১/৫৫. অধ্যায়ঃ

রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১/৪৬১ - দুনিয়ার প্রতিযোগিতা ও সম্পদের ফিতনা

দুনিয়াদারি ত্যাগ করার মাহাত্ম্য, দুনিয়া কামানো কম করার প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং দারিদ্রের ফযীলত

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴾ إِنَّمَا مَثَلُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا كَمَآءٍ أَنزَلۡنَٰهُ مِنَ ٱلسَّمَآءِ فَٱخۡتَلَطَ بِهِۦ نَبَاتُ ٱلۡأَرۡضِ مِمَّا يَأۡكُلُ ٱلنَّاسُ وَٱلۡأَنۡعَٰمُ حَتَّىٰٓ إِذَآ أَخَذَتِ ٱلۡأَرۡضُ زُخۡرُفَهَا وَٱزَّيَّنَتۡ وَظَنَّ أَهۡلُهَآ أَنَّهُمۡ قَٰدِرُونَ عَلَيۡهَآ أَتَىٰهَآ أَمۡرُنَا لَيۡلًا أَوۡ نَهَارٗا فَجَعَلۡنَٰهَا حَصِيدٗا كَأَن لَّمۡ تَغۡنَ بِٱلۡأَمۡسِۚ كَذَٰلِكَ نُفَصِّلُ ٱلۡأٓيَٰتِ لِقَوۡمٖ يَتَفَكَّرُونَ ٢٤﴿[يونس: ٢٤]অর্থাৎ“ বস্তুত পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত তো বৃষ্টির মত, যা আমি আসমান হতে বর্ষণ করি। অতঃপর তার দ্বারা উৎপন্ন হয় ভূপৃষ্ঠের উদ্ভিদগুলো অতিশয় ঘন হয়ে, যা হতে মানুষ ও পশুরা ভক্ষণ করে। অতঃপর যখন ভূমি তার শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে এবং তার মালিকরা মনে করে যে, তারা এখন তার পূর্ণ অধিকারী, তখন দিনে অথবা রাতে তার উপর আমার (আযাবের) আদেশ এসে পড়ে, সুতরাং আমি তা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দই, যেন গতকাল তার অস্তিত্বই ছিল না। এরূপেই আয়াতগুলোকে আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বিশদরূপে বর্ণনা করে থাকি।” (সূরা ইউনুস ২৪ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ وَٱضۡرِبۡ لَهُم مَّثَلَ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا كَمَآءٍ أَنزَلۡنَٰهُ مِنَ ٱلسَّمَآءِ فَٱخۡتَلَطَ بِهِۦ نَبَاتُ ٱلۡأَرۡضِ فَأَصۡبَحَ هَشِيمٗا تَذۡرُوهُ ٱلرِّيَٰحُۗ وَكَانَ ٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ مُّقۡتَدِرًا ٤٥ ٱلۡمَالُ وَٱلۡبَنُونَ زِينَةُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ وَٱلۡبَٰقِيَٰتُ ٱلصَّٰلِحَٰتُ خَيۡرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابٗا وَخَيۡرٌ أَمَلٗا ٤٦﴿[الكهف: ٤٥، ٤٦]অর্থাৎ “তাদের কাছে পেশ কর উপমা পার্থিব জীবনের; এটা পানির ন্যায় যা আমি বর্ষণ করি আকাশ হতে, যার দ্বারা ভূমির উদ্ভিদ ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে উদগ্ত হয়। অতঃপর তা বিশুষ্ক হয়ে এমন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যে, বাতাস ওকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান। ধনৈশবর্য ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা। আর সৎকার্য, যার ফল স্থায়ী, ওটা তোমার প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং আশা প্রাপ্তির ব্যাপারেও উৎকৃষ্ট।” (সূরা কাহফ ৪৫-৪৬ আয়াত)আরো অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন,﴾ ٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّمَا ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَا لَعِبٞ وَلَهۡوٞ وَزِينَةٞ وَتَفَاخُرُۢ بَيۡنَكُمۡ وَتَكَاثُرٞ فِي ٱلۡأَمۡوَٰلِ وَٱلۡأَوۡلَٰدِۖ كَمَثَلِ غَيۡثٍ أَعۡجَبَ ٱلۡكُفَّارَ نَبَاتُهُۥ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَىٰهُ مُصۡفَرّٗا ثُمَّ يَكُونُ حُطَٰمٗاۖ وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِ عَذَابٞ شَدِيدٞ وَمَغۡفِرَةٞ مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضۡوَٰنٞۚ وَمَا ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَآ إِلَّا مَتَٰعُ ٱلۡغُرُورِ ٢٠﴿[الحديد: ٢٠]অর্থাৎ “তোমরা জেনে রেখো যে, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক অহংকার প্রকাশ, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। এর উপমা বৃষ্টি; যার দ্বারা উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও, অবশেষে তা টুকরা-টুকরা (খড়-কুটায়) পরিণত হয় এবং আখেরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত কিছুই নয়।” (সূরা হাদীদ ২০ আয়াত)অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴾ زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ ٱلشَّهَوَٰتِ مِنَ ٱلنِّسَآءِ وَٱلۡبَنِينَ وَٱلۡقَنَٰطِيرِ ٱلۡمُقَنطَرَةِ مِنَ ٱلذَّهَبِ وَٱلۡفِضَّةِ وَٱلۡخَيۡلِ ٱلۡمُسَوَّمَةِ وَٱلۡأَنۡعَٰمِ وَٱلۡحَرۡثِۗ ذَٰلِكَ مَتَٰعُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ وَٱللَّهُ عِندَهُۥ حُسۡنُ ٱلۡمَ‍َٔابِ ١٤﴿[ال عمران: ١٤]অর্থাৎ “নারী, সন্তান-সন্ততি, জমাকৃত সোনা-রূপার ভান্ডার, পছন্দসই (চিহ্নিত) ঘোড়া, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তি মানুষের নিকট লোভনীয় করা হয়েছে। এ সব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর নিকটেই উত্তম আশ্রয়স্থল রয়েছে।” (আলে ইমরান ১৪)তিনি আরো বলেন,﴾ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّ وَعۡدَ ٱللَّهِ حَقّٞۖ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِٱللَّهِ ٱلۡغَرُورُ ٥﴿[فاطر: ٥]অর্থাৎ “হে মানুষ! আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; সুতরাং পার্থিব জীবন যেন কিছুতেই তোমাদেরকে প্রতারিত না করে এবং কোন প্রবঞ্চক যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে প্রবঞ্চিত না করে।” (সূরা ফাত্বির ৫ আয়াত)আল্লাহ তা‘আলা অন্য জায়গায় বলেন,﴾ أَلۡهَىٰكُمُ ٱلتَّكَاثُرُ ١ حَتَّىٰ زُرۡتُمُ ٱلۡمَقَابِرَ ٢ كَلَّا سَوۡفَ تَعۡلَمُونَ ٣ ثُمَّ كَلَّا سَوۡفَ تَعۡلَمُونَ ٤ كَلَّا لَوۡ تَعۡلَمُونَ عِلۡمَ ٱلۡيَقِينِ ٥ ﴿ [التكاثر: ١، ٥]অর্থাৎ “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। যতক্ষণ না তোমরা (মরে) কবরে উপস্থিত হও। কখনও নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। আবার বলি, কখনও নয়, তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে। সত্যই, তোমাদের নিশ্চিত জ্ঞান থাকলে অবশ্যই তোমরা জানতে (ঐ প্রতিযোগিতার পরিণাম)।” (সূরা তাকাসুর ১-৫ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾وَمَا هَٰذِهِ ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَآ إِلَّا لَهۡوٞ وَلَعِبٞۚ وَإِنَّ ٱلدَّارَ ٱلۡأٓخِرَةَ لَهِيَ ٱلۡحَيَوَانُۚ لَوۡ كَانُواْ يَعۡلَمُونَ ٦٤﴿ [العنكبوت: ٦٤]অর্থাৎ “এ পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। আর পারলোকিক জীবনই তো প্রকৃত জীবন; যদি ওরা জানত।” (সূরা আনকাবূত ৬৪ আয়াত)

দুনিয়ার প্রতিযোগিতা: সম্পদের ফিতনা থেকে সতর্ক থাকার শিক্ষা

রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ১/৪৬১

عَن عَمرِو بنِ عَوفٍ الأنصَارِي رضي الله عنه: أنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ ﷺ بَعَثَ أَبَا عُبَيدَةَ بنَ الجَرَّاحِ رضي الله عنه إِلَى الْبَحْرَيْنِ يَأتِي بِجِزْيَتِهَا، فَقَدِمَ بمَالٍ مِنَ الْبَحْرَيْنِ، فَسَمِعَتِ الأَنْصَارُ بقُدُومِ أَبي عُبيْدَةَ، فَوَافَوْا صَلاَةَ الفَجْرِ مَعَ رَسُولِ اللهِ ﷺ، فَلَمَّا صَلَّى رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ، انْصَرفَ، فَتَعَرَّضُوا لَهُ، فَتَبَسَّمَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ حِيْنَ رَآهُمْ، ثُمَّ قَالَ: أظُنُّكُمْ سَمعتُمْ أنَّ أَبَا عُبَيْدَةَ قَدِمَ بِشَيْءٍ مِنَ الْبَحْرَيْنِ؟فَقَالُوا: أَجَل، يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، فَقَالَ: أبْشِرُوا وَأَمِّلُوا مَا يَسُرُّكُمْ، فَوَالله مَا الفَقْرَ أخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنِّي أخْشَى أنْ تُبْسَط الدُّنْيَا عَلَيْكُمْ كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا، فَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أهْلَكَتْهُمْ.متفقٌ عَلَيْهِ

‘আমর ইবনে ‘আউফ আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একবার আবূ উবাইদাহ ইবনে জার্রাহকে জিযিয়া (ট্যাক্স) আদায় করার জন্য বাহরাইন পাঠালেন। অতঃপর তিনি বাহরাইন থেকে (প্রচুর) মাল নিয়ে এলেন। আনসারগণ তাঁর আগমনের সংবাদ শুনে ফজরের নামাজে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সঙ্গে শরীক হলেন। যখন তিনি নামাজ পড়ে (নিজ বাড়ি) ফিরে যেতে লাগলেন, তখন তারা তাঁর সামনে এলেন।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে দেখে হেসে বললেন, ’’আমার মনে হয়, তোমরা আবূ উবাইদাহ বাহরাইন থেকে কিছু (মাল) নিয়ে এসেছে, তা শুনেছ।’’ তারা বলল, ’জী হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ’’সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং তোমরা সেই আশা রাখ, যা তোমাদেরকে আনন্দিত করবে। তবে আল্লাহর কসম! তোমাদের উপর দারিদ্র্য আসবে আমি এ আশঙ্কা করছি না। বরং আশঙ্কা করছি যে, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের ন্যায় তোমাদেরও পার্থিব জীবনে প্রশস্ততা আসবে। আর তাতে তোমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যেমন তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। অতঃপর তা তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে, যেমন তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল।’’ (বুখারী ও মুসলিম) [১]

সহীহুল বুখারী ৩১৫৮, ৪০১৫, ৬৪২৫, মুসলিম ২৯৬১, তিরমিযী ২৪৬২, ইবনু মাজাহ ৩৯৯৭, আহমাদ ১৬৭৮৩, ১৮৪৩৬

রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১/৪৬১-এর সারসংক্ষেপ

এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) আনসারদের সামনে খুব গভীর একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। বাহরাইন থেকে মাল আসার খবর শুনে তারা ফজরের নামাজে এসে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) তাদের উদ্দেশ্য বুঝে মুচকি হাসলেন এবং সুসংবাদ দিলেন। কিন্তু এরপর তিনি বললেন, তাঁর ভয় দারিদ্র্য নিয়ে নয়; বরং ভয় হলো দুনিয়ার প্রশস্ততা নিয়ে। আগের উম্মতদের মতো যদি সম্পদ, সুবিধা ও পার্থিব জীবনের প্রসার এসে যায়, আর মানুষ তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামে, তাহলে সেটিই ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই এই হাদিস দুনিয়ার প্রতিযোগিতা, সম্পদের ফিতনা এবং আখিরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়। সম্পদ থাকা সমস্যা নয়; সমস্যা হলো সম্পদকে কেন্দ্র করে হৃদয় বদলে যাওয়া।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • দারিদ্র্য সব সময় সবচেয়ে বড় ভয় নয়; দুনিয়ার প্রাচুর্যও মানুষের জন্য পরীক্ষা হতে পারে।
  • সম্পদ নিয়ে অযথা প্রতিযোগিতা আগের জাতিগুলোর ক্ষতির কারণ হয়েছিল।
  • মুসলিমের উচিত দুনিয়ার সুযোগ পেলে কৃতজ্ঞ থাকা এবং আখিরাত ভুলে না যাওয়া।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন