২৫/১৩. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৮৯৬-[৪] - ইবরাহীম (আঃ)-এর মর্যাদা স্মরণ
বংশগৌরব ও পক্ষপাতিত্ব - প্রথম অনুচ্ছেদ
الْمُفَاخَرَةِশব্দটি বাবেمفاعلةএর মাসদার। মূল অক্ষরفخرঅর্থ গর্ব করা, গৌরব করা। এটা দু’ প্রকার : ১. নিন্দনীয়। যেমন- প্রতারণার উদ্দেশে বা পার্থিব কোন ব্যক্তির স্বার্থ চরিতার্থের জন্য মিথ্যা বংশ গৌরব করা। এটা অবৈধ।২. প্রশংসনীয়। যেমন, কাফির মুশরিকদের সাথে যুদ্ধের সময় বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশে গৌরবের কথা প্রকাশ করা। এটা জায়িয। মহান আল্লাহ বলেন,وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ’‘তুমি তোমার রবের নি‘আমাতের কথা বর্ণনা কর।’’ (সূরাহ্ আয্ যুহা- ৯৩ : ১১)নিন্দনীয় গর্ব করা থেকে সাবধান করতে নবী (ﷺ) বলেন,عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ،إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ، وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ مُؤْمِنٌ تَقِيٌّ، وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ، أَنْتُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، لَيَدَعَنَّ رِجَالٌ فَخْرَهُمْ بِأَقْوَامٍ، إِنَّمَا هُمْ فَحْمٌ مِنْ فَحْمِ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُونُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللهِ مِنَ الْجِعْلَانِ الَّتِي تَدْفَعُ بِأَنْفِهَا النَّتِنَআবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মহান আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার ও পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করার প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন। মু‘মিন হলো আল্লাহভীরু আর পাপী হলো দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম সন্তান আর আদম (আঃ) মাটির তৈরি। লোকেদের উচিত বিশেষ গোত্রেরভুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে অহংকার না করা। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। অন্যথায় তোমরা মহান আল্লাহর নিকট ময়লার সেই কীটের চেয়ে জঘন্য হবে যে তার নাক দিয়ে ময়লা ঠেলে নিয়ে যায়। (আবূ দাঊদ ৫১১৬, তিরমিযী ৪২৩৩ : হাসান)মির্‘আতুল মাফাতীহ-এর মধ্যে ‘আল্লামা মুবারকপূরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ বংশীয় বা গোত্রীয় অহংকার বলা হয়, বাপ দাদার অথবা বংশের নাম উল্লেখ করে গর্ব করাকে। এ কাজ অন্যকে ছোট করে নিজের মর্তবাকে উঁচু করে তোলার জন্য করা হয়। সেজন্য এ কাজ জায়িয নেই। অন্যের গোত্রকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এ কাজে অন্যকে ছোট করা হয় বা লজ্জায় ফেলা হয়।আরالعصبيةশব্দের অর্থ হলো-স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব করা। পরিভাষায় রক্তের বন্ধনে আবদ্ধতার অনুভূতি এবং সেই অনুভূতির কারণে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করাকেالعصبيةবলা হয়। আধুনিক পরিভাষায় একে গোত্রবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাও বলা যেতে পারে। এটি একটি জাহিলী প্রথা। এ ব্যাপারে হাদীসে রয়েছে, আল হাবিস আল আশ্‘আরী হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেনঃوَمَنْ ادَّعٰى دَعْوَى الجَاهِلِيَّةِ فَإِنَّهٗ مِنْ جُثَا جَهَنَّمَ، فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ وَإِنْ صَلّٰى وَصَامَ؟ قَالَ: وَإِنْ صَلّٰى وَصَامَ، فَادْعُوا بِدَعْوَى اللهِ الَّذِي سَمَّاكُمُ المُسْلِمِينَ المُؤْمِنِينَ، عِبَادَ اللهِআর যে লোক জাহিলিয়্যাতের ‘আমলের রীতি-নীতির দিকে আহবান করে সে জাহান্নামীদের দলভুক্ত। জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে সালাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও? তিনি (ﷺ) বললেনঃ হ্যাঁ। সে সালাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও। সুতরাং তোমরা সেই আল্লাহ তা‘আলার ডাকেই নিজেদেরকে ডাকবে যিনি তোমাদেরকে মুসলিম, মু‘মিন ও আল্লাহ তা‘আলার বান্দা নাম রেখেছেন।(তিরমিযী ২৮৬৩, মিশকাত ৩৬৯৪)অন্য হাদীসে এসেছে-عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: اقْتَتَلَ غُلَامَانِ غُلَامٌ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ، وَغُلَامٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، فَنَادَى الْمُهَاجِرُ أَوِ الْمُهَاجِرُونَ، يَا لَلْمُهَاجِرِينَ وَنَادَى الْأَنْصَارِيُّ يَا لَلْأَنْصَارِ، فَخَرَجَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: مَا هٰذَا دَعْوٰى أَهْلِ الْجَاهِلِيَّةِ.জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার ও মুহাজিরদের দু’জন বালক মারামারি করলে মুহাজিরগণ তাদের মুহাজির ভাইদের এবং আনসারগণ তাদের আনসার ভাইদের ডাকলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বের হয়ে এসে বললেন, এটা কি জাহিলী যুগের সেই (মারামারির) ডাকার মতো? (মুসলিম ৬২-[২৫৮৪]) [সম্পাদক]
সৃষ্টির সেরা প্রসঙ্গে ইবরাহীম (আঃ)-এর হাদিস
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৪৮৯৬-[৪]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৪৮৯৬-[৪]
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا خَيْرَ الْبَرِيَّةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «ذَاكَ إِبْرَاهِيم». رَوَاهُ مُسلم
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
জনৈক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর সমীপে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, হে সৃষ্টির সেরা! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : সৃষ্টির সেরা ব্যক্তি ছিলেন ইব্রা-হীম (আঃ)।
[১] সহীহ : মুসলিম ১৫০-(২৩৬৯), তিরমিযী ৩৩৫২, আবূ দাঊদ ৪৬৭২, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ৩১৮১৬, আহমাদ ১২৮২৬, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৩৯৫০, শু‘আবুল ঈমান ১৪৯১, সুনানুন্ নাসায়ী আল কুবরা ১১৬৯২, হিলইয়াতুল আওলিয়া ৭/২৪৭, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ১৩৮২।
অনুবাদের উৎস
- প্রকাশক:
- হাদিস একাডেমী
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৮৯৬-[৪]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-কে বলল, হে সৃষ্টির সেরা। তখন নবী (صلى الله عليه وسلم) উত্তর দিলেন, সৃষ্টির সেরা ব্যক্তি ছিলেন ইবরাহীম। এই উত্তর নবীদের মর্যাদা স্মরণ করায় এবং নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর বিনয়ী আচরণও দেখায়। তিনি নিজের প্রশংসা শুনে তা নিজের দিকে টেনে নেননি; বরং ইবরাহীম (আঃ)-এর মর্যাদা উল্লেখ করেছেন। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, প্রশংসা করার সময় ভাষা ও সীমা রক্ষা করা জরুরি। নবীদের সম্মান করা ঈমানের অংশ, তবে অতিরিক্ত প্রশংসা থেকে বাঁচাও দরকার। ইবরাহীম (আঃ)-এর মর্যাদা হাদিস হিসেবে এটি মানুষের ভাষাকে সংযত ও সম্মানপূর্ণ করতে শেখায়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- প্রশংসা করার সময় সীমা ও আদব রাখা দরকার।
- নবীদের মর্যাদা স্মরণ করা ঈমানি শিক্ষা।
- বড় মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও বিনয়ী থাকা সুন্দর চরিত্র।
- কাউকে সম্মান করতে গিয়ে অতিরিক্ত ভাষা ব্যবহার করা ঠিক নয়।
