১৮/২৮৮. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ২/১৬২৫ - রিয়া ও লোকদেখানো আমলের পরিণতি
‘রিয়া’ [লোক-প্রদর্শনমূলক কার্যকলাপ] হারাম
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴾ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ﴿ [البينة: ٥]অর্থাৎ তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠ-ভাবে তাঁর ইবাদত করতে।(সূরা বাইয়িনাহ ৫ আয়াত)তিনি আরও বলেছেন,﴾لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَىٰ كَالَّذِي يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ﴿ [البقرة: ٢٦٤]অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে নষ্ট করে দিয়ো না ঐ লোকের মত যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে।(সূরা বাকারাহ ২৬৪ আয়াত)তিনি অন্য জায়গায় বলেছেন,﴾ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَىٰ يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا﴿ [النساء : ١٤٢]অর্থাৎ নিশ্চয় মুনাফিক [কপট] ব্যক্তিরা আল্লাহকে প্রতারিত করতে চায়। বস্তুতঃ তিনিও তাদেরকে প্রতারিত করে থাকেন এবং যখন তারা নামাযে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে নিছক লোক-দেখানোর জন্য দাঁড়ায় এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে থাকে।(সূরা নিসা ১৪২)
রিয়া ও লোকদেখানো আমলের ভয়াবহ পরিণতি
রিয়াদুস সালেহীন : ২/১৬২৫
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ২/১৬২৫
وَعَنْه، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ ﷺ يَقُولُ: «إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَومَ القِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ، فَأُتِيَ بِهِ، فَعَرَّفَهُ نِعْمَتَهُ، فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ. قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ لأَنْ يُقَالَ: جَرِيءٌ! فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ. وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ العِلْمَ وَعَلَّمَهُ، وَقَرَأَ القُرآنَ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا. قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ: تَعَلَّمْتُ العِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ، وَقَرَأتُ فِيكَ القُرآنَ، قَالَ: كَذَبْتَ، وَلكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ لِيُقَالَ: عَالِمٌ! وَقَرَأتَ القُرْآنَ لِيُقَالَ: هُوَ قَارِئٌ؛ فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ . وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللهُ عَلَيْهِ، وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ المَالِ، فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ، فَعَرَفَهَا. قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبيلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلاَّ أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ. قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ لِيُقَالَ: جَوَادٌ! فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ في النَّارِ» . رواه مسلم
উক্ত রাবী (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি শুনেছি, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন যে, ’’কেয়ামতের দিন অন্যান্য লোকদের পূর্বে যে ব্যক্তির প্রথম বিচার হবে সে হচ্ছে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর নিকটে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সুতরাং সে তা স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, ’ঐ নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কি আমল করে এসেছ?’ সে বলবে ’আমি তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করেছি এবং অবশেষে শহীদ হয়ে গেছি।’ আল্লাহ বলবেন, ’তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে জিহাদ করেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে বলে, অমুক একজন বীর পুরুষ। সুতরাং তা-ই বলা হয়েছে।’ অতঃপর [ফিরিশ্তাদেরকে] আদেশ করা হবে এবং তাকে উবুড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।দ্বিতীয় হচ্ছে এমন ব্যক্তি, যে ইলম শিক্ষা করেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কোরআন পাঠ করেছে। তাকে আল্লাহর নিকটে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাকে [পৃথিবীতে প্রদত্ত] তাঁর সকল নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, ’এই সকল নেয়ামতের বিনিময়ে তুমি কি আমল করে এসেছ?’ সে বলবে, ’আমি ইলম শিখেছি, অপরকে শিখিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টি-লাভের জন্য কোরআন পাঠ করেছি।’ আল্লাহ বলবেন, ’মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে ইলম শিখেছ, যাতে লোকেরা তোমাকে আলেম বলে এবং এই উদ্দেশ্যে কোরআন পড়েছ, যাতে লোকেরা তোমাকে ক্বারী বলে। আর [দুনিয়াতে] তা বলা হয়েছে।’ অতঃপর [ফিরিশ্তাদেরকে] নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উবুড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।তৃতীয় হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার রুযীকে আল্লাহ প্রশস্ত করেছিলেন এবং সকল প্রকার ধন-দৌলত যাকে প্রদান করেছিলেন। তাকে আল্লাহর নিকটে হাজির করা হবে। আল্লাহ তাকে তাঁর দেওয়া সমস্ত নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সেও সব কিছু স্মরণ করবে। অতঃপর আল্লাহ প্রশ্ন করবেন, ’তুমি ঐ সকল নেয়ামতের বিনিময়ে কি আমল করে এসেছ?’ সে বলবে, ’যে সকল রাস্তায় দান করলে তুমি খুশী হও সে সকল রাস্তার মধ্যে কোনটিতেও তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে খরচ করতে ছাড়িনি।’ তখন আল্লাহ বলবেন, ’মিথ্যা বলছ তুমি। বরং তুমি এ জন্যই দান করেছিলে; যাতে লোকে তোমাকে দানবীর বলে। আর তা বলা হয়েছে।’ অতঃপর [ফিরিশ্তাবর্গকে] হুকুম করা হবে এবং তাকে উবুড় করে টেনে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
মুসলিম ১৯০৫, তিরমিযী ২৩৮২, নাসায়ী ৩১৩৭, আহমাদ ৮০৮৭ [মুসলিম ১৯০৫ নং][১]
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ২/১৬২৫-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসের মূল বিষয় রিয়া ও ইখলাস। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) কিয়ামতের দিনের তিন ধরনের মানুষের কথা বলেছেন: শহীদ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তি, ইলম শেখানো ও কোরআন পাঠকারী ব্যক্তি, এবং ধনী দানকারী ব্যক্তি। তারা প্রত্যেকে দাবি করবে, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করেছে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের প্রশংসা পাওয়া—বীর, আলেম, ক্বারী বা দানবীর বলা। হাদিসে বলা হয়েছে, দুনিয়াতে তারা সেই প্রশংসা পেয়েছে; এরপর তাদের কঠিন পরিণতির কথা এসেছে। এই হাদিস আমাদের শেখায়, বাহ্যিকভাবে বড় আমল করাই যথেষ্ট নয়। জিহাদ, ইলম, কোরআন পাঠ ও দান—সব আমলের ভেতরে নিয়ত খাঁটি থাকা জরুরি। মানুষ কী বলবে—এ চিন্তা আমলকে বিপদে ফেলতে পারে। তাই রিয়া থেকে বাঁচা এবং আল্লাহর জন্য কাজ করা মুমিনের বড় শিক্ষা।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- বড় আমলও ভুল নিয়তের কারণে বিপদজনক হয়ে যেতে পারে।
- মানুষের প্রশংসা পাওয়াকে আমলের মূল উদ্দেশ্য বানানো উচিত নয়।
- ইলম, কোরআন পাঠ, জিহাদ ও দানের মতো কাজে ইখলাস দরকার।
- নিজের নিয়ত বারবার যাচাই করা রিয়া থেকে বাঁচতে সাহায্য করে।
