২৫/১৩. অধ্যায়ঃ

মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৮৯৩-[১] - আসল সম্মান তাকওয়ার মধ্যে

বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব - প্রথম অনুচ্ছেদ

الْمُفَاخَرَةِশব্দটি বাবেمفاعلةএর মাসদার। মূল অক্ষরفخرঅর্থ গর্ব করা, গৌরব করা। এটা দু’ প্রকার : ১. নিন্দনীয়। যেমন- প্রতারণার উদ্দেশে বা পার্থিব কোন ব্যক্তির স্বার্থ চরিতার্থের জন্য মিথ্যা বংশ গৌরব করা। এটা অবৈধ।২. প্রশংসনীয়। যেমন, কাফির মুশরিকদের সাথে যুদ্ধের সময় বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশে গৌরবের কথা প্রকাশ করা। এটা জায়িয। মহান আল্লাহ বলেন,وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ’‘তুমি তোমার রবের নি‘আমাতের কথা বর্ণনা কর।’’ (সূরাহ্ আয্ যুহা- ৯৩ : ১১)নিন্দনীয় গর্ব করা থেকে সাবধান করতে নবী (ﷺ) বলেন,عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ،إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ، وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ، وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ، أَنْتُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، لَيَدَعَنَّ رِجَالٌ فَخْرَهُمْ بِأَقْوَامٍ، إِنَّمَا هُمْ فَحْمٌ مِنْ فَحْمِ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُونُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللهِ مِنَ الْجِعْلَانِ الَّتِي تَدْفَعُ بِأَنْفِهَا النَّتِنَআবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মহান আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার ও পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করার প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন। মু‘মিন হলো আল্লাহভীরু আর পাপী হলো দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম সন্তান আর আদম (আঃ) মাটির তৈরি। লোকেদের উচিত বিশেষ গোত্রেরভুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে অহংকার না করা। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। অন্যথায় তোমরা মহান আল্লাহর নিকট ময়লার সেই কীটের চেয়ে জঘন্য হবে যে তার নাক দিয়ে ময়লা ঠেলে নিয়ে যায়। (আবূ দাঊদ ৫১১৬, তিরমিযী ৪২৩৩ : হাসান)মির্‘আতুল মাফাতীহ-এর মধ্যে ‘আল্লামা মুবারকপূরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বংশীয় বা গোত্রীয় অহংকার বলা হয়, বাপ দাদার অথবা বংশের নাম উল্লেখ করে গর্ব করাকে। এ কাজ অন্যকে ছোট করে নিজের মর্তবাকে উঁচু করে তোলার জন্য করা হয়। সেজন্য এ কাজ জায়িয নেই। অন্যের গোত্রকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এ কাজে অন্যকে ছোট করা হয় বা লজ্জায় ফেলা হয়।আরالعصبيةশব্দের অর্থ হলো-স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব করা। পরিভাষায় রক্তের বন্ধনে আবদ্ধতার অনুভূতি এবং সেই অনুভূতির কারণে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করাকেالعصبيةবলা হয়। আধুনিক পরিভাষায় একে গোত্রবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাও বলা যেতে পারে। এটি একটি জাহিলী প্রথা। এ ব্যাপারে হাদীসে রয়েছে, আল হাবিস আল আশ্‘আরী হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেনঃوَمَنْ ادَّعٰى دَعْوَى الجَاهِلِيَّةِ فَإِنَّهٗ مِنْ جُثَا جَهَنَّمَ، فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ وَإِنْ صَلّٰى وَصَامَ؟ قَالَ: وَإِنْ صَلّٰى وَصَامَ، فَادْعُوا بِدَعْوَى اللهِ الَّذِي سَمَّاكُمُ المُسْلِمِينَ المُؤْمِنِينَ، عِبَادَ اللهِআর যে লোক জাহিলিয়্যাতের ‘আমলের রীতি-নীতির দিকে আহবান করে সে জাহান্নামীদের দলভুক্ত। জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে সালাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও? তিনি (ﷺ) বললেনঃ হ্যাঁ। সে সালাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও। সুতরাং তোমরা সেই আল্লাহ তা‘আলার ডাকেই নিজেদেরকে ডাকবে যিনি তোমাদেরকে মুসলিম, মু‘মিন ও আল্লাহ তা‘আলার বান্দা নাম রেখেছেন।(তিরমিযী ২৮৬৩, মিশকাত ৩৬৯৪)অন্য হাদীসে এসেছে-عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: اقْتَتَلَ غُلَامَانِ غُلَامٌ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ، وَغُلَامٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَنَادَى الْمُهَاجِرُ أَوِ الْمُهَاجِرُونَ، يَا لَلْمُهَاجِرِينَ وَنَادَى الْأَنْصَارِيُّ يَا لَلْأَنْصَارِ، فَخَرَجَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: مَا هٰذَا دَعْوٰى أَهْلِ الْجَاهِلِيَّةِ.জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার ও মুহাজিরদের দু’জন বালক মারামারি করলে মুহাজিরগণ তাদের মুহাজির ভাইদের এবং আনসারগণ তাদের আনসার ভাইদের ডাকলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বের হয়ে এসে বললেন, এটা কি জাহিলী যুগের সেই (মারামারির) ডাকার মতো? (মুসলিম ৬২-[২৫৮৪]) [সম্পাদক]

আল্লাহর কাছে সম্মানিত কে? তাকওয়ার হাদিস

মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৪৮৯৩-[১]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَي النَّاس أكْرم؟ فَقَالَ: «أَكْرَمُهُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاهُمْ». قَالُوا: لَيْسَ عَنْ هَذَا نَسْأَلُكَ. قَالَ: «فَأَكْرَمُ النَّاسِ يُوسُفُ نَبِيُّ اللَّهِ ابْنُ نَبِيِّ اللَّهِ ابْنِ خَلِيلِ اللَّهِ» . قَالُوا: لَيْسَ عَن هَذَا نَسْأَلك. قَالَ: «فَمِمَّنْ مَعَادِنِ الْعَرَبِ تَسْأَلُونِي؟» قَالُوا: نَعَمْ. قَالَ: فَخِيَارُكُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُكُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقُهُوا. مُتَّفق عَلَيْهِ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কে সবচেয়ে সম্মানিত? তিনি (ﷺ) বললেন : আল্লাহ তা'আলার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত সে ব্যক্তি, যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু। সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন : আমরা এ দৃষ্টিকোণ থেকে জিজ্ঞেস করিনি। তিনি (ﷺ) বললেন : সকল মানুষের মধ্যে সম্মানিত ব্যক্তি ইউসুফ (আঃ), যিনি আল্লাহর নবী এবং আল্লাহর নবীর পুত্র এবং আল্লাহর নবীর পৌত্র এবং আল্লাহর বন্ধু ইব্রাহীম (আঃ)-এর প্রপৌত্র ছিলেন।সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) বললেন : আমরা এ দৃষ্টিকোণ থেকেও জিজ্ঞেস করিনি। তিনি (ﷺ) বললেন : ‘আরবদের বংশ ও গোত্র সম্পর্কে কি জিজ্ঞেস করছ? সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) বললেন : জ্বী হ্যাঁ। তিনি (ﷺ) বললেন : তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অন্ধকার যুগে ভালো ছিল, সে ইসলামী যুগেও ভালো, যখন সে দীন ইসলামের সম্যক অবহিত।

[১] সহীহ : বুখারী ৪৬৮৯, মুসলিম ১৬৮-(২৩৭৮), ‘নাসায়ী’র কুবরা ১১২৪৯, সহীহুল জামি‘ ৫৫৭৮, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১৮৪৬, মা‘রিফাতুস্ সুনান ওয়াল আসার ৩৮, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক ২০৬৪১, মুসনাদুশ্ শাফি‘ঈ ১৩৩৭, আহমাদ ১৮৯৪৫, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৬০৭০, শু‘আবুল ঈমান ১৭০১, সুনানুদ্ দারিমী ২২৩, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৩০৫, আল মুসতাদরাক ৫০৬১।

অনুবাদের উৎস

প্রকাশক:
হাদিস একাডেমী
মতামত ও সংশোধনের শর্তাবলি

মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৮৯৩-[১]-এর সারসংক্ষেপ

এই হাদিসে সম্মান বা মর্যাদার আসল মানদণ্ড নিয়ে শিক্ষা আছে। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কে সবচেয়ে সম্মানিত? তিনি প্রথমে বললেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু। প্রশ্নকারীরা অন্য দিক জানতে চাইলে তিনি ইউসুফ (আঃ)-এর কথা বললেন—তিনি নবী, নবীর পুত্র, নবীর পৌত্র এবং ইব্রাহীম (আঃ)-এর বংশধর। এরপর আরব বংশের প্রসঙ্গে তিনি বললেন, জাহিলিয়াতে যারা ভালো ছিল, ইসলামেও তারা ভালো, যদি তারা দীন সম্পর্কে বুঝ অর্জন করে। তাই তাকওয়া হাদিস হিসেবে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বংশ নয়; আল্লাহভীতি, ভালো চরিত্র এবং দীন বোঝা মানুষের মর্যাদাকে অর্থপূর্ণ করে।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • আল্লাহর কাছে সম্মানের মূল মানদণ্ড তাকওয়া।
  • উচ্চ বংশ থাকলেও দীন বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
  • ইউসুফ (আঃ)-এর মর্যাদা নবীদের ধারার সঙ্গে যুক্ত।
  • ইসলামে ভালো চরিত্র ও বুঝ মানুষকে সম্মানিত করে।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন