায়ী ছিল। এ অবরোধের ফলে তারা কঠিন সংকটে পতিত হয়। ফলে তারা রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সম্মত করে নিল, তাউস গোত্রের সা’আদ ইবনু মু’আযাকে বিচারক বানিয়ে দেয়া হোক। এবং তিনি যে মীমাংসা দিবেন সেটাকে রসূলুল্লাহ (ﷺ)-ও মেনে নিবেন। হয়ত তারা এটা ভেবেছিল যে, যেহেতু তাউস গোত্রের মুসলমানদের সাথে তাদের পূর্বে বন্ধুত্ব ছিল তাই তারা মনে করলো যে, নিশ্চয়ই তারা তাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অপেক্ষা হালকা শাস্তি দিবে। আল্লাহই ভাল জানেন। কিন্তু সব দিক বিচার বিশ্লেষণ করে তিনি যে ফায়সালা দিলেন তা হলোঃ(১) বনূ কুরাইযাহ্র পুরুষ যোদ্ধাদের হত্যা করা হবে।(২) মহিলা ও শিশুদের দাস-দাসী বানিয়ে নেয়া হবে।(৩) ধন-সম্পদ বন্টন করে নেয়া হবে। কিন্তু আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) যে বর্ণনা করেছেন তাতে তাদের মহিলা ও শিশুদেরকে দাস দাসী বানিয়ে নেয়ার কথা উল্লেখ নেই। তাদের নিজেদের মনোনীত ও নির্বাচিত বিচারক ঠিক ঐ ফায়সালাই দিলেন যা ইয়াহূদীরা তাদের শত্রুদেরকে দিয়ে থাকতো, যা তাদের শরী’আতে আছে। (উর্দু তরজুমা কাদীম হিন্দুস্তান কী তাহযীব) এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান আছে যে, যদি বনূ কুরাইযা তাদের ব্যাপারটা রসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর অর্পণ করতো তাহলে তাদের তিনি বড়জোর এ শাস্তি দিতেন যে, তাদেরকে বলতেনঃ “যাও তোমরা খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন কর।“ যেমনটি করেছিলেন বনূ কাইনুক ও বনূ নাযীরের ব্যাপারে। কেননা এরূপ ফায়সালার পরও রসূলুল্লাহ (ﷺ) বনূ কুরায়যার কয়েকজনের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ভিন্ন ফায়সালা কার্যকর করেছিলেন। যেমন ইয়াহূদী যুবায়রের জন্য নির্দেশ ছিল যে, তার স্ত্রী-পুত্র, পরিবার ও ধনমাল সহ মুক্ত করে দেয়া হোক। অনুরূপ রিফা’আহজ ইবনু শামূঈল নামক ইয়াহূদীকেও তিনি রেহাই দিয়েছিলেন। (তারীখে তাবারী ৫৭ ও ৫৮ পৃষ্ঠা)
সহীহ বুখারী হাদিস ৪১১৯-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে আহযাব যুদ্ধের পর বানু কুরাইযার পথে আসর সালাত নিয়ে সাহাবীদের ভিন্ন বোঝাপড়ার ঘটনা এসেছে। নবী صلى الله عليه وسلم বলেছিলেন, বনু কুরাইযায় না পৌঁছে কেউ আসরের সালাত আদায় করবে না। পথে আসরের সময় হয়ে গেলে এক দল বলল, আমরা সেখানে পৌঁছার আগে সালাত পড়ব না। আরেক দল বলল, আমরা এখনই সালাত পড়ব; উদ্দেশ্য এমন নয় যে সময় হয়ে গেলেও রাস্তায় সালাত পড়া যাবে না। পরে বিষয়টি নবী صلى الله عليه وسلم-এর কাছে জানানো হলে তিনি কোনো দলের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি। এই হাদিসে ইজতিহাদ, নির্দেশ বোঝার ভিন্নতা এবং মতভেদের আদবের সুন্দর শিক্ষা আছে। তবে হাদিসের বাইরে অতিরিক্ত আইনগত সিদ্ধান্ত টানা হলে ইসলামী স্কলারদের ব্যাখ্যার প্রয়োজন।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- একই নির্দেশ বুঝতে সাহাবীদের মধ্যে ভিন্ন মত হতে পারে।
- নবী صلى الله عليه وسلم এই ঘটনায় কোনো দলকেই তিরস্কার করেননি।
- সালাতের সময় ও নির্দেশ—দুটিই সাহাবীরা গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
- মতভেদ হলে আদব ও সংযম বজায় রাখা দরকার।
