৪৫/১১৫. অধ্যায়ঃ
জামে‘ আত-তিরমিযী হাদিস ৩৫৭০ - কুরআন মুখস্থ রাখার দোয়া ও রাতের আমল
মুখস্থশক্তি বাড়ানোর দোয়া
কুরআন মুখস্থ রাখার দোয়া: রাতের নামাজ ও আল্লাহর সাহায্য
জামে‘ আত-তিরমিযী : ৩৫৭০
জামে‘ আত-তিরমিযীহাদিস নম্বর ৩৫৭০
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ الْحَسَنِ، حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الدِّمَشْقِيُّ، حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ، حَدَّثَنَا ابْنُ جُرَيْجٍ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي رَبَاحٍ، وَعِكْرِمَةَ، مَوْلَى ابْنِ عَبَّاسٍ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّهُ قَالَ بَيْنَمَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ إِذْ جَاءَهُ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ فَقَالَ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي تَفَلَّتَ هَذَا الْقُرْآنُ مِنْ صَدْرِي فَمَا أَجِدُنِي أَقْدِرُ عَلَيْهِ . فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ «يَا أَبَا الْحَسَنِ أَفَلاَ أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ يَنْفَعُكَ اللَّهُ بِهِنَّ وَيَنْفَعُ بِهِنَّ مَنْ عَلَّمْتَهُ وَيُثَبِّتُ مَا تَعَلَّمْتَ فِي صَدْرِكَ». قَالَ أَجَلْ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَعَلِّمْنِي . قَالَ «إِذَا كَانَ لَيْلَةُ الْجُمُعَةِ فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَقُومَ فِي ثُلُثِ اللَّيْلِ الآخِرِ فَإِنَّهَا سَاعَةٌ مَشْهُودَةٌ وَالدُّعَاءُ فِيهَا مُسْتَجَابٌ وَقَدْ قَالَ أَخِي يَعْقُوبُ لِبَنِيهِ : ﴾سوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي ﴿ يَقُولُ حَتَّى تَأْتِيَ لَيْلَةُ الْجُمُعَةِ فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقُمْ فِي وَسَطِهَا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقُمْ فِي أَوَّلِهَا فَصَلِّ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ تَقْرَأُ فِي الرَّكْعَةِ الأُولَى بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَسُورَةِ يس وَفِي الرَّكْعَةِ الثَّانِيَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَ( حم ) الدُّخَانَ وَفِي الرَّكْعَةِ الثَّالِثَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَالم تَنْزِيلُ السَّجْدَةَ وَفِي الرَّكْعَةِ الرَّابِعَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَتَبَارَكَ الْمُفَصَّلَ فَإِذَا فَرَغْتَ مِنَ التَّشَهُّدِ فَاحْمَدِ اللَّهَ وَأَحْسِنِ الثَّنَاءَ عَلَى اللَّهِ وَصَلِّ عَلَىَّ وَأَحْسِنْ وَعَلَى سَائِرِ النَّبِيِّينَ وَاسْتَغْفِرْ لِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَلإِخْوَانِكَ الَّذِينَ سَبَقُوكَ بِالإِيمَانِ ثُمَّ قُلْ فِي آخِرِ ذَلِكَ اللَّهُمَّ ارْحَمْنِي بِتَرْكِ الْمَعَاصِي أَبَدًا مَا أَبْقَيْتَنِي وَارْحَمْنِي أَنْ أَتَكَلَّفَ مَا لاَ يَعْنِينِي وَارْزُقْنِي حُسْنَ النَّظَرِ فِيمَا يُرْضِيكَ عَنِّي اللَّهُمَّ بَدِيعَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ ذَا الْجَلاَلِ وَالإِكْرَامِ وَالْعِزَّةِ الَّتِي لاَ تُرَامُ أَسْأَلُكَ يَا اللَّهُ يَا رَحْمَنُ بِجَلاَلِكَ وَنُورِ وَجْهِكَ أَنْ تُلْزِمَ قَلْبِي حِفْظَ كِتَابِكَ كَمَا عَلَّمْتَنِي وَارْزُقْنِي أَنْ أَتْلُوَهُ عَلَى النَّحْوِ الَّذِي يُرْضِيكَ عَنِّي اللَّهُمَّ بَدِيعَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ ذَا الْجَلاَلِ وَالإِكْرَامِ وَالْعِزَّةِ الَّتِي لاَ تُرَامُ أَسْأَلُكَ يَا اللَّهُ يَا رَحْمَنُ بِجَلاَلِكَ وَنُورِ وَجْهِكَ أَنْ تُنَوِّرَ بِكِتَابِكَ بَصَرِي وَأَنْ تُطْلِقَ بِهِ لِسَانِي وَأَنْ تُفَرِّجَ بِهِ عَنْ قَلْبِي وَأَنْ تَشْرَحَ بِهِ صَدْرِي وَأَنْ تَغْسِلَ بِهِ بَدَنِي لأَنَّهُ لاَ يُعِينُنِي عَلَى الْحَقِّ غَيْرُكَ وَلاَ يُؤْتِيهِ إِلاَّ أَنْتَ وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيمِ يَا أَبَا الْحَسَنِ تَفْعَلُ ذَلِكَ ثَلاَثَ جُمَعٍ أَوْ خَمْسَ أَوْ سَبْعَ تُجَابُ بِإِذْنِ اللَّهِ وَالَّذِي بَعَثَنِي بِالْحَقِّ مَا أَخْطَأَ مُؤْمِنًا قَطُّ " . قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبَّاسٍ فَوَاللَّهِ مَا لَبِثَ عَلِيٌّ إِلاَّ خَمْسًا أَوْ سَبْعًا حَتَّى جَاءَ عَلِيٌّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فِي مِثْلِ ذَلِكَ الْمَجْلِسِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي كُنْتُ فِيمَا خَلاَ لاَ آخُذُ إِلاَّ أَرْبَعَ آيَاتٍ أَوْ نَحْوَهُنَّ وَإِذَا قَرَأْتُهُنَّ عَلَى نَفْسِي تَفَلَّتْنَ وَأَنَا أَتَعَلَّمُ الْيَوْمَ أَرْبَعِينَ آيَةً أَوْ نَحْوَهَا وَإِذَا قَرَأْتُهَا عَلَى نَفْسِي فَكَأَنَّمَا كِتَابُ اللَّهِ بَيْنَ عَيْنَىَّ وَلَقَدْ كُنْتُ أَسْمَعُ الْحَدِيثَ فَإِذَا رَدَّدْتُهُ تَفَلَّتَ وَأَنَا الْيَوْمَ أَسْمَعُ الأَحَادِيثَ فَإِذَا تَحَدَّثْتُ بِهَا لَمْ أَخْرِمْ مِنْهَا حَرْفًا . فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عِنْدَ ذَلِكَ «مُؤْمِنٌ وَرَبِّ الْكَعْبَةِ يَا أَبَا الْحَسَنِ».قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ حَدِيثِ الْوَلِيدِ بْنِ مُسْلِمٍ .
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
কোন এক সময় আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ছিলাম। তখন আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) এসে বলেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক! এই কোরআন আমার হৃদয় হতে বেরিয়ে যায় (মুখস্থ থাকে না)। আমি তা নিজের মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম নই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বলেনঃ হে আবুল হাসান! আমি কি তোমাকে এমন কথা শিখাব না যার দ্বারা আল্লাহ তা’আলা তোমাকে উপকৃত করবেন, তুমি যাকে তা শিখাবে তাকেও উপকৃত করবেন এবং যা তুমি শিখবে তাও তোমার হৃদয়ের মধ্যে গেঁথে থাকবে? তিনি বলেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তা আমাকে শিখিয়ে দিন।তিনি বলেনঃ জুমু’আর রাত আসার পর তোমার পক্ষে সম্ভব হলে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে (নামাজে) দাঁড়িয়ে যাও। এ সময় আল্লাহ তা’আলার ফেরেশতা হাযির হয় এবং তখন দোয়া কবুল হয়। আমার ভাই ইয়াকূব (আঃ) তাঁর সন্তানদের বলেছিলেনঃ আমি তোমাদের জন্য আমার রবের নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করব। পরিশেষে তিনি জুমু’আর রাতেই তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। যদি তুমি (তখন নামাজ আদায় করতে) সক্ষম না হও তাহলে মধ্য রাতে দাঁড়াও এবং তখনও সম্ভব না হলে রাতের প্রথম তৃতীয়াংশে দাঁড়াও এবং চার রাক’আত (নফল) নামাজ আদায় কর।প্রথম রাক’আতে সূরা আল-ফাতিহার পর সূরা ইয়াসীন, দ্বিতীয় রাক’আতে সূরা আল-ফাতিহার পর সূরা হা-মীম আদ-দুখান, তৃতীয় রাক’আতে সূরা আল-ফাতিহার পর সূরা আলিফ-লাম-মীম তানযীলুস সাজদা এবং চতুর্থ রাক’আতে সূরা আল-ফাতিহার পর সূরা তাবারাকা আল-মুফাস্সাল (সূরা আল-মূল্ক) পাঠ করবে। তুমি তাশাহুদ পাঠ শেষ করে আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা করবে এবং ভালভাবে তাঁর গুণকীর্তন করবে, তারপর আমার উপর দরূদ পাঠ করবে এবং সকল নাবী-রাসূলের প্রতি ভালভাবে দরূদ ও সালাম পাঠ করবে, তারপর সকল মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদের জন্য এবং তোমার যে সকল ভাই ঈমানের সাথে অতীতে ইন্তিকাল করেছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।সবশেষে তুমি বলবেঃ “হে আল্লাহ! পাপাচার ছেড়ে দিতে আমাকে অনুগ্রহ কর যাবত তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রাখ, আমার প্রতি দয়া কর যেন আমি নিষ্ফল আচরণে জড়িয়ে না পড়ি এবং তোমার পছন্দনীয় বিষয়ে আমাকে ভালভাবে ভাববার তাওফীক দাও। হে আল্লাহ! আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টা, মর্যাদা ও মহত্বের অধিকারী এবং এমন মর্যাদার অধিকারী যার আকাঙ্ক্ষা করা যায় না, আমি তোমার নিকটে প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ, হে রহমান, তোমার অসীম মহত্ব ও চেহারার নূরের উসীলায় আমি প্রার্থনা করি যে, আমার অন্তরে তোমার কিতাবকে বদ্ধমূল করে দাও যেমন তুমি আমাকে শিখিয়েছ, যে ভাবে পাঠ করলে তুমি সন্তুষ্ট হও সেইভাবে পাঠ করতে আমাকে তাওফীক দান কর, হে আল্লাহ, আকাশ ও জমীনের সৃষ্টিকর্তা মর্যাদা ও মহত্বের অধিকারী যার আকাঙ্ক্ষা করা যায় না।হে দয়াময়, তোমার মহত্ব ও নূরের উসীলায় আমি প্রার্থনা করছি। তুমি তোমার কিতাবের উসীলায় আমার চক্ষুকে উজ্জ্বল করে দাও, তা দিয়ে আমার যবান (জিহ্বা) খুলে দাও এবং তা দিয়ে আমার অন্তরকে উন্মুক্ত কর, আর তা দিয়ে আমার বক্ষকে প্রসারিত, আমার দেহটিকে তা দিয়ে ধুয়ে ফেল। সত্যের উপর তুমি ব্যতীত অন্য কেউই আমার সাহায্য করতে পারে না এবং তুমি ব্যতীত কেউই আমাকে তা দিতে পারে না। সুউচ্চ ও সুমহান আল্লাহ ছাড়া অনিষ্ট রোধ করার এবং কল্যাণ অর্জনের আর কোন শক্তি নেই। ”হে আবুল হাসান! তুমি তিন অথবা পাঁচ অথবা সাত জুমু’আ পর্যন্ত এ আমল করতে থাক। আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছায় তোমার দোয়া কবুল হবে। সেই মহান সত্তার কসম, যিনি আমাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন! কোন মু’মিনই (এ দোয়া পাঠ করে) কখনও বঞ্চিত হবে না।ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা’আলার শপথ! আলী (রাঃ) পাঁচ অথবা সাত জুমু’আ পর্যন্ত এই আমল করে একদিন এরকম এক আসরে এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আগে আমি চার আয়াত পাঠ করতাম আর তা আমার হৃদয় হতে চলে যেত। আর এখন আমি চল্লিশ আয়াত অথবা এরকম পরিমাণ মুখস্থ করে যখন পাঠ করি তখন মনে হয় যেন আল্লাহ তা’আলার কিতাব আমার চোখের সামনে উন্মুক্ত আছে। একইভাবে আমি হাদীস শুনতাম এবং পরে তা পুনঃপাঠ করতে গিয়ে দেখতাম যে, তা আমার অন্তর থেকে চলে গেছে। আর এখন আমি হাদীসসমূহ শুনি এবং পরে তা পুনঃপাঠ করি এবং তা হতে একটি শব্দও বাদ পড়ে না। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে বলেনঃ হে হাসানের পিতা, কা’বার প্রভুর কসম! অবশ্যই তুমি একজন মু’মিন।
আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান গারীব। ওয়ালিদ ইবনু মুসলিমের রিওয়ায়াত হিসেবেই শুধু আমরা এ হাদীস জেনেছি।
জামে‘ আত-তিরমিযী হাদিস ৩৫৭০-এর সারসংক্ষেপ
এই দীর্ঘ হাদিসে আলী (রাঃ) কুরআন মুখস্থ রাখতে কষ্টের কথা বলেন। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) তাকে জুমু’আর রাতে নামাজ, নির্দিষ্ট সূরা পাঠ, আল্লাহর প্রশংসা, নবীজি ও অন্যান্য নবীদের প্রতি দরুদ, মুমিন পুরুষ-নারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং শেষে একটি দীর্ঘ দোয়ার পদ্ধতি শেখান। দোয়ার মূল কথা হলো—গুনাহ ছাড়ার তাওফিক, অকারণ কাজে না জড়ানো, আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয় ভাবার শক্তি এবং আল্লাহর কিতাবকে অন্তরে দৃঢ় করে দেওয়া। কুরআন হিফজ, কুরআন মুখস্থ রাখার দোয়া, রাতের নামাজ, দরুদ ও ইস্তিগফার—এসব এই হাদিসের মূল দিক। এখানে যা বলা হয়েছে সেটিই মূল; এটিকে সব মানুষের জন্য আলাদা নিয়ম বানিয়ে বাড়তি দাবি করা ঠিক নয়। তবে হাদিসটি আল্লাহর সাহায্য ছাড়া জ্ঞান ও হিফজ স্থায়ী হয় না—এই বড় শিক্ষা দেয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- কুরআন শেখা ও ধরে রাখার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া জরুরি।
- রাতের নামাজ, দরুদ ও ইস্তিগফার দোয়ার অংশ হিসেবে এসেছে।
- গুনাহ ছাড়ার তাওফিক চাওয়া জ্ঞান ধরে রাখার দোয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
- হাদিসে শেখানো পদ্ধতির বাইরে বাড়তি শর্ত যোগ করা উচিত নয়।
