৬৪/৫৫. অধ্যায়ঃ
সহীহ বুখারী হাদিস ৪৩১৮ - হাওয়াযিন বন্দী ফেরত ও পরামর্শ
মহান আল্লাহর বাণীঃ
﴾وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ (٢٥) ثُمَّ أَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ إِلَى قَوْلِهِ غَفُورٌ رَحِيمٌ (٢٧)﴿এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে গর্বিত করে তুলেছিল; কিন্তু সে সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোনো কাজে আসেনি এবং সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল তোমাদের প্রতি এ পৃথিবী এত প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও, পরে তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালিয়েছিলে। অতঃপর আল্লাহ নিজের তরফ থেকে প্রশান্তি অবতীর্ণ করলেন তাঁর রাসূলের প্রতি এবং মুমিনদের প্রতি, আর তিনি অবতীর্ণ করলেন এমন এক সেনাবাহিনী যাদের তোমরা দেখতে পাওনি। তিনি কাফিরদের শাস্তি দিলেন এবং তা ছিল কাফিরদের কর্মফল। আর আল্লাহ এরপরও তাওবার তাওফীক দেন যাদের ইচ্ছা করেন। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আত-তাওবা ৯/২৫-২৭)"
হাওয়াযিন বন্দীদের হাদিস: ক্ষমা, অধিকার ও পরামর্শ
সহীহ বুখারী : ৪৩১৮
সহীহ বুখারীহাদিস নম্বর ৪৩১৮
سَعِيْدُ بْنُ عُفَيْرٍ قَالَ حَدَّثَنِي اللَّيْثُ حَدَّثَنِيْ عُقَيْلٌ عَنْ ابْنِ شِهَابٍ ح و حَدَّثَنِيْ إِسْحَاقُ حَدَّثَنَا يَعْقُوْبُ بْنُ إِبْرَاهِيْمَ حَدَّثَنَا ابْنُ أَخِي ابْنِ شِهَابٍ قَالَ مُحَمَّدُ بْنُ شِهَابٍ وَزَعَمَ عُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ أَنَّ مَرْوَانَ وَالْمِسْوَرَ بْنَ مَخْرَمَةَ أَخْبَرَاهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَامَ حِيْنَ جَاءَهُ وَفْدُ هَوَازِنَ مُسْلِمِيْنَ فَسَأَلُوْهُ أَنْ يَرُدَّ إِلَيْهِمْ أَمْوَالَهُمْ وَسَبْيَهُمْ فَقَالَ لَهُمْ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ مَعِيْ مَنْ تَرَوْنَ وَأَحَبُّ الْحَدِيْثِ إِلَيَّ أَصْدَقُهُ فَاخْتَارُوْا إِحْدَى الطَّائِفَتَيْنِ إِمَّا السَّبْيَ وَإِمَّا الْمَالَ وَقَدْ كُنْتُ اسْتَأْنَيْتُ بِكُمْ وَكَانَ أَنْظَرَهُمْ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ بِضْعَ عَشْرَةَ لَيْلَةً حِيْنَ قَفَلَ مِنْ الطَّائِفِ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ غَيْرُ رَادٍّ إِلَيْهِمْ إِلَّا إِحْدَى الطَّائِفَتَيْنِ قَالُوْا فَإِنَّا نَخْتَارُ سَبْيَنَا فَقَامَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ فِي الْمُسْلِمِيْنَ فَأَثْنَى عَلَى اللهِ بِمَا هُوَ أَهْلُهُ ثُمَّ قَالَ أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ إِخْوَانَكُمْ قَدْ جَاءُوْنَا تَائِبِيْنَ وَإِنِّيْ قَدْ رَأَيْتُ أَنْ أَرُدَّ إِلَيْهِمْ سَبْيَهُمْ فَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يُطَيِّبَ ذَلِكَ فَلْيَفْعَلْ وَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَكُوْنَ عَلَى حَظِّهِ حَتَّى نُعْطِيَهُ إِيَّاهُ مِنْ أَوَّلِ مَا يُفِيْءُ اللهُ عَلَيْنَا فَلْيَفْعَلْ فَقَالَ النَّاسُ قَدْ طَيَّبْنَا ذَلِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِنَّا لَا نَدْرِيْ مَنْ أَذِنَ مِنْكُمْ فِيْ ذَلِكَ مِمَّنْ لَمْ يَأْذَنْ فَارْجِعُوْا حَتَّى يَرْفَعَ إِلَيْنَا عُرَفَاؤُكُمْ أَمْرَكُمْ فَرَجَعَ النَّاسُ فَكَلَّمَهُمْ عُرَفَاؤُهُمْ ثُمَّ رَجَعُوْا إِلَى رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَأَخْبَرُوْهُ أَنَّهُمْ قَدْ طَيَّبُوْا وَأَذِنُوْا هَذَا الَّذِيْ بَلَغَنِيْ عَنْ سَبْيِ هَوَازِنَ.
মারওয়ান ইব্নু আল-হাকাম ও আল-মিসওয়ার ইব্নু মাখরামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিগণ যখন মুসলিম হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে এলো এবং তাদের (যুদ্ধে ফেলে যাওয়া) সম্পদ ও বন্দীদেরকে ফেরত দেয়ার প্রার্থনা জানালো তখন তিনি দাঁড়ালেন এবং তাদের বললেন, আমার সঙ্গে যারা আছে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সত্য কথাই আমার কাছে অধিক প্রিয়। কাজেই তোমরা যুদ্ধবন্দী অথবা সম্পদ- এ দুটির যে কোন একটিকে গ্রহণ করতে পার। আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বস্তুতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ থেকে ফিরে আসার পথে দশ রাতেরও অধিক সময় তাদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন।(বর্ণনাকারী বলেন) হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিদের কাছে যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে এ দুটির মধ্যে একটির অধিক ফেরত দিতে সম্মত নন, তখন তারা বললেন, আমরা আমাদের বন্দীদেরকে গ্রহণ করতে চাই।তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর যথাযোগ্য হাম্দ ও সানা পাঠ করে বললেন, আম্মা বা‘দু, তোমাদের (মুসলিম) ভাইয়েরা তওবা করে আমাদের কাছে এসেছে, আমি তাদের বন্দীদেরকে তাদের নিকট ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত করেছি। অতএব তোমাদের মধ্যে যে আমার এ সিদ্ধান্তকে খুশি মনে গ্রহণ করবে সে (বন্দী) ফেরত দিক। আর তোমাদের মধ্যে যে তার অংশের অধিকারকে অবশিষ্ট রেখে তা এভাবে ফেরত দিতে চাইবে যে, ফাইয়ের সম্পদ থেকে (আগামীতে) আল্লাহ আমাকে সর্বপ্রথম যা দান করবেন তা দিয়ে আমি তার এ বন্দীর মূল্য পরিশোধ করব, তবে সে তাই করুক।তখন সকল লোক উত্তর করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার প্রথম সিদ্ধান্ত খুশিমনে গ্রহণ করলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের মধ্যে এ ব্যাপারে কে খুশিমনে অনুমতি দিয়েছে আর কে খুশিমনে অনুমতি দেয়নি আমি তা বুঝতে পারিনি। তাই তোমরা ফিরে যাও এবং তোমাদের মধ্যকার বিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ কর। তারা আমার কাছে বিষয়টি পেশ করবে। সবাই ফিরে গেল। পরে তাদের বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ তাদের সঙ্গে আলাপ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে এসে জানাল যে, সবাই তাঁর (প্রথম) সিদ্ধান্তকেই খুশি মনে মেনে নিয়েছে এবং (যুদ্ধবন্দী ফেরত দেয়ার) অনুমতি দিয়েছে।[ইমাম ইবনু শিহাব যুহরী (রহঃ) বলেন] হাওয়াযিন গোত্রের বন্দীদের বিষয়ে এ হাদীসটিই আমার কাছে পৌঁছেছে।
সহীহ বুখারী হাদিস ৪৩১৮-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিরা মুসলিম হয়ে রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم-এর কাছে আসে এবং তাদের সম্পদ ও বন্দীদের ফেরত চায়। নবী صلى الله عليه وسلم বলেন, সত্য কথাই তাঁর কাছে প্রিয়; তারা বন্দী বা সম্পদের মধ্যে একটিকে বেছে নিক। তিনি তাদের জন্য কিছুদিন অপেক্ষাও করেছিলেন। তারা বন্দীদের বেছে নিলে নবী صلى الله عليه وسلم মুসলিমদের সামনে বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাদের ভাইয়েরা তাওবা করে এসেছে, তিনি বন্দীদের ফিরিয়ে দিতে চান। তবে যাদের অংশ আছে, তাদের ইচ্ছাও বিবেচনা করা হবে; কেউ চাইলে খুশিমনে ছাড়বে, আর কেউ চাইলে ভবিষ্যতের ফাই থেকে প্রতিদান নিতে পারে। মানুষ সম্মতি দিলেও নবী صلى الله عليه وسلم শুধু সামষ্টিক উত্তরেই থামেননি; তিনি নেতাদের মাধ্যমে নিশ্চিত করলেন কে অনুমতি দিয়েছে। এই হাদিসে দয়া, সত্য কথা, মানুষের অধিকার ও শূরার সুন্দর শিক্ষা আছে।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- তাওবা করে আসা মানুষের সঙ্গে দয়া ও ন্যায়—দুটিই বিবেচনা করা হয়েছে।
- অন্যের অধিকার খুশিমনে ছাড়া না হলে তা যাচাই করা দরকার।
- নবী صلى الله عليه وسلم সামষ্টিক সিদ্ধান্তেও মানুষের বাস্তব সম্মতি নিশ্চিত করেছেন।
- সত্য কথা ও পরিষ্কার বিকল্প দেওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়।
