আইন ও ন্যায়বিচার
মোট হাদিস ০৩
ইসলামে আইন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অনন্য দিকনির্দেশনা
ইসলামে সমাজ বিনির্মাণে আইন ও ন্যায়বিচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর কিতাব বা কিতাবুল্লাহ অনুযায়ী ফয়সালা করাই ইসলামের মূল নীতি। অবিবাহিত অবাধ্য আচরণের ক্ষেত্রে বেত্রাঘাত ও নির্বাসন এবং গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে রজম বা কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে ইসলামে কিসাস বা সমতাভিত্তিক আইনি প্রতিশোধের বিধান থাকলেও, সংক্ষুব্ধ পক্ষ চাইলে ক্ষতিপূরণ বা ক্ষমার পথ বেছে নিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বিবাদের ক্ষেত্রে প্রথমে আপস ও উদারতার পরামর্শ দিতেন, কিন্তু কেউ শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন করলে বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুললে তিনি নিখুঁত ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রকৃত হকদারকে তার পূর্ণ অধিকার ফিরিয়ে দিতেন। ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, আল্লাহর আইনকে বিচারক হিসেবে মেনে নেওয়া এবং রাসুলের ফয়সালাকে দ্বিধাহীন চিত্তে কবুল করাই প্রকৃত মুমিনের মূল বৈশিষ্ট্য।
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ الأَنْصَارِيُّ، قَالَ حَدَّثَنِي حُمَيْدٌ، أَنَّ أَنَسًا، حَدَّثَهُمْ أَنَّ الرُّبَيِّعَ ـ وَهْىَ ابْنَةُ النَّضْرِ ـ كَسَرَتْ ثَنِيَّةَ جَارِيَةٍ، فَطَلَبُوا الأَرْشَ وَطَلَبُوا الْعَفْوَ، فَأَبَوْا فَأَتَوُا النَّبِيَّ ﷺ فَأَمَرَهُمْ بِالْقِصَاصِ. فَقَالَ أَنَسُ بْنُ النَّضْرِ أَتُكْسَرُ ثَنِيَّةُ الرُّبَيِّعِ يَا رَسُولَ اللَّهِ لاَ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لاَ تُكْسَرُ ثَنِيَّتُهَا فَقَالَ «يَا أَنَسُ كِتَابُ اللَّهِ الْقِصَاصُ». فَرَضِيَ الْقَوْمُ وَعَفَوْا فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ " إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ مَنْ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لأَبَرَّهُ ". زَادَ الْفَزَارِيُّ عَنْ حُمَيْدٍ عَنْ أَنَسٍ فَرَضِيَ الْقَوْمُ وَقَبِلُوا الأَرْشَ.
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রুবাইয়্যি বিনতে নাযর (রাঃ) এক কিশোরীর সামনের দাঁত ভেঙ্গে ফেলেছিল। তারা ক্ষতিপূরণ চাইল আর অপরপক্ষ ক্ষমা চাইল। তারা অস্বীকার করল এবং নবী (ﷺ)-এর নিকট এল। তিনি কিসাসের আদেশ দিলেন। আনাস ইব্নু নাযর (রাঃ) তখন বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! রুবাইয়্যি-এর দাঁত ভাঙ্গা হবে? না, যিনি আপনাকে সত্য সহ পাঠিয়েছেন তাঁর কসম তাঁর দাঁত ভাঙ্গা হবে না।’ তিনি বললেন, ‘হে আনাস, আল্লাহ্র বিধান হল কিসাস।’ অতঃপর বাদীপক্ষ রাজী হয় এবং ক্ষমা করে দেয়। তখন নবী (ﷺ) বললেন, আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে এমন বান্দাও রয়েছেন যে, আল্লাহ্র নামে কোন কসম করলে তা পূরণ করেন।ফাযারী (রহঃ) হুমায়দ (রহঃ) সূত্রে আনাস (রাঃ) হতে রিওয়ায়াত করতে গিয়ে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, তখন লোকেরা রাজী হল এবং ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করল।
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ أَخْبَرَنِي عُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ، أَنَّ الزُّبَيْرَ، كَانَ يُحَدِّثُ أَنَّهُ خَاصَمَ رَجُلاً مِنَ الأَنْصَارِ قَدْ شَهِدَ بَدْرًا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فِي شِرَاجٍ مِنَ الْحَرَّةِ كَانَا يَسْقِيَانِ بِهِ كِلاَهُمَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِلزُّبَيْرِ " اسْقِ يَا زُبَيْرُ ثُمَّ أَرْسِلْ إِلَى جَارِكَ ". فَغَضِبَ الأَنْصَارِيُّ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ آنْ كَانَ ابْنَ عَمَّتِكَ فَتَلَوَّنَ وَجْهُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ثُمَّ قَالَ " اسْقِ ثُمَّ احْبِسْ حَتَّى يَبْلُغَ الْجَدْرَ ". فَاسْتَوْعَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ حِينَئِذٍ حَقَّهُ لِلزُّبَيْرِ، وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَبْلَ ذَلِكَ أَشَارَ عَلَى الزُّبَيْرِ بِرَأْىٍ سَعَةٍ لَهُ وَلِلأَنْصَارِيِّ، فَلَمَّا أَحْفَظَ الأَنْصَارِيُّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ اسْتَوْعَى لِلزُّبَيْرِ حَقَّهُ فِي صَرِيحِ الْحُكْمِ. قَالَ عُرْوَةُ قَالَ الزُّبَيْرُ وَاللَّهِ مَا أَحْسِبُ هَذِهِ الآيَةَ نَزَلَتْ إِلاَّ فِي ذَلِكَ {فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ} الآيَةَ.
যুবায়র (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি এক আনসারীর সঙ্গে বিবাদ করেছিলেন, যিনি বদরে শরীক ছিলেন। তিনি আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে প্রস্তরময় যমীনের একটি নালা সম্পর্কে অভিযোগ করলেন। তাঁরা উভয়ে সে নালা হতে পানি সেচ করতেন। তখন আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ) যুবাইরকে বললেন, ‘হে যুবাইর! তুমি প্রথমে পানি সেচবে। অতঃপর তোমার প্রতিবেশির দিকে পানি ছেড়ে দিবে।’আনসারী তখন রেগে গেল এবং বললো, ‘হে আল্লাহ্র রাসূল! সে আপনার ফুফুর ছেলে হওয়ার কারণে?’ এতে আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ)-এর চেহারার রঙ বদলে গেল। অতঃপর তিনি বললেন, ‘তুমি সেচ কর, অতঃপর পানি আটকে রাখ, বাঁধ বরাবর পৌঁছা পর্যন্ত’। আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ) যুবাইর (রাঃ)-কে তাঁর পূর্ণ হক দিলেন। এর আগে যুবাইর (রাঃ)-কে তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন যা আনসারীর জন্য সুবিধাজনক ছিল। কিন্তু আনসারী আল্লাহ্র রাসূলকে রাগান্বিত করলে সুস্পষ্ট নির্দেশের মাধ্যমে যুবাইর (রাঃ)-কে তিনি তাঁর পূর্ণ হক দান করলেন।‘উরওয়াহ (রহঃ) বলেন, যুবাইর (রাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ্র কসম! আমার নিশ্চিত ধারণা যে (আল্লাহ্র বাণী) : কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তাঁরা মুমিন হবে না যতক্ষণ তাঁরা তাদের নিজেদের বিবাদে আপনাকে বিচারক হিসাবে মান্য না করে- (সূরা আন-নিসাঃ ৬৫) আয়াতটি সে ব্যাপারেই নাযিল হয়েছিল।’
حَدَّثَنَا آدَمُ، حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، حَدَّثَنَا الزُّهْرِيُّ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، وَزَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ، رضى الله عنهما قَالاَ جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ اقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللَّهِ. فَقَامَ خَصْمُهُ فَقَالَ صَدَقَ، اقْضِ بَيْنَنَا بِكِتَابِ اللَّهِ. فَقَالَ الأَعْرَابِيُّ إِنَّ ابْنِي كَانَ عَسِيفًا عَلَى هَذَا، فَزَنَى بِامْرَأَتِهِ، فَقَالُوا لِي عَلَى ابْنِكَ الرَّجْمُ. فَفَدَيْتُ ابْنِي مِنْهُ بِمِائَةٍ مِنَ الْغَنَمِ وَوَلِيدَةٍ، ثُمَّ سَأَلْتُ أَهْلَ الْعِلْمِ، فَقَالُوا إِنَّمَا عَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ. فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ " لأَقْضِيَنَّ بَيْنَكُمَا بِكِتَابِ اللَّهِ، أَمَّا الْوَلِيدَةُ وَالْغَنَمُ فَرَدٌّ عَلَيْكَ، وَعَلَى ابْنِكَ جَلْدُ مِائَةٍ وَتَغْرِيبُ عَامٍ، وَأَمَّا أَنْتَ يَا أُنَيْسُ ـ لِرَجُلٍ ـ فَاغْدُ عَلَى امْرَأَةِ هَذَا فَارْجُمْهَا ". فَغَدَا عَلَيْهَا أُنَيْسٌ فَرَجَمَهَا.
আবূ হুরায়রা ও যায়েদ ইব্নু খালিদ আল-জুহানী (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তাঁরা উভয়ে বলেন যে, এক বেদুইন এসে বলল’ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ্র কিতাব মোতাবেক আমাদের মাঝে ফয়সালা করে দিন।’ তখন তার প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে বলল, ‘সে ঠিকই বলেছে, হ্যাঁ, আপনি আমাদের মাঝে কিতাবুল্লাহ্ মোতাবেক ফয়সালা করুন।’ পরে বেদুইন বলল, ‘আমার ছেলে এ লোকের বাড়িতে মজুর ছিল। অতঃপর তার স্ত্রীর সঙ্গে সে যিনা করে।’ লোকেরা আমাকে বললোঃ তোর ছেলের উপর রজম (পাথরের আঘাতে হত্যা) ওয়াজিব হয়েছে। তখন আমার ছেলেকে একশ ‘বকরী এবং একটি বাঁদীর বিনিময়ে এর নিকট মুক্ত করে এনেছি। পরে আমি আলিমদের নিকট জিজ্ঞেস করলে তারা বললেন, ‘তোমার ছেলের উপর একশ’বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন ওয়াজিব হয়েছে।’সব শুনে নবী (ﷺ) বললেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে কিতাবুল্লাহ্ মোতাবেকই ফয়সালা করব। বাঁদী এবং বকরী পাল তোমাকে ফেরত দেয়া হবে, আর তোমার ছেলেকে একশ’বেত্রাঘাত সহ এক বছরের নির্বাসন দেয়া হবে।’ আর অপরজনের ব্যাপারে বললেন, ‘হে উনাইস! তুমি আগামীকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর নিকট যাবে এবং তাকে রজম করবে।’ উনাইস তার নিকট গেলেন এবং তাকে রজম করলেন।
