১৮/২৫৪. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১২/১৫৩০ - জান্নাতের আমল ও জিহ্বা সংযম
গীবত (পরনিন্দা) নিষিদ্ধ এবং বাক্ সংযমের নির্দেশ ও গুরুত্ব
মহান আল্লাহ বলেছেন,﴾ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ ﴿ (الحجرات: ١٢অর্থাৎ তোমরা একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা (গীবত) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করতে চাইবে? বস্তুতঃ তোমরা তো এটাকে ঘৃণাই কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তাওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।(সূরা হুজুরাত ১২ আয়াত)তিনি বলেছেন,﴾وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۚ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴿ (الاسراء: ٣٦অর্থাৎ যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হইয়ো না। নিশ্চয় কর্ণ, চক্ষু ও হৃদয় ওদের প্রত্যেকের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে।(সূরা বনী ইসরাইল ৩৬ আয়াত)তিনি আরও বলেছেন,﴾ مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ﴿(ق: ١٨অর্থাৎ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে (তা লিপিবদ্ধ করার জন্য) তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।(সূরা ক্বাফ ১৮ আয়াত)জেনে রাখুন যে, যে কথায় উপকার আছে বলে স্পষ্ট হয়, সে কথা ছাড়া অন্য সব (অসঙ্গত) কথা হতে নিজ জিহ্বাকে সংযত রাখা প্রত্যেক ভারপ্রাপ্ত মুসলিম ব্যক্তির উচিত। যেখানে কথা বলা ও চুপ থাকা দুটোই সমান, সেখানে চুপ থাকাটাই সুন্নত। কেননা, বৈধ কথাবার্তাও অনেক সময় হারাম অথবা মাকরূহ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। অধিকাংশ এরূপই ঘটে থাকে। আর (বিপদ ও পাপ থেকে) নিরাপত্তার সমতুল্য কোন বস্তু নেই।
জান্নাতের আমল ও জিহ্বা সংযম: মুআয রা.-এর প্রশ্নের শিক্ষা
রিয়াদুস সালেহীন : ১২/১৫৩০
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ১২/১৫৩০
وَعَنْ مُعَاذٍ رضي الله عنه قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، أَخْبِرْني بِعَمَلٍ يُدْخِلُني الجَنَّةَ وَيُبَاعِدُنِي مِنَ النَّارِ ؟ قَالَ: «لَقَدْ سَأَلتَ عَنْ عَظِيمٍ، وَإِنَّهُ لَيَسِيرٌ عَلَى مَنْ يَسَّرَهُ اللهُ تَعَالَى عَلَيْهِ: تَعْبُدُ اللهَ لاَ تُشْرِكُ بِهِ شَيْئاً، وَتُقِيمُ الصَّلاَةَ، وَتُؤتِي الزَّكَاةَ، وَتَصُومُ رَمَضَانَ، وَتَحُجُّ البَيْتَ» ثُمَّ قَالَ: «أَلاَ أَدُلُّكَ عَلَى أَبْوَابِ الخَيْرِ؟ الصَّوْمُ جُنَّةٌ، وَالصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الخَطِيئَةَ كَمَا يُطْفِئُ المَاءُ النَّارَ، وَصَلاَةُ الرَّجُلِ مِنْ جَوْفِ اللَّيْلِ» ثُمَّ تَلاَ: ﴿ تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمۡ عَنِ ٱلۡمَضَاجِعِ ﴾ حَتَّى بَلَغَ ﴿ يَعۡمَلُونَ ﴾ [السجدة: ١٦، ١٧] ثُمَّ قَالَ: «أَلاَ أُخْبِرُكَ بِرَأْسِ الأَمْرِ، وَعَمُودِهِ، وَذِرْوَةِ سِنَامِهِ» قُلْتُ: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، قَالَ: «رَأسُ الأمْرِ الإسْلامُ، وَعَمُودُهُ الصَّلاَةُ، وَذِرْوَةِ سِنَامِهِ الجِهادُ» ثُمَّ قَالَ: «أَلاَ أُخْبِرُكَ بِمِلاَكِ ذَلِكَ كُلِّهِ!» قُلْتُ: بلَى يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، فَأَخَذَ بِلِسَانِهِ وَقَالَ: «كُفَّ عَلَيْكَ هَذَا» قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ وَإِنَّا لَمُؤَاخَذُوْنَ بِمَا نَتَكَلَّمُ بِهِ؟ فَقَالَ: «ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ! وَهَلْ يَكُبُّ النَّاسَ فِي النَّارِ عَلَى وُجُوهِهِمْ إِلاَّ حَصَائِدُ أَلْسِنَتِهِمْ؟». رواه الترمذي، وقال: حديث حسن صحيح
মু'আয (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, একদা আমি নিবেদন করলাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন আমল বাতলে দেন, যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে।’ তিনি বললেন, “তুমি বিরাট (কঠিন) কাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে। তবে এটা তার পক্ষে সহজ হবে, যার পক্ষে মহান আল্লাহ সহজ করে দেবেন। (আর তা হচ্ছে এই যে,) তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তার কোন অংশী স্থাপন করবে না। নামায প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত দেবে, মাহে রমযানের রোযা পালন করবে এবং কাবা গৃহের হজ্জ পালন করবে।” পুনরায় তিনি বললেন, “তোমাকে কল্যাণের দ্বারসমূহ বাতলে দেব না কি? রোযা ঢাল স্বরূপ, সদকা গুনাহ নিশ্চিহ্ন করে; যেমন পানি আগুনকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আর মধ্য রাত্রিতে মানুষের নামায।”অতঃপর তিনি এই আয়াত দু’টি পড়লেন- যার অর্থ, “তারা শয্যা ত্যাগ করে, আশায় বুক বেধে এবং আশংকায় ভীতি-বিহ্বল হয়ে তাদের প্রতিপালককে আহ্বান করে এবং আমি তাদেরকে যে সব জীবিকা দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে থাকে। তাদের সৎকর্মের পুরস্কার স্বরূপ তাদের জন্য নয়ন-প্রীতিকর যা কিছু লুক্কায়িত রাখা হয়েছে, কেউ তা অবগত নয়।” (সূরা সেজদা ১৬-১৭ আয়াত)তারপর বললেন, “আমি তোমাকে সব বিষয়ের (দ্বীনের) মস্তক, তার খুঁটি, তার উচ্চতম চূড়া বাতলে দেব না কি?” আমি বললাম, ’অবশ্যই বাতলে দিন, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, “বিষয়ের মস্তক হচ্ছে ইসলাম, তার স্তম্ভ হচ্ছে নামায এবং তার উচ্চতম চূড়া হচ্ছে জিহাদ।”পুনরায় তিনি প্রশ্ন করলেন, “আমি তোমাকে সে সবের মূল সম্বন্ধে বলে দেব না কি?” আমি বললাম, ’অবশ্যই বলে দিন, হে আল্লাহর রাসূল!’ তখন তিনি নিজ জিভটিকে ধরে বললেন, “তোমার মধ্যে এটিকে সংযত রাখ।” মু’আয বললেন, ’হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যে কথা বলি তাতেও কি আমাদেরকে হিসাব দিতে হবে?’ তিনি বললেন, “তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক হে মুআয! মানুষকে তাদের নিজেদের জিভ-ঘটিত পাপ ছাড়া অন্য কিছু কি তাদের মুখ থুবড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে?” (তিরমিযী, হাসান সহীহ) [১]
তিরমিযী ২৬১৬, মা ৩৯৭৩, আহমাদ ২১৫১১, ২১৫৪২, ২১৫৬৩, ২১৬১৭
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১২/১৫৩০-এর সারসংক্ষেপ
এই দীর্ঘ হাদিসে মুআয রা. রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم-এর কাছে এমন আমল জানতে চান, যা তাকে জান্নাতে নেবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে। নবী صلى الله عليه وسلم প্রথমে তাওহীদ, নামায, যাকাত, রমযানের রোযা এবং হজ্জের কথা বলেন। এরপর কল্যাণের দরজা হিসেবে রোযা, সদকা এবং রাতের নামাযের কথা বলেন। তারপর দ্বীনের মস্তক ইসলাম, খুঁটি নামায এবং উচ্চতম চূড়া জিহাদের কথা বলেন। এত বড় আমলের আলোচনা শেষে নবী صلى الله عليه وسلم জিহ্বা ধরে বলেন, এটিকে সংযত রাখো। মুআয রা. অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, কথার জন্যও কি হিসাব হবে? নবী صلى الله عليه وسلم বলেন, মানুষের জিভ-ঘটিত পাপই অনেককে মুখ থুবড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে। এই হাদিসে বোঝা যায়, ইবাদতের সঙ্গে জিহ্বা সংযম খুব জরুরি।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- তাওহীদ, নামায, যাকাত, রোযা ও হজ্জ জান্নাতের পথে প্রধান আমল।
- রোযা, সদকা ও রাতের নামায কল্যাণের দরজা হিসেবে এসেছে।
- বড় বড় আমলের পাশাপাশি জিহ্বা সংযম অপরিহার্য।
