২/১২১. অধ্যায়ঃ
জামে‘ আত-তিরমিযী হাদিস ৩১২ - জেহরি নামাজে কিরাআতের আদব
ইমাম যখন সশব্দে কেরাত পাঠ করেন তখন তার পিছনে কেরাত পাঠ না করা প্রসঙ্গে
জেহরি নামাজে ইমামের পেছনে কিরাআত করার আদব
জামে‘ আত-তিরমিযী : ৩১২
জামে‘ আত-তিরমিযীহাদিস নম্বর ৩১২
حَدَّثَنَا الأَنْصَارِيُّ، حَدَّثَنَا مَعْنٌ، حَدَّثَنَا مَالِكُ بْنُ أَنَسٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنِ ابْنِ أُكَيْمَةَ اللَّيْثِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ انْصَرَفَ مِنْ صَلاَةٍ جَهَرَ فِيهَا بِالْقِرَاءَةِ فَقَالَ " هَلْ قَرَأَ مَعِي أَحَدٌ مِنْكُمْ آنِفًا " . فَقَالَ رَجُلٌ نَعَمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ . قَالَ " إِنِّي أَقُولُ مَا لِي أُنَازَعُ الْقُرْآنَ " . قَالَ فَانْتَهَى النَّاسُ عَنِ الْقِرَاءَةِ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فِيمَا جَهَرَ فِيهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مِنَ الصَّلَوَاتِ بِالْقِرَاءَةِ حِينَ سَمِعُوا ذَلِكَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ .قَالَ وَفِي الْبَابِ عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ وَعِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ وَجَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ. وَابْنُ أُكَيْمَةَ اللَّيْثِيُّ اسْمُهُ عُمَارَةُ. وَيُقَالُ عَمْرُو بْنُ أُكَيْمَةَ. وَرَوَى بَعْضُ أَصْحَابِ الزُّهْرِيِّ هَذَا الْحَدِيثَ وَذَكَرُوا هَذَا الْحَرْفَ قَالَ قَالَ الزُّهْرِيُّ فَانْتَهَى النَّاسُ عَنِ الْقِرَاءَةِ حِينَ سَمِعُوا ذَلِكَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ .وَلَيْسَ فِي هَذَا الْحَدِيثِ مَا يَدْخُلُ عَلَى مَنْ رَأَى الْقِرَاءَةَ خَلْفَ الإِمَامِ لأَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ هُوَ الَّذِي رَوَى عَنِ النَّبِيِّ ﷺ هَذَا الْحَدِيثَ وَرَوَى أَبُو هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّهُ قَالَ " مَنْ صَلَّى صَلاَةً لَمْ يَقْرَأْ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآنِ فَهِيَ خِدَاجٌ فَهِيَ خِدَاجٌ غَيْرُ تَمَامٍ " . فَقَالَ لَهُ حَامِلُ الْحَدِيثِ إِنِّي أَكُونُ أَحْيَانًا وَرَاءَ الإِمَامِ قَالَ اقْرَأْ بِهَا فِي نَفْسِكَ. وَرَوَى أَبُو عُثْمَانَ النَّهْدِيُّ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ أَمَرَنِي النَّبِيُّ ﷺ أَنْ أُنَادِيَ أَنْ لاَ صَلاَةَ إِلاَّ بِقِرَاءَةِ فَاتِحَةِ الْكِتَابِ. وَاخْتَارَ أَكْثَرُ أَصْحَابِ الْحَدِيثِ أَنْ لاَ يَقْرَأَ الرَّجُلُ إِذَا جَهَرَ الإِمَامُ بِالْقِرَاءَةِ وَقَالُوا يَتَتَبَّعُ سَكَتَاتِ الإِمَامِ.وَقَدِ اخْتَلَفَ أَهْلُ الْعِلْمِ فِي الْقِرَاءَةِ خَلْفَ الإِمَامِ فَرَأَى أَكْثَرُ أَهْلِ الْعِلْمِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ ﷺ وَالتَّابِعِينَ وَمَنْ بَعْدَهُمُ الْقِرَاءَةَ خَلْفَ الإِمَامِ وَبِهِ يَقُولُ مَالِكُ بْنُ أَنَسٍ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ الْمُبَارَكِ وَالشَّافِعِيُّ وَأَحْمَدُ وَإِسْحَاقُ. وَرُوِيَ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْمُبَارَكِ أَنَّهُ قَالَ أَنَا أَقْرَأُ خَلْفَ الإِمَامِ وَالنَّاسُ يَقْرَءُونَ إِلاَّ قَوْمًا مِنَ الْكُوفِيِّينَ وَأَرَى أَنَّ مَنْ لَمْ يَقْرَأْ صَلاَتُهُ جَائِزَةٌ . وَشَدَّدَ قَوْمٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ فِي تَرْكِ قِرَاءَةِ فَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَإِنْ كَانَ خَلْفَ الإِمَامِ فَقَالُوا لاَ تُجْزِئُ صَلاَةٌ إِلاَّ بِقِرَاءَةِ فَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَحْدَهُ كَانَ أَوْ خَلْفَ الإِمَامِ. وَذَهَبُوا إِلَى مَا رَوَى عُبَادَةُ بْنُ الصَّامِتِ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ . وَقَرَأَ عُبَادَةُ بْنُ الصَّامِتِ بَعْدَ النَّبِيِّ ﷺ خَلْفَ الإِمَامِ وَتَأَوَّلَ قَوْلَ النَّبِيِّ ﷺ " لاَ صَلاَةَ إِلاَّ بِقِرَاءَةِ فَاتِحَةِ الْكِتَابِ " . وَبِهِ يَقُولُ الشَّافِعِيُّ وَإِسْحَاقُ وَغَيْرُهُمَا . وَأَمَّا أَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ فَقَالَ مَعْنَى قَوْلِ النَّبِيِّ ﷺ " لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ " . إِذَا كَانَ وَحْدَهُ . وَاحْتَجَّ بِحَدِيثِ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ حَيْثُ قَالَ مَنْ صَلَّى رَكْعَةً لَمْ يَقْرَأْ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآنِ فَلَمْ يُصَلِّ إِلاَّ أَنْ يَكُونَ وَرَاءَ الإِمَامِ . قَالَ أَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ فَهَذَا رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ ﷺ تَأَوَّلَ قَوْلَ النَّبِيِّ ﷺ " لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ " . أَنَّ هَذَا إِذَا كَانَ وَحْدَهُ . وَاخْتَارَ أَحْمَدُ مَعَ هَذَا الْقِرَاءَةَ خَلْفَ الإِمَامِ وَأَنْ لاَ يَتْرُكَ الرَّجُلُ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ وَإِنْ كَانَ خَلْفَ الإِمَامِ.>
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সশব্দে কিরাআত পাঠ করা নামাজ শেষ করে বললেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ এখন কি আমার সাথে কিরা’আত পাঠ করেছিলো? এক ব্যক্তি বলল, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেনঃ আমি নামাজে মনে মনে বলছিলাম, আমার কি হল, কোরআন পাঠ করতে আমি বাধাগ্রস্ত হচ্ছি কেন? রাবী বলেন, লোকেরা যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুখে এরূপ শুনল তখন তাঁরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যেহরী (সশব্দে) কিরা’আত পাঠ করা নামাজে তাঁর পিছনে কিরা’আত পাঠ করা হতে ক্ষান্ত থাকল।
এ অনুচ্ছেদে ইবনু মাসউদ, ইমরান ইবনু হুসাইন ও জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতেও হাদীস উল্লেখিত আছে। আবু ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান। ইবনু উকাইমা লাইসীর নাম ’উমারা, তাকে আমর ইবনু উকাইমাও বলা হয়ে থাকে। ইমাম যুহরীর কিছু ছাত্র এ হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন এবং তা নিম্নোক্ত বাক্যে উল্লেখ করেছেনঃ------- “যুহরী বলেছেন, লোকেরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এরূপ শুনল তখন হতে ইমামের পিছনে কিরা’আত পাঠ করা ছেড়ে দিল।” যারা ইমামের পিছনে কিরা’আত পাঠ করার স্বপক্ষে, এ হাদীসের আলোকে তাদের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলা যায় না। কেননা যে আবু হুরাইরা (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হতে উপরোল্লিখিত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তিনিই আবার তার নিকট হতে এ হাদীসও বর্ণনা করেছেনঃ “যে ব্যক্তি নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করেনি তার নামাজ ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ রয়ে গেল।” এ হাদীসের একজন বাহক তাকে (আবু হুরাইরাকে) বললেন, আমি কখনও ইমামের সাথে নামাজ আদায় করে থাকি। তিনি বললেন, নিজের মনে মনে তা পাঠ করে নাও। (হাদীসের বাহক বলতে আবু হুরাইরার কোন ছাত্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে)। —সহীহ। ইবনু মাজাহ– (৮৩৮), মুসলিম। আবু উসমান আন্নাহদী আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে এও বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এই আহবান জানাতে আদেশ দিলেন- “সূরা ফাতিহা পাঠ না করলে নামাজ হয় না।” হাদীস বিশারদগণ এই বিধান পছন্দ করেছেনঃ ইমাম যখন সশব্দে কিরাআত (সূরা ফাতিহা) পাঠ করবে, মুক্তাদীগণ তখন ফাতিহা পাঠ করবে না। বরং ইমাম যখন আয়াত পাঠ করে থামবে, সেই সুযোগে ফাঁকে ফাকে মুক্তাদীগণও ফাতিহা পাঠ করে নিবে। ইমামের পিছনে কিরাআত (সূরা ফাতিহা) পাঠ করার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বেশিরভাগ সাহাবা, তাবিঈ ও তাদের পরবর্তীগণের মতে, মুক্তাদীগণ ইমামের পিছনে কিরাআত (সূরা ফাতিহা) পাঠ করবে। ইমাম মালিক, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক, শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক একই রকম কথা বলেছেন। ইবনুল মুবারাক বলেন, আমি ইমামের পিছনে কিরাআত (ফাতিহা) পাঠ করি এবং অন্যান্য লোকও পাঠ করে থাকে, কিন্তু কুফাবাসীদের একদল পাঠ করে না। আমি যদিও ইমামের পিছনে ফাতিহা পাঠ করে থাকি, তবুও যারা পাঠ করে না তাদের নামাজও আমি জায়িয মনে করি। বিশেষভাবে একদল বিশেষজ্ঞ আলিম এ ব্যাপারে আপোষহীনতা মত অবলম্বন করেছেন। তারা বলেছেন, কোন ব্যক্তি হয় একাকী না হয় জামাআতে নামাজ আদায় করুক না কেন, সে যদি সূরা ফাতিহা পাঠ না করে তবে তার নামাজই হবে না। তারা উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে এ মত দিয়েছেন। উবাদা ইবনুস সামিত (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পরও ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের উপর আমল করেছেনঃ “যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করেনি তার নামাজ হয়নি।" ইমাম শাফিঈ, ইসহাক এবং অন্যান্যরাও এমন কথা বলেছেন। আহমাদ ইবনু হাম্বল বলেন, “যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করেনি তার নামাজ হয়নি” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণী একাকি নামাজ আদায়কারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ সে যদি একাকি নামাজ আদায় করে এবং সূরা ফাতিহা পাঠ না করে তবে তার নামাজ হবে না। তিনি তার এ দাবির সমর্থনে জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস পেশ করেছেন। জাবির (রাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নামাজ আদায় করল এবং তাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করল না, সে যেন নামাজই আদায় করল না, অবশ্য ইমামের পিছনে হলে অন্য কথা।” ইমাম আহমাদ বলেন, জাবির (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী। তিনি তার হাদীস “যে সূরা ফাতিহা পাঠ করেনি তার নামাজ হয়নি" -এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ হুকুম একাকী নামাজ পাঠকারীর বেলায় প্রযোজ্য। এতদসত্ত্বেও ইমাম আহমাদ (রহঃ) ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করার নীতি অনুসরণ করেছেন এবং (বলেছেন) লোকেরা যেন ইমামের সাথে নামাজ আদায় করলেও সূরা ফাতিহা পাঠ করা ছেড়ে না দেয়।
জামে‘ আত-তিরমিযী হাদিস ৩১২-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এক সশব্দে কিরাআত করা নামাজ শেষ করে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি এখন আমার সাথে কিরাআত পড়েছিল? একজন বললেন, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, আমি মনে মনে বলছিলাম, কুরআন পাঠ করতে আমি বাধাগ্রস্ত হচ্ছি কেন? এরপর বর্ণনাকারী বলেন, লোকেরা যখন তাঁর মুখে এ কথা শুনল, তখন জেহরি নামাজে তাঁর পেছনে কিরাআত করা থেকে বিরত থাকল। এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো জেহরি নামাজে ইমামের কিরাআত শোনা ও শৃঙ্খলা রাখা। এখানে সূরা ফাতিহার বিস্তারিত মাসআলা নয়, বরং ইমামের কিরাআতে বাধা না দেওয়া বিষয়টি স্পষ্ট। তাই জেহরি নামাজ, ইমামের পেছনে কিরাআত এবং নামাজের আদব বোঝার জন্য হাদিসটি গুরুত্বপূর্ণ।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- জেহরি নামাজে ইমামের কিরাআত মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত।
- ইমামের কিরাআতে বাধা তৈরি করা ঠিক নয়।
- নামাজের শৃঙ্খলা জামাতের সৌন্দর্য বাড়ায়।
- সাহাবীরা নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর নির্দেশ শুনে নিজেদের আমল সংশোধন করতেন।
