২৫/১৩. অধ্যায়ঃ

মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৮৯৫-[৩] - হুনাইনের দিনে নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর দৃঢ়তা

বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব - প্রথম অনুচ্ছেদ

الْمُفَاخَرَةِশব্দটি বাবেمفاعلةএর মাসদার। মূল অক্ষরفخرঅর্থ গর্ব করা, গৌরব করা। এটা দু’ প্রকার : ১. নিন্দনীয়। যেমন- প্রতারণার উদ্দেশে বা পার্থিব কোন ব্যক্তির স্বার্থ চরিতার্থের জন্য মিথ্যা বংশ গৌরব করা। এটা অবৈধ।২. প্রশংসনীয়। যেমন, কাফির মুশরিকদের সাথে যুদ্ধের সময় বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশে গৌরবের কথা প্রকাশ করা। এটা জায়িয। মহান আল্লাহ বলেন,وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ’‘তুমি তোমার রবের নি‘আমাতের কথা বর্ণনা কর।’’ (সূরাহ্ আয্ যুহা- ৯৩ : ১১)নিন্দনীয় গর্ব করা থেকে সাবধান করতে নবী (ﷺ) বলেন,عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ،إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ، وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ، وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ، أَنْتُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، لَيَدَعَنَّ رِجَالٌ فَخْرَهُمْ بِأَقْوَامٍ، إِنَّمَا هُمْ فَحْمٌ مِنْ فَحْمِ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُونُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللهِ مِنَ الْجِعْلَانِ الَّتِي تَدْفَعُ بِأَنْفِهَا النَّتِنَআবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মহান আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার ও পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করার প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন। মু‘মিন হলো আল্লাহভীরু আর পাপী হলো দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম সন্তান আর আদম (আঃ) মাটির তৈরি। লোকেদের উচিত বিশেষ গোত্রেরভুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে অহংকার না করা। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। অন্যথায় তোমরা মহান আল্লাহর নিকট ময়লার সেই কীটের চেয়ে জঘন্য হবে যে তার নাক দিয়ে ময়লা ঠেলে নিয়ে যায়। (আবূ দাঊদ ৫১১৬, তিরমিযী ৪২৩৩ : হাসান)মির্‘আতুল মাফাতীহ-এর মধ্যে ‘আল্লামা মুবারকপূরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বংশীয় বা গোত্রীয় অহংকার বলা হয়, বাপ দাদার অথবা বংশের নাম উল্লেখ করে গর্ব করাকে। এ কাজ অন্যকে ছোট করে নিজের মর্তবাকে উঁচু করে তোলার জন্য করা হয়। সেজন্য এ কাজ জায়িয নেই। অন্যের গোত্রকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এ কাজে অন্যকে ছোট করা হয় বা লজ্জায় ফেলা হয়।আরالعصبيةশব্দের অর্থ হলো-স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব করা। পরিভাষায় রক্তের বন্ধনে আবদ্ধতার অনুভূতি এবং সেই অনুভূতির কারণে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করাকেالعصبيةবলা হয়। আধুনিক পরিভাষায় একে গোত্রবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাও বলা যেতে পারে। এটি একটি জাহিলী প্রথা। এ ব্যাপারে হাদীসে রয়েছে, আল হাবিস আল আশ্‘আরী হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেনঃوَمَنْ ادَّعٰى دَعْوَى الجَاهِلِيَّةِ فَإِنَّهٗ مِنْ جُثَا جَهَنَّمَ، فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ وَإِنْ صَلّٰى وَصَامَ؟ قَالَ: وَإِنْ صَلّٰى وَصَامَ، فَادْعُوا بِدَعْوَى اللهِ الَّذِي سَمَّاكُمُ المُسْلِمِينَ المُؤْمِنِينَ، عِبَادَ اللهِআর যে লোক জাহিলিয়্যাতের ‘আমলের রীতি-নীতির দিকে আহবান করে সে জাহান্নামীদের দলভুক্ত। জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে সালাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও? তিনি (ﷺ) বললেনঃ হ্যাঁ। সে সালাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও। সুতরাং তোমরা সেই আল্লাহ তা‘আলার ডাকেই নিজেদেরকে ডাকবে যিনি তোমাদেরকে মুসলিম, মু‘মিন ও আল্লাহ তা‘আলার বান্দা নাম রেখেছেন।(তিরমিযী ২৮৬৩, মিশকাত ৩৬৯৪)অন্য হাদীসে এসেছে-عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: اقْتَتَلَ غُلَامَانِ غُلَامٌ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ، وَغُلَامٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَنَادَى الْمُهَاجِرُ أَوِ الْمُهَاجِرُونَ، يَا لَلْمُهَاجِرِينَ وَنَادَى الْأَنْصَارِيُّ يَا لَلْأَنْصَارِ، فَخَرَجَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: مَا هٰذَا دَعْوٰى أَهْلِ الْجَاهِلِيَّةِ.জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার ও মুহাজিরদের দু’জন বালক মারামারি করলে মুহাজিরগণ তাদের মুহাজির ভাইদের এবং আনসারগণ তাদের আনসার ভাইদের ডাকলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বের হয়ে এসে বললেন, এটা কি জাহিলী যুগের সেই (মারামারির) ডাকার মতো? (মুসলিম ৬২-[২৫৮৪]) [সম্পাদক]

হুনাইনের দিনে নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর সাহস

মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৪৮৯৫-[৩]

وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: فِي يَوْمِ حُنَيْنٍ كَانَ أَبُو سُفْيَانَ بْنُ الْحَارِثِ آخِذًا بِعِنَانِ بَغْلَتِهِ يَعْنِي بَغْلَةَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا غَشِيَهُ الْمُشْرِكُونَ نَزَلَ فَجَعَلَ يَقُولُ «أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبَ أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبْ» قَالَ: فَمَا رُئِيَ مِنَ النَّاسِ يَوْمَئِذٍ أَشَدُّ مِنْهُ. مُتَّفق عَلَيْهِ

বারা ইবনু ‘আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

হুনায়নের যুদ্ধের দিন আবূ সুফ্ইয়ান ইবনু হারিস নবী (ﷺ)-এর খচ্চরে লাগাম ধরে রেখেছিলেন। যখন মুশরিকরা তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খচ্চরের পৃষ্ঠ থেকে অবতরণ করলেন এবং বলতে লাগলেন, “আমি নবী, না মিথ্যার কোন সূত্র– আমি যে ‘আবদুল মুতালিব-এর পুত্র।” রাবী বলেন, সেদিন তাঁর চেয়ে অধিক বিক্রমপূর্ণ আর কাউকেও দেখা যায়নি।

[১] সহীহ : বুখারী ২৮৬৪, ২৮৭৪, ২৯৩০, ৩০৪২, ৪৩১৫; মুসলিম ৭৯-(১৭৭৬), ৮০-(১৭৭৬); তিরমিযী ১৬৮৮, সহীহুল জামি‘ ১৪৫১, মুসান্নাফ ১৮৪৬৮, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ১৭২৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪৭৭০, সুনানুন্ নাসায়ী আল কুবরা ৮৬৩৮, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৭/১৩২, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ৪৯১৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৩৬৭৫।

অনুবাদের উৎস

প্রকাশক:
হাদিস একাডেমী
মতামত ও সংশোধনের শর্তাবলি

মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৮৯৫-[৩]-এর সারসংক্ষেপ

এই হাদিসে হুনাইনের যুদ্ধের এক কঠিন মুহূর্ত তুলে ধরা হয়েছে। আবূ সুফিয়ান ইবনু হারিস (রাঃ) নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর খচ্চরের লাগাম ধরে ছিলেন। যখন মুশরিকরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল, তখন রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) খচ্চর থেকে নেমে বললেন, আমি নবী, এতে মিথ্যা নেই; আমি আবদুল মুত্তালিবের পুত্র। রাবী বলেন, সেদিন তাঁর চেয়ে অধিক দৃঢ় ও সাহসী কাউকে দেখা যায়নি। এখানে সাহস মানে অহংকার নয়; বরং সত্য অবস্থানে অটল থাকা। নবীর সাহস হাদিস হিসেবে এটি দেখায়, বিপদের সময়ও তিনি সত্য ঘোষণা করেছেন এবং পিছিয়ে যাননি। মুসলিমের জন্য শিক্ষা হলো, ভয় থাকলেও সত্য ও দায়িত্বের জায়গায় দৃঢ় থাকা দরকার।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • কঠিন মুহূর্তে সত্যের ওপর অটল থাকা বড় গুণ।
  • সাহস অহংকার নয়; দায়িত্বের জায়গায় স্থির থাকা।
  • নবী (صلى الله عليه وسلم) বিপদের সময়ও নিজ পরিচয় সত্যভাবে ঘোষণা করেছেন।
  • পরিস্থিতি কঠিন হলে নেতৃত্বের দৃঢ়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন