১৯/৫. অধ্যায়ঃ
সহীহ মুসলিম হাদিস ৩৫৮৭ - নবীজির ঘরোয়া জীবন ও দুনিয়ার শিক্ষা
স্ত্রী হতে দূরে থাকার কসম করা, স্ত্রী হতে বিরত থাকা ও তাদের অবকাশ দেয়া এবং আল্লাহ তা‘আলার বানী- “যদি তারা যিহারে লিপ্ত হয়” ইত্যাদি প্রসঙ্গে
নবীজির স্ত্রীদের ঘটনা: সতর্কতা ও সরল জীবনের শিক্ষা
সহীহ মুসলিম : ৩৫৮৭
সহীহ মুসলিমহাদিস নম্বর ৩৫৮৭
وَحَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ الْحَنْظَلِيُّ، وَمُحَمَّدُ بْنُ أَبِي عُمَرَ، - وَتَقَارَبَا فِي لَفْظِ الْحَدِيثِ - قَالَ ابْنُ أَبِي عُمَرَ حَدَّثَنَا وَقَالَ، إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي ثَوْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ لَمْ أَزَلْ حَرِيصًا أَنْأَسْأَلَ عُمَرَ عَنِ الْمَرْأَتَيْنِ مِنْ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ ﷺ اللَّتَيْنِ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى {إِنْ تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا} حَتَّى حَجَّ عُمَرُ وَحَجَجْتُ مَعَهُ فَلَمَّا كُنَّا بِبَعْضِ الطَّرِيقِ عَدَلَ عُمَرُ وَعَدَلْتُ مَعَهُ بِالإِدَاوَةِ فَتَبَرَّزَ ثُمَّ أَتَانِي فَسَكَبْتُ عَلَى يَدَيْهِ فَتَوَضَّأَ فَقُلْتُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ مَنِ الْمَرْأَتَانِ مِنْ أَزْوَاجِ النَّبِيِّ ﷺ اللَّتَانِ قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمَا { إِنْ تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا} قَالَ عُمَرُ وَاعَجَبًا لَكَ يَا ابْنَ عَبَّاسٍ - قَالَ الزُّهْرِيُّ كَرِهَ وَاللَّهِ مَا سَأَلَهُ عَنْهُ وَلَمْ يَكْتُمْهُ - قَالَ هِيَ حَفْصَةُ وَعَائِشَةُ. ثُمَّ أَخَذَ يَسُوقُ الْحَدِيثَ قَالَ كُنَّا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ قَوْمًا نَغْلِبُ النِّسَاءَ فَلَمَّا قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ وَجَدْنَا قَوْمًا تَغْلِبُهُمْ نِسَاؤُهُمْ فَطَفِقَ نِسَاؤُنَا يَتَعَلَّمْنَ مِنْ نِسَائِهِمْ - قَالَ - وَكَانَ مَنْزِلِي فِي بَنِي أُمَيَّةَ بْنِ زَيْدٍ بِالْعَوَالِي فَتَغَضَّبْتُ يَوْمًا عَلَى امْرَأَتِي فَإِذَا هِيَ تُرَاجِعُنِي فَأَنْكَرْتُ أَنْ تُرَاجِعَنِي . فَقَالَتْ مَا تُنْكِرُ أَنْ أُرَاجِعَكَ فَوَاللَّهِ إِنَّ أَزْوَاجَ النَّبِيِّ ﷺ لَيُرَاجِعْنَهُ وَتَهْجُرُهُ إِحْدَاهُنَّ الْيَوْمَ إِلَى اللَّيْلِ .فَانْطَلَقْتُ فَدَخَلْتُ عَلَى حَفْصَةَ فَقُلْتُ أَتُرَاجِعِينَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فَقَالَتْ نَعَمْ. فَقُلْتُ أَتَهْجُرُهُ إِحْدَاكُنَّ الْيَوْمَ إِلَى اللَّيْلِ قَالَتْ نَعَمْ. قُلْتُ قَدْ خَابَ مَنْ فَعَلَ ذَلِكَ مِنْكُنَّ وَخَسِرَ أَفَتَأْمَنُ إِحْدَاكُنَّ أَنْ يَغْضَبَ اللَّهُ عَلَيْهَا لِغَضَبِ رَسُولِهِ ﷺ فَإِذَا هِيَ قَدْ هَلَكَتْ لاَ تُرَاجِعِي رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَلاَ تَسْأَلِيهِ شَيْئًا وَسَلِينِي مَا بَدَا لَكِ وَلاَ يَغُرَّنَّكِ أَنْ كَانَتْ جَارَتُكِ هِيَ أَوْسَمَ وَأَحَبَّ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مِنْكِ - يُرِيدُ عَائِشَةَ -قَالَ وَكَانَ لِي جَارٌ مِنَ الأَنْصَارِ فَكُنَّا نَتَنَاوَبُ النُّزُولَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَيَنْزِلُ يَوْمًا وَأَنْزِلُ يَوْمًا فَيَأْتِينِي بِخَبَرِ الْوَحْىِ وَغَيْرِهِ وَآتِيهِ بِمِثْلِ ذَلِكَ وَكُنَّا نَتَحَدَّثُ أَنَّ غَسَّانَ تُنْعِلُ الْخَيْلَ لِتَغْزُوَنَا فَنَزَلَ صَاحِبِي ثُمَّ أَتَانِي عِشَاءً فَضَرَبَ بَابِي ثُمَّ نَادَانِي فَخَرَجْتُ إِلَيْهِ فَقَالَ حَدَثَ أَمْرٌ عَظِيمٌ. قُلْتُ مَاذَا أَجَاءَتْ غَسَّانُ قَالَ لاَ بَلْ أَعْظَمُ مِنْ ذَلِكَ وَأَطْوَلُ طَلَّقَ النَّبِيُّ ﷺ نِسَاءَهُ.فَقُلْتُ قَدْ خَابَتْ حَفْصَةُ وَخَسِرَتْ قَدْ كُنْتُ أَظُنُّ هَذَا كَائِنًا حَتَّى إِذَا صَلَّيْتُ الصُّبْحَ شَدَدْتُ عَلَىَّ ثِيَابِي ثُمَّ نَزَلْتُ فَدَخَلْتُ عَلَى حَفْصَةَ وَهْىَ تَبْكِي فَقُلْتُ أَطَلَّقَكُنَّ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقَالَتْ لاَ أَدْرِي هَا هُوَ ذَا مُعْتَزِلٌ فِي هَذِهِ الْمَشْرُبَةِ. فَأَتَيْتُ غُلاَمًا لَهُ أَسْوَدَ فَقُلْتُ اسْتَأْذِنْ لِعُمَرَ . فَدَخَلَ ثُمَّ خَرَجَ إِلَىَّ فَقَالَ قَدْ ذَكَرْتُكَ لَهُ فَصَمَتَ فَانْطَلَقْتُ حَتَّى انْتَهَيْتُ إِلَى الْمِنْبَرِ فَجَلَسْتُ فَإِذَا عِنْدَهُ رَهْطٌ جُلُوسٌ يَبْكِي بَعْضُهُمْ فَجَلَسْتُ قَلِيلاً ثُمَّ غَلَبَنِي مَا أَجِدُ ثُمَّ أَتَيْتُ الْغُلاَمَ فَقُلْتُ اسْتَأْذِنْ لِعُمَرَ . فَدَخَلَ ثُمَّ خَرَجَ إِلَىَّ . فَقَالَ قَدْ ذَكَرْتُكَ لَهُ فَصَمَتَ . فَوَلَّيْتُ مُدْبِرًا فَإِذَا الْغُلاَمُ يَدْعُونِي فَقَالَ ادْخُلْ فَقَدْ أَذِنَ لَكَ فَدَخَلْتُ فَسَلَّمْتُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَإِذَا هُوَ مُتَّكِئٌ عَلَى رَمْلِ حَصِيرٍ قَدْ أَثَّرَ فِي جَنْبِهِ فَقُلْتُ أَطَلَّقْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ نِسَاءَكَ فَرَفَعَ رَأْسَهُ إِلَىَّ وَقَالَ " لاَ " . فَقُلْتُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَوْ رَأَيْتَنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكُنَّا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ قَوْمًا نَغْلِبُ النِّسَاءَ فَلَمَّا قَدِمْنَا الْمَدِينَةَ وَجَدْنَا قَوْمًا تَغْلِبُهُمْ نِسَاؤُهُمْ فَطَفِقَ نِسَاؤُنَا يَتَعَلَّمْنَ مِنْ نِسَائِهِمْ فَتَغَضَّبْتُ عَلَى امْرَأَتِي يَوْمًا فَإِذَا هِيَ تُرَاجِعُنِي فَأَنْكَرْتُ أَنْ تُرَاجِعَنِي . فَقَالَتْ مَا تُنْكِرُ أَنْ أُرَاجِعَكَ فَوَاللَّهِ إِنَّ أَزْوَاجَ النَّبِيِّ ﷺ لَيُرَاجِعْنَهُ وَتَهْجُرُهُ إِحْدَاهُنَّ الْيَوْمَ إِلَى اللَّيْلِ . فَقُلْتُ قَدْ خَابَ مَنْ فَعَلَ ذَلِكَ مِنْهُنَّ وَخَسِرَ أَفَتَأْمَنُ إِحْدَاهُنَّ أَنْ يَغْضَبَ اللَّهُ عَلَيْهَا لِغَضَبِ رَسُولِهِ ﷺ فَإِذَا هِيَ قَدْ هَلَكَتْ فَتَبَسَّمَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ دَخَلْتُ عَلَى حَفْصَةَ فَقُلْتُ لاَ يَغُرَّنَّكِ أَنْ كَانَتْ جَارَتُكِ هِيَ أَوْسَمُ مِنْكِ وَأَحَبُّ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مِنْكِ . فَتَبَسَّمَ أُخْرَى فَقُلْتُ أَسْتَأْنِسُ يَا رَسُولَ اللَّهِ . قَالَ " نَعَمْ " .فَجَلَسْتُ فَرَفَعْتُ رَأْسِي فِي الْبَيْتِ فَوَاللَّهِ مَا رَأَيْتُ فِيهِ شَيْئًا يَرُدُّ الْبَصَرَ إِلاَّ أُهُبًا ثَلاَثَةً فَقُلْتُ ادْعُ اللَّهَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنْ يُوَسِّعَ عَلَى أُمَّتِكَ فَقَدْ وَسَّعَ عَلَى فَارِسَ وَالرُّومِ وَهُمْ لاَ يَعْبُدُونَ اللَّهَ فَاسْتَوَى جَالِسًا ثُمَّ قَالَ " أَفِي شَكٍّ أَنْتَ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ أُولَئِكَ قَوْمٌ عُجِّلَتْ لَهُمْ طَيِّبَاتُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا " . فَقُلْتُ اسْتَغْفِرْ لِي يَا رَسُولَ اللَّهِ . وَكَانَ أَقْسَمَ أَنْ لاَ يَدْخُلَ عَلَيْهِنَّ شَهْرًا مِنْ شِدَّةِ مَوْجِدَتِهِ عَلَيْهِنَّ حَتَّى عَاتَبَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর স্ত্রীগণের মধ্যে থেকে যে দু’জন মহিলা সম্পর্কে ‘উমর (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করার জন্য বহুদিন যাবৎ আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিলাম যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেনঃ “তোমাদের দু’জনের হৃদয় অন্যায় প্রবণ হয়েছে মনে করে তোমরা যদি অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্র দিকে ফিরে আসো তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন”। (সূরা আত্ তাহরীম ৬৬ : ৪)পরিশেষে ‘উমর (রাঃ) হজ্জ পালনের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন এবং আমিও হজ্জ পালনের জন্য তাঁর সফরসঙ্গী হলাম। এরপর (হজ্জ সমাপন করে ফেরার পথে) আমরা কোন এক রাস্তা দিয়ে চলার সময় ‘উমর (রাঃ) এক পার্শ্বে মোড় নিলেন। আমিও পানির বদনাসহ তাঁর সঙ্গে রাস্তার পাশে গেলাম। তিনি তাঁর হাজত পূরণ করলেন এবং আমার কাছে এলেন। আমি তাঁর উভয় হাতে পানি ঢাললাম, তিনি ওজু করে নিলেন।তখন আমি বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণের সে দুজন মহিলা কারা ছিলো যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ “তোমরা দু’জন যদি আল্লাহর কাছে তাওবা কর (তবে তা উত্তম), কেননা তোমাদের অন্তর (সত্য থেকে) ঝুঁকে পড়েছে”? ‘উমর (রাঃ) বললেন, হে ইবনু ‘আব্বাস! এতো তোমার জন্য আশ্চর্যের বিষয় বলে মনে হচ্ছে (তুমি এত বিলম্বে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে কেন?) যুহরী (রহঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! তিনি [‘উমর (রাঃ)] জিজ্ঞাসিত বিষয়টি (ইবনু ‘আব্বাসের এ বিষয়ে বিলম্বে প্রশ্ন করাকে) অপছন্দ করলেও তা বর্ণনা করতে কিছুই গোপন করলেন না। তিনি বললেন, তাঁরা দুজন ছিল হাফ্সাহ্ ও ‘আয়িশা (রাঃ)।এরপর তিনি ঘটনার বিবরণ দিতে লাগলেন। তিনি বললেন, আমরা কুরায়শ বংশের লোকেরা (জাহিলিয়্যাত যুগে) আমাদের স্ত্রীদের উপর প্রভুত্ব করে চলতাম। যখন আমরা মাদীনায় এলাম তখন এমন লোকদের দেখতে পেলাম যাদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রভাব বিস্তার করছিল। এমনি পরিবেশে আমাদের নারীরা তাদের (মাদীনাহ্বাসীদের) নারীদের অভ্যাস রপ্ত করতে শুরু করে দেয়। তিনি বলেন, সে সময় মাদীনার উচ্চভূমির অধিবাসী বানূ উমাইয়্যাহ্ ইবনু যায়দের বংশধরদের মধ্যে আমার বসতবাটি ছিল।এরপর একদিন আমি আমার স্ত্রীর উপর রাগান্বিত হলাম। সে আমার কথার প্রত্যুত্তর করতে লাগল। আমি আমার সঙ্গে তার প্রত্যুত্তর করাকে খুবই অপ্রিয় মনে করলাম। সে বলল, আপনার সঙ্গে আমার কথার প্রত্যুত্তর করাকে অপছন্দ করছেন কেন? আল্লাহর কসম! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণও তো তাঁর সঙ্গে কথার প্রত্যুত্তর করে থাকে। এমনকি তিনি তাঁদের কেউ কেউ তাঁকে সারা দিন রাত বিচ্ছিন্ন করে রাখে।তখন আমি রওনা করে (আমার মেয়ে) হাফ্সার কাছে চলে এলাম। এরপর আমি তাকে বললাম, তুমি কি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে প্রত্যুত্তর কর? সে বলল, হাঁ। আমি বললাম, তোমাদের মধ্যে কি কেউ তাঁকে সারা দিন রাত বিচ্ছিন্ন করে রাখে? সে বলল, হাঁ। আমি বললাম, তোমাদের যে কেউ এরূপ আচরণ করে সে আসলেই দুর্ভাগা ও ক্ষতিগ্রস্ত। তোমাদের মধ্যে কি কেউ বিপদমুক্ত ও নিরাপদ হতে পারে যদি আল্লাহ তাঁর রাসূলের ক্রোধের কারণে ক্রুদ্ধ হন। এরূপ হলে তো তার ধ্বংস অনিবার্য।তুমি কখনো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে তাঁর কথার প্রত্যুত্তরে লিপ্ত হয়ো না এবং তাঁর কাছে কোন কিছু দাবী করবে না, তোমার মনে যা চায় তা আমার কাছে চাইবে। তোমার সতীন তোমার চাইতে অধিকতর সুন্দরী এবং রাসূলুল্লাহ-(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট তোমার তুলনায় অধিকতর প্রিয়পাত্রী। সে যেন তোমাকে ধোঁকায় পতিত না করে ফেলে। এর দ্বারা তিনি [‘উমর (রাঃ)] ‘আয়িশা (রাঃ)-কে বুঝাতে চাইছেন।তিনি বলেন, আমার একজন আনসারী প্রতিবেশী ছিলেন। আমরা দুই বন্ধু পালাক্রমে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে (তাঁর মজলিসে) যেতাম। একদিন তিনি উপস্থিত থাকতেন, অপরদিন আমি উপস্থিত হতাম। এভাবে তিনি আমাকে ওহী ইত্যাদির খবর দিতেন, আমিও অনুরূপ খবর তাকে পৌঁছাতাম। সে সময় আমরা বেশ করে আলোচনা করতে ছিলাম যে, গাস্সানী বাদশাহ নাকি আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা জন্য ঘোড়ার ক্ষুরে নাল লাগাচ্ছে।একদিন আমার বন্ধু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে গেলেন এবং ‘ইশার সময় (রাত্রিকালে) আমার কাছে (ফিরে) এলেন। তিনি এসে আমার ঘরের দরজা খটখটালেন এবং আমাকে ডাকলেন। আমি তাঁর ডাক শুনে তাঁর কাছে ছুটে এলাম। তিনি বললেন, একটি বিরাট কাণ্ড ঘটে গেছে। আমি বললাম, সে কী? গাস্সানীরা তাহলে এসে গেছে নাকি? তিনি বললেনঃ না, তারা আসেনি বরং ব্যাপার তার চাইতেও সাংঘাতিক ও দীর্ঘতর। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সহধর্মিনীদের ত্বলাক্ব দিয়েছেন। তখন আমি বললাম, হাফ্সাহ্ হতাশ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি পূর্ব থেকেই ধারণা পোষণ করে আসছিলাম যে, এমন একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে।এরপর আমি ফাজরের সালাত আদায় করে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় পরিধান করলাম। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে সরাসরি হাফসার কাছে উপস্থিত হলাম। তখন সে কাঁদছিল। আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি তোমাদেরকে ত্বলাক্ব দিয়েছেন। সে (শ্বাসরুদ্ধ করে) বলল, আমি জানি না। তবে তিনি তাঁর ঐ বালাখানায় নির্জনবাস করছেন।আমি তাঁর কৃষ্ণাঙ্গ খাদিমের কাছে বললাম ‘উমরের (প্রবেশের) জন্য অনুমতি প্রার্থনা করো। এরপর সে ভিতরে প্রবেশ করল এবং পরক্ষণেই বেরিয়ে এসে আমার দিকে তাকাল। এরপর সে বলল, আমি তাঁর (রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর) কাছে আপনার কথা উত্থাপন করেছি কিন্তু তিনি নীরব আছেন (কিছুই বলছেন না)। অতঃপর আমি চলে এলাম এবং মিম্বারের কাছে এসে বসে পড়লাম। তখন আমি দেখতে পেলাম সেখানে একদল লোক বসা আছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। আমি খানিকটা বসলাম।এরপর আমার মনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা আমার উপর প্রভাব বিস্তার করল। তখন আমি সেই কৃষ্ণাঙ্গ যুবকটির কাছে চলে এলাম এবং তাকে বললাম, ‘উমরের জন্য ভিতরে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে এসো। সে ভেতরে প্রবেশ করল এবং বেরিয়ে এসে আমাকে বলল, আমি আপনার বিষয়টি তাঁর সামনে উত্থাপন করেছি কিন্তু তিনি নীরব আছেন। আমি যখন পিছনে ফিরে চললাম অমনি সে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকটি আমাকে ডাক দিয়ে বলল, আপনি প্রবেশ করুন; তিনি আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন।আমি ভিতরে প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সালাম দিলাম। আমি দেখতে পেলাম, তিনি খেজুর পাতার তৈরি একটি চাটাই এর উপর হেলান দিয়ে আরাম করছেন যা তাঁর পাঁজরে চাটাইয়ের দাগ বসিয়ে দিয়েছে। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি কি আপনার সহধর্মিনীগণকে ত্বলাক্ব দিয়েছেন? তিনি তাঁর মাথা উঁচিয়ে আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন এবং বললেন, না। আমি বললাম, আল্লাহ আকবার। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি বিষয়টি ভেবে দেখুনঃ আমরা যখন মাদীনায় এলাম তখন দেখতে পেলাম, এখানকার পুরুষ লোকদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রভুত্ব বিস্তার করে আসছে। এতে তাদের দেখাদেখি আমাদের স্ত্রীরাও তাদের অভ্যাস রপ্ত করতে শুর করে দিয়েছে। একদিন আমি আমার স্ত্রীর প্রতি রাগান্বিত হলাম। অমনি সে আমার কথার প্রত্যুত্তর শুরু করে দিল। আমি তার প্রত্যুত্তর করাকে খুবই খারাপ মনে করলাম। সে বলে ফেলল, আপনার সঙ্গে প্রত্যুত্তর করাকে আপনি এত খারাপ মনে করছেন কেন? আল্লাহ্র কসম! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণও তো তাঁর কথার প্রত্যুত্তর করে থাকে, এমনকি তাঁদের কেউ কেউ তাঁকে সারা দিন রাত বিচ্ছিন্ন করে রাখে।আমি বললাম, তাঁদের মধ্যে কেউ এমন আচরণ করলে সে হতভাগ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে থেকে কারো উপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাগান্বিত হওয়ার কারণে যদি আল্লাহ ক্রুদ্ধ হয়ে যান তাহলে তার পতন ও ধ্বংস অনিবার্য। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃদু স্বরে হেসে উঠলেন।আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি হাফসার কাছে গিয়ে তাকে বলে দিয়েছি যে, তোমার সতীন সৌন্দর্যে তোমার তুলনায় অগ্রগামিনী এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে তোমার চাইতে অধিকতর আদরিনী- তা যেন তোমাকে ধোঁকার জালে আবদ্ধ করতে না পারে। এতে আবার তিনি মুচকি হাসি দিলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আপনার সঙ্গে একান্তে আলাপ করতে চাই। তিনি বললেনঃ হাঁ, করতে পার।অতঃপর আমি বললাম এবং মাথা উঠিয়ে তাঁর কোঠার (এদিক ওদিক) তাকিয়ে দেখলাম। আল্লাহ্র কসম! আমি সেখানে তিনখানি চামড়া ব্যতীত নয়ন জুড়ানো তেমন কিছু দেখতে পাইনি। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি আল্লাহ্র কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনার উম্মাতকে প্রাচুর্য দান করেন। পারসিক ও রোমাকদের তো বৈষয়িক সুখ সমৃদ্ধি দান করা হয়েছে অথচ তারা আল্লাহ্র ‘ইবাদাত (আনুগত্য) করে না।তখন তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, হে খাত্ত্বাবের পুত্র! তুমি কি সন্দেহের জালে আচ্ছন্ন আছো। আসলে তারা তো এমন সম্প্রদায় যাদের পার্থিব জীবনে ক্ষণিকের তরে সুখ সমৃদ্ধি দান করা হয়েছে। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি তাঁর সহধর্মিনীগণের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে কসম করেছিলেন যে, দীর্ঘ একমাস তাদের সঙ্গে একত্রে অতিবাহিত করবেন না। শেষাবধি আল্লাহ তাঁকে এ আচরণের জন্য তিরস্কার করেন।
ই.ফা. ৩৫৫৮, ই.সে. ৩৫৫৮
সহীহ মুসলিম হাদিস ৩৫৮৭-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে ইবনু আব্বাস (রা.) উমর (রা.)-কে সেই দুইজন স্ত্রীর বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন, যাদের সম্পর্কে কুরআনের আয়াত নাজিল হয়েছিল। উমর (রা.) স্পষ্টভাবে বলেন, তাঁরা ছিলেন হাফসা ও আয়িশা (রা.)। এরপর তিনি নবীজির ঘরোয়া একটি ঘটনার কথা বলেন। এতে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর মর্যাদা, তাঁর প্রতি সম্মান এবং পারিবারিক আচরণে সতর্ক থাকা কত জরুরি। গুজব ছড়িয়েছিল যে নবীজি স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন, কিন্তু তিনি নিজে জানান, তা নয়। উমর (রা.) তাঁর ঘরে খুব সামান্য জিনিস দেখেন, অথচ রোম ও পারসিকদের প্রাচুর্যের কথা বলেন। তখন নবীজি জানান, তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দুনিয়াতেই দ্রুত দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এই বর্ণনায় নবীজির সরল জীবন, দুনিয়ার প্রাচুর্য নিয়ে ভুল ধারণা, এবং পরিবারের বিষয়ে সংযত আচরণের শিক্ষা এসেছে।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- ধর্মীয় বিষয়ে প্রশ্ন করলে জানা কথা গোপন না করে সত্যভাবে বলা উচিত।
- রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-এর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় সাহাবারা খুব সতর্ক ছিলেন।
- দুনিয়ার প্রাচুর্য দেখে ঈমানদারকে বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক নয়।
- পারিবারিক বিষয়ে রাগ, অভিমান ও কথার জবাবে সংযম রাখা দরকার।
