১/২. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৬/১৯ - প্রাণ কণ্ঠাগত হওয়ার আগে তওবা
তওবার বিবরণ
উলামা সম্প্রদায়ের উক্তি এই যে, প্রত্যেক পাপ থেকে তওবা করা (চিরতরে প্রত্যাবর্তন করা) ওয়াজেব (অবশ্য-কর্তব্য)। যদি গোনাহর সম্পর্ক আল্লাহর (অবাধ্যতার) সঙ্গে থাকে এবং কোন মানুষের অধিকারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকে, তাহলে এ ধরনের তওবা কবুলের জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে।১। পাপ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে।২। পাপে লিপ্ত হওয়ার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হতে হবে।৩। ঐ পাপ আগামীতে দ্বিতীয়বার না করার দৃঢ় সঙ্কল্প করতে হবে। সুতরাং যদি এর মধ্যে একটি শর্তও লুপ্ত হয়, তাহলে সেই তওবা বিশুদ্ধ হবে না।পক্ষান্তরে যদি সেই পাপ মানুষের অধিকার সম্পর্কিত হয়, তাহলে তা গ্রহণীয় হওয়ার জন্য চারটি শর্ত আছে। উপরোক্ত তিনটি এবং চতুর্থ শর্ত হল, হকদারদের হক ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি অবৈধ পন্থায় কারো মাল বা অন্য কিছু নিয়ে থাকে, তাহলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। আর যদি কারো উপর মিথ্যা অপবাদ দেয় অথবা অনুরূপ কোনো দোষ করে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে শাস্তি নিতে নিজেকে পেশ করতে হবে অথবা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। যদি কারো গীবত করে থাকে, তাহলে তার কাছে তা বৈধ করে নেবে।সমস্ত পাপ থেকে তওবাহ করা ওয়াজেব। আংশিক পাপ থেকে তওবাহ করলে সেই তওবাহ হকপন্থী আলেমগণের নিকট গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে এবং অবশিষ্ট পাপ রয়ে যাবে। তওবা ওয়াজেব হওয়ার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে প্রচুর প্রমাণ রয়েছে এবং এ ব্যাপারে উম্মতের ঐকমত্যও বিদ্যমান।আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,﴾ وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ﴿ [النور: ٣١]অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তওবা (প্রত্যাবর্তন) কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা নূর ৩১ আয়াত)﴾ وَأَنِ ٱسۡتَغۡفِرُواْ رَبَّكُمۡ ثُمَّ تُوبُوٓاْ إِلَيۡهِ ﴿ [هود: ٣]অর্থাৎ “তোমরা নিজেদের প্রতিপালকের নিকট (পাপের জন্য) ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁর কাছে তওবা (প্রত্যাবর্তন) কর।” (সূরা হূদ ৩ আয়াত)তিনি আরো বলেছেন,﴾ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ تُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ تَوۡبَةٗ نَّصُوحًا ﴿ [التحريم: ٨]অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা কর বিশুদ্ধ তওবা।” (সূরা তাহরীম ৮ আয়াত)
মৃত্যুর আগে তওবা: প্রাণ কণ্ঠাগত হওয়ার পূর্বে ফিরে আসা
রিয়াদুস সালেহীন : ৬/১৯
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ৬/১৯
وعَنْ أبي عَبْدِ الرَّحْمن عَبْدِ اللَّهِ بن عُمرَ بن الخطَّاب رضي االله عنهما عن النَّبيِّ صَلّى االلهُ عَلَيْهِ وسَلَّمقال: «إِنَّ االله عزَّ وجَلَّ يقْبَلُ توْبة العبْدِ مَالَم يُغرْغرِ» رواه الترمذي وقال: حديث حسنٌ
আবূ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা বান্দার তওবা সে পর্যন্ত কবুল করবেন, যে পর্যন্ত তার প্রাণ কণ্ঠাগত না হয়।”[১]
তিরমিযী, ৩৫৩৭, ইবনুূু মাজাহ ৪২৫৩
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৬/১৯-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে তওবার ব্যক্তিগত সময়সীমা বলা হয়েছে। নবী (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন, আল্লাহ বান্দার তওবা কবুল করবেন, যতক্ষণ তার প্রাণ কণ্ঠাগত না হয়। অর্থাৎ মৃত্যুর এমন শেষ অবস্থা আসার আগে তওবার সুযোগ থাকে। এই হাদিস মানুষকে আশা দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে সতর্ক করে। কারণ কেউ জানে না তার শেষ সময় কখন আসবে। তাই তওবা পরে করব—এভাবে বিলম্ব করা নিরাপদ নয়। জীবিত থাকা অবস্থায়, বুঝে-শুনে, অন্তর দিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ। তওবা মানে ভুল স্বীকার করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং পাপ থেকে সরে আসার চেষ্টা করা। এই তওবার হাদিস আমাদের প্রতিদিন নিজের হিসাব নিতে শেখায়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- প্রাণ কণ্ঠাগত হওয়ার আগে তওবার সুযোগ আছে।
- মৃত্যুর সময় অজানা, তাই তওবা দেরি করা উচিত নয়।
- আল্লাহ বান্দার তওবা গ্রহণ করেন—এটি আশার বার্তা।
- নিজের ভুল বুঝে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা জরুরি।
