ভ্রমণের শিষ্টাচার
মোট হাদিস ০৮
ইসলামে ভ্রমণের সুন্নাত ও প্রয়োজনীয় শিষ্টাচারসমূহ
ইসলামে সফর বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চমৎকার ও কল্যাণকর শিষ্টাচারের কথা বলা হয়েছে, যা আমাদের ভ্রমণকে নিরাপদ ও বরকতময় করে তোলে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন কোনো সফরে যেতেন বা সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখন নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলতেন। যেমন, মক্কা থেকে ফেরার পথে তিনি 'মসজিদে শাজারা' ও 'যুল-হুলাইফা' নামক স্থানে সালাত আদায় করতেন এবং রাত যাপন করে সকালে লোকালয়ে প্রবেশ করতেন। এছাড়া, সফর শেষে গভীর রাতে আকস্মিকভাবে নিজ পরিবারের কাছে ফিরে যেতে তিনি নিষেধ করেছেন, যাতে পরিবার আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায়। ভ্রমণের সময় পারস্পরিক ভালোবাসা ও শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শনেরও দারুণ উদাহরণ রয়েছে সুন্নাতে; আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মক্কায় পৌঁছালে আব্দুল মুত্তালিব গোত্রের শিশুরা যখন তাঁকে স্বাগত জানায়, তখন তিনি পরম মমতায় তাদের নিজের সাওয়ারিতে তুলে নেন। এই হাদিসগুলো আমাদের শেখায় কীভাবে শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং ভালোবাসার মাধ্যমে একটি সফরকে ইবাদতে পরিণত করা যায়।
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، عَنْ إِسْحَاقَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ، عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ لاَ يَطْرُقُ أَهْلَهُ، كَانَ لاَ يَدْخُلُ إِلاَّ غُدْوَةً أَوْ عَشِيَّةً.
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) রাত্রে কখনো পরিবারের নিকট প্রবেশ করতেন না। তিনি প্রভাতে কিংবা বৈকালে ছাড়া পরিবারের নিকট প্রবেশ করতেন না।
حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ أَبِي مَرْيَمَ، أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي حُمَيْدٌ، أَنَّهُ سَمِعَ أَنَسًا ـ رضى الله عنه ـ يَقُولُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا قَدِمَ مِنْ سَفَرٍ، فَأَبْصَرَ دَرَجَاتِ الْمَدِينَةِ أَوْضَعَ نَاقَتَهُ، وَإِنْ كَانَتْ دَابَّةً حَرَّكَهَا. قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ زَادَ الْحَارِثُ بْنُ عُمَيْرٍ عَنْ حُمَيْدٍ حَرَّكَهَا مِنْ حُبِّهَا.
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি আনাস (রাঃ) -কে বলতে শুনেছেন, আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ) সফর হতে ফিরে যখন মাদীনাহ্র উঁচু রাস্তাগুলো দেখতেন তখন তিনি তাঁর উটনী দ্রুতগতিতে চালাতেন আর বাহন অন্য জানোয়ার হলে তিনি তাকে তাড়া দিতেন। -------------------- অপর একটি বর্ণনায় হুমাইদ আনাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, (উঁচু রাস্তা) -এর পরিবর্তে (দেয়ালগুলো) শব্দ বলেছেন। হারিস ইব্নু ‘উমাইর (রহঃ) ইসমা‘ঈল(রহঃ) -এর অনুরূপ বর্ণনা করেন।
حَدَّثَنَا مُعَلَّى بْنُ أَسَدٍ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ زُرَيْعٍ، حَدَّثَنَا خَالِدٌ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ لَمَّا قَدِمَ النَّبِيُّ ﷺ مَكَّةَ اسْتَقْبَلَتْهُ أُغَيْلِمَةُ بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ، فَحَمَلَ وَاحِدًا بَيْنَ يَدَيْهِ وَآخَرَ خَلْفَهُ.
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) মক্কায় এলে ‘আবদুল মুত্তালিব গোত্রীয় কয়েকজন তরুণ তাঁকে স্বাগত জানায়। তিনি একজনকে তাঁর সাওয়ারীর সামনে ও অন্যজনকে পেছনে তুলে নেন।
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، حَدَّثَنَا مَالِكٌ، عَنْ سُمَىٍّ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ " السَّفَرُ قِطْعَةٌ مِنَ الْعَذَابِ، يَمْنَعُ أَحَدَكُمْ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ وَنَوْمَهُ، فَإِذَا قَضَى نَهْمَتَهُ فَلْيُعَجِّلْ إِلَى أَهْلِهِ».
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) ইরশাদ করেন, সফর ‘আযাবের অংশ বিশেষ। তা তোমাদের যথাসময় পানাহার ও নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটায়। কাজেই সকলেই যেন নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে অবিলম্বে আপন পরিজনের কাছে ফিরে যায়।
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ الْحَجَّاجِ، حَدَّثَنَا أَنَسُ بْنُ عِيَاضٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ كَانَ إِذَا خَرَجَ إِلَى مَكَّةَ يُصَلِّي فِي مَسْجِدِ الشَّجَرَةِ، وَإِذَا رَجَعَ صَلَّى بِذِي الْحُلَيْفَةِ بِبَطْنِ الْوَادِي وَبَاتَ حَتَّى يُصْبِحَ.
ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) মক্কার উদ্দেশ্যে বের হয়ে ‘মসজিদে শাজারাতে’ সালাত আদায় করতেন। আর যখন ফিরতেন, যুল-হুলাইফার বাতনুল-ওয়াদীতে সালাত আদায় করতেন এবং এখানে সকাল পর্যন্ত রাত যাপন করতেন।
حَدَّثَنَا مُسْلِمُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ مُحَارِبٍ، عَنْ جَابِرٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ نَهَى النَّبِيُّ ﷺ أَنْ يَطْرُقَ أَهْلَهُ لَيْلاً.
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) রাতের বেলা পরিবারের কাছে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন।
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ نَافِعٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ كَانَ إِذَا قَفَلَ مِنْ غَزْوٍ أَوْ حَجٍّ أَوْ عُمْرَةٍ يُكَبِّرُ عَلَى كُلِّ شَرَفٍ مِنَ الأَرْضِ ثَلاَثَ تَكْبِيرَاتٍ، ثُمَّ يَقُولُ «لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ، وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ، آيِبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ سَاجِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ، صَدَقَ اللَّهُ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ».
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ) যখনই কোন যুদ্ধ, বা হজ্জ অথবা ‘উমরা হতে প্রত্যাবর্তন করতেন তখন তিনি প্রত্যেক উঁচু ভূমিতে তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন এবং পরে বলতেনঃ অর্থাৎ “আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। সর্বময় ক্ষমতা এবং সকল প্রশংসা কেবল তাঁরই। তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। আমরা প্রত্যাবর্তনকারী ও তাওবাহ্কারী, ‘ইবাদতকারী, আমাদের প্রভুর উদ্দেশ্যে সিজদাহ্কারী ও প্রশংসাকারী। আল্লাহ্ তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সকল শত্রুদলকে পরাজিত করেছেন”।
حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ أَبِي مَرْيَمَ، أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي زَيْدُ بْنُ أَسْلَمَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ كُنْتُ مَعَ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ بِطَرِيقِ مَكَّةَ، فَبَلَغَهُ عَنْ صَفِيَّةَ بِنْتِ أَبِي عُبَيْدٍ شِدَّةُ وَجَعٍ فَأَسْرَعَ السَّيْرَ، حَتَّى كَانَ بَعْدَ غُرُوبِ الشَّفَقِ نَزَلَ، فَصَلَّى الْمَغْرِبَ وَالْعَتَمَةَ، جَمَعَ بَيْنَهُمَا، ثُمَّ قَالَ إِنِّي رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ إِذَا جَدَّ بِهِ السَّيْرُ أَخَّرَ الْمَغْرِبَ، وَجَمَعَ بَيْنَهُمَا.
আসলাম (রহঃ) হতে বর্ণিতঃ
মক্কার রাস্তায় আমি ‘আবদুল্লাহ ইব্নু ‘উমর (রাঃ) -এর সাথে ছিলাম। সাফিয়্যা বিনতু আবূ ‘উবায়দ (রাঃ) -এর মারাত্মক অসুস্থ হওয়ার খবর তাঁর নিকট পৌঁছল। তখন তিনি গতি বৃদ্ধি করলেন। (পশ্চিম আকাশের) লালিমা চলে যাবার পর সাওয়ারী হতে অবতরণ করে মাগরিব ও ‘ইশা একত্রে আদায় করেন। অতঃপর বলেন, আমি নবী (ﷺ) -কে দেখেছি, সফরে তাড়াতাড়ি চলার দরকার হলে তিনি মাগরিবকে দেরি করে মাগরিব ও ‘ইশা একত্রে আদায় করতেন।
