২০/৩৭২. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১৭/১৯০৫ - জান্নাতে রবের দীদারের নেয়ামত
আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের জন্য জান্নাতের মধ্যে যা প্রস্তুত রেখেছেন
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴾ إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ ٤٥ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ آمِنِينَ ٤٦ وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَىٰ سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ ٤٧ لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ وَمَا هُمْ مِنْهَا بِمُخْرَجِينَ ٤٨ ﴿ [الحجر: ٤٥، ٤٨]অর্থাৎ নিশ্চয় পরহেযগাররা বাস করবে উদ্যান ও প্রস্রবণসমূহে। [তাদেরকে বলা হবে,] তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে তাতে প্রবেশ কর। আমি তাদের অন্তরে যে ঈর্ষা থাকবে তা দূর করে দেব; তারা ভ্রাতৃভাবে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে। সেথায় তাদেরকে অবসাদ স্পর্শ করবে না এবং তারা সেথা হতে বহিষ্কৃতও হবে না।(সূরা হিজর ৪৫-৪৮ আয়াত)তিনি আরও বলেন,﴾يَا عِبَادِ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ وَلَا أَنْتُمْ تَحْزَنُونَ ٦٨ الَّذِينَ آمَنُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا مُسْلِمِينَ ٦٩ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ أَنْتُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ تُحْبَرُونَ ٧٠ يُطَافُ عَلَيْهِمْ بِصِحَافٍ مِنْ ذَهَبٍ وَأَكْوَابٍ ۖ وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنْفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ ۖ وَأَنْتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ٧١ وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوهَا بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ ٧٢ لَكُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ مِنْهَا تَأْكُلُونَ ٧٣ ﴿ [الزخرف: ٦٨، ٧٣]অর্থাৎ হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং তোমরা দুঃখিতও হবে না। যারা আমার আয়াতে বিশ্বাস করেছিলে এবং আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) ছিলে। তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিণীগণ সানন্দে জান্নাতে প্রবেশ কর। স্বর্ণের থালা ও পান পাত্র নিয়ে ওদের মাঝে ফিরানো হবে, সেখানে রয়েছে এমন সমস্ত কিছু, যা মন চায় এবং যাতে নয়ন তৃপ্ত হয়। সেখানে তোমরা চিরকাল থাকবে। এটিই জান্নাত, তোমরা তোমাদের কর্মের ফলস্বরূপ যার অধিকারী হয়েছ। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তা থেকে তোমরা আহার করবে।(সূরা যুখরুফ ৬৮-৭৩ আয়াত)তিনি অন্য জায়গায় বলেন,﴾ إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ ٥١ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ ٥٢يَلْبَسُونَ مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَقَابِلِينَ ٥٣ كَذَٰلِكَ وَزَوَّجْنَاهُمْ بِحُورٍ عِينٍ ٥٤ يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَاكِهَةٍ آمِنِينَ ٥٥ لَا يَذُوقُونَ فِيهَا الْمَوْتَ إِلَّا الْمَوْتَةَ الْأُولَىٰ ۖ وَوَقَاهُمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ ٥٦ فَضْلًا مِنْ رَبِّكَ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ٥٧ ﴿ [الدخان: ٥١، ٥٧]অর্থাৎ নিশ্চয় সাবধানীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে- বাগানসমূহে ও ঝরনারাজিতে, ওরা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং মুখোমুখি হয়ে বসবে। এরূপই ঘটবে ওদের; আর আয়তলোচনা হুরদের সাথে তাদের বিবাহ দেব। সেখানে তারা নিশ্চিন্তে বিবিধ ফলমূল আনতে বলবে। [ইহকালে] প্রথম মৃত্যুর পর তারা সেখানে আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। আর তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করবেন। [এ প্রতিদান] তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহসবরূপ। এটিই তো মহা সাফল্য।(সূরা দুখান ৫১-৫৭ আয়াত)আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন,﴾ إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ ٢٢ عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ ٢٣ تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ ٢٤ يُسْقَوْنَ مِنْ رَحِيقٍ مَخْتُومٍ ٢٥ خِتَامُهُ مِسْكٌ ۚ وَفِي ذَٰلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ ٢٦ وَمِزَاجُهُ مِنْ تَسْنِيمٍ ٢٧ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ ٢٨ ﴿ [المطففين: ٢٢، ٢٨]অর্থাৎ পুণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে। তারা সুসজ্জিত আসনে বসে দেখতে থাকবে। তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা দেখতে পাবে। তাদেরকে মোহর আঁটা বিশুদ্ধ মদিরা হতে পান করানো হবে। এর মোহর হচ্ছে কস্তুরীর। আর তা লাভের জন্যই প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক। এর মিশ্রণ হবে তাসনীমের [পানির]। এটা একটি প্রস্রবণ, যা হতে নৈকট্য-প্রাপ্ত ব্যক্তিরা পান করবে।(সূরা মুত্বাফিফীন ২২-২৮]এ মর্মে আরও বহু আয়াত বিদ্যমান।
জান্নাতে রবের দীদার: জান্নাতিদের কাছে প্রিয়তম নেয়ামত
রিয়াদুস সালেহীন : ১৭/১৯০৫
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ১৭/১৯০৫
وَعَنْ صُهَيبٍ رضي الله عنه : أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ: «إِذَا دَخَلَ أَهْلُ الجَنَّةِ الجَنَّةَ يَقُولُ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: تُريدُونَ شَيئاً أَزِيدُكُمْ؟ فَيَقُولُونَ : أَلَمْ تُبَيِّضْ وُجُوهَنَا؟ أَلَمْ تُدْخِلْنَا الجَنَّةَ وَتُنَجِّنَا مِنَ النَّارِ ؟ فَيَكْشِفُ الحِجَابَ، فَمَا أُعْطُوا شَيْئاً أَحَبَّ إلَيْهِمْ مِنَ النَّظَرِ إلَى رَبِّهِمْ». رواه مسلم.
সুহাইব (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ’’জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করে যাবে, তখন মহান বরকতময় আল্লাহ বলবেন, ’তোমরা কি চাও যে, আমি তোমাদের জন্য আরও কিছু বেশি দিই?’ তারা বলবে, ’তুমি কি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করে দাওনি? আমাদেরকে তুমি জান্নাতে প্রবিষ্ট করনি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাওনি?’ অতঃপর আল্লাহ [হঠাৎ] পর্দা সরিয়ে দেবেন [এবং তারা তাঁর চেহারা দর্শন লাভ করবে]। সুতরাং জান্নাতের লব্ধ যাবতীয় সুখ-সামগ্রীর মধ্যে জান্নাতিদের নিকট তাদের প্রভুর দর্শন [দীদার]ই হবে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।’’ (মুসলিম) [১]মহান আল্লাহ বলেছেন, ﴿إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُمْ بِإِيمَانِهِمْ ۖ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ ٩ دَعْوَاهُمْ فِيهَا سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَتَحِيَّتُهُمْ فِيهَا سَلَامٌ ۚ وَآخِرُ دَعْوَاهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ١٠﴾[يونس : ٩، ١٠] অর্থাৎ নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস করেছে এবং ভাল কাজ করেছে তাদের প্রতিপালক তাদের বিশ্বাসের কারণে তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন, শান্তির উদ্যানসমূহে তাদের [বাসস্থানের] তলদেশ দিয়ে নদীমালা প্রবাহিত থাকবে। সেখানে তাদের বাক্য হবে, ’সুবহানাকাল্লাহুম্মা’ [হে আল্লাহ! তুমি মহান পবিত্র]! এবং পরস্পরের অভিবাদন হবে সালাম। আর তাদের শেষ বাক্য হবে, ’আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’ [সমস্ত প্রশংসা সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য]। (সূরা ইউনুস ৯-১০]الحَمْدُ للهِ الَّذِي هَدَانَا لِهَذَا وَمَا كُنَّا لِنَهْتَدِي لَوْلاَ أَنْ هَدَانَا اللهُ . اَللهم صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ عَبْدِكَ وَرَسُولِكَ النَّبيِّ الأُمِّيِّ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ وَأزوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ، كما صَلَّيْتَ عَلَى إبْرَاهِيمَ وعلى آلِ إبْراهِيمَ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبيِّ الأُمِّيِّ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ وَأزْوَاجِهِ وَذُرِّيَّتِهِ، كما بَاركْتَ عَلَى إبْرَاهِيمَ وَعَلَى آل إبراهيم في العالَمِينَ إنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ .
মুসলিম ১৮১, তিরমিযী ২৫৫২, ইবনু মাজাহ ১৮৭, আহমাদ ১৮৫৫৬, ১৮৪৬২, ২৩৪০৭
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ১৭/১৯০৫-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে জান্নাতের এক বিশেষ নেয়ামতের কথা এসেছে—জান্নাতিদের জন্য তাদের প্রভুর দর্শন। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন, জান্নাতিরা জান্নাতে প্রবেশ করার পর আল্লাহ তাদের বলবেন, তোমরা কি চাও, আমি তোমাদের আরও কিছু বেশি দিই? তারা বলবে, তুমি কি আমাদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করোনি? আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাওনি? আমাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাওনি? এরপর আল্লাহ পর্দা সরিয়ে দেবেন, আর তারা তাদের প্রভুর দর্শন লাভ করবে। হাদিসে বলা হয়েছে, জান্নাতের পাওয়া সব সুখ-সামগ্রীর মধ্যে তাদের কাছে প্রভুর দর্শনই সবচেয়ে বেশি প্রিয় হবে। এরপর সূরা ইউনুসের আয়াতেও ঈমান ও ভালো কাজের লোকদের জন্য জান্নাতের নদী, সালাম, তাসবিহ এবং আল্লাহর প্রশংসার কথা এসেছে। তাই এই হাদিস জান্নাত, আল্লাহর দয়া, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং রবের দীদার—সবকিছুকে একসঙ্গে মনে করিয়ে দেয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- জান্নাতে প্রবেশ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি আল্লাহর বড় দান।
- জান্নাতিদের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করা হবে—এটি হাদিসে উল্লেখিত সম্মান।
- আল্লাহ পর্দা সরিয়ে জান্নাতিদের তাঁর দর্শন দান করবেন।
- হাদিসের ভাষায়, রবের দর্শন জান্নাতিদের কাছে জান্নাতের অন্যান্য নেয়ামতের চেয়েও বেশি প্রিয় হবে।
