২৩/০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৫১৬-[৩] - শিঙ্গা, মধু ও দাগের চিকিৎসা
চিকিৎসা ও মন্ত্র - প্রথম অনুচ্ছেদ
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, চিকিৎসাশাস্ত্রের মৌলিক উদ্দেশ্য তিনটি। শারীরিক সুস্থতার সংরক্ষণ, দুর্ভোগ ও কষ্ট লাঘব এবং শরীর হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আলোচ্য অধ্যায়ে দু’ প্রকার চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে।প্রথমত শারীরিক চিকিৎসা, মূলত এটিই এখানে উদ্দেশ্য।দ্বিতীয়ত অন্তরের চিকিৎসা, যার মৌলিক উপাদান হচ্ছে নবী (ﷺ) কর্তৃক আনীত আল্লাহ তা‘আলার বাণী মহাগ্রন্থ আল কুরআন।শারীরিক ব্যাধির চিকিৎসার বিষয়টি হাদীসে বিভিন্নভাবে এসেছে যা ত্বিবিব নবী হিসেবে পরিচিত।অন্যদের থেকেও বর্ণিত হয়েছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়। শারীরিক ব্যাধির এ চিকিৎসা আবার দুই ধরনের। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে প্রাণীকুলের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত কিছু প্রাকৃতিক বিষয়, যেমন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা। অন্যটি চিন্তা-ভাবনা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য।ইসলামী শারী‘আর আলোকে চিকিৎসার আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে ঝাড়ফুঁক। যা বাস্তবসম্মত ও পরীক্ষিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। ইমাম বাযযার (রহিমাহুল্লাহ) ‘উরওয়াহ্ হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললাম, আপনি চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কীয় প্রচুর জ্ঞান কিভাবে অর্জন করলেন? তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিভিন্ন সময়ের ব্যাধিতে ‘আরব চিকিৎসকগণ তাঁর চিকিৎসার প্রাক্কালে আমি এ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছি।ইমাম সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে নবী (ﷺ) হতে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থও রচিত হয়েছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের উৎপত্তি সম্পর্কে অনেক মতামত বিদিত রয়েছে। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ কথা হচ্ছে এ সম্পর্কিত কতক বিষয় নবীগণ ওয়াহীর মাধ্যমে অবগত হয়েছেন। তবে অধিকাংশ বিষয়ই অভিজ্ঞতালব্ধ।ইমাম বাযযার ও ত্ববারানী (রহিমাহুমাল্লাহ) ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণনা করেন যে, নবী (ﷺ) বলেনঃ সুলায়মান (আঃ) যখনই সালাতে দাঁড়াতেন তিনি তাঁর সম্মুখে একটি বৃক্ষ দেখতে পেতেন। তিনি বৃক্ষটিকে বলতেন, তোমার নাম কী? সেটি তার নাম উল্লেখ করলে, আবারো জিজ্ঞেস করতেন। তুমি কী জন্য? সেটি ঔষধি হলে তিনি তা লিখে রাখতেন ও পরে তা রোপণ করতেন।অত্র অধ্যায়ের সারমর্ম এই যে, প্রত্যেক মানুষের সুস্থতা ও অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ হতে লিখিত ভাগ্যলিপির অংশ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
শিঙ্গা, মধু ও দাগ সম্পর্কে নববী চিকিৎসা
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৪৫১৬-[৩]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৪৫১৬-[৩]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الشِّفَاءُ فِي ثَلَاثٍ: فِي شَرْطَةِ مِحْجَمٍ أَوْ شَرْبَةِ عَسَلٍ أَوْ كَيَّةٍ بِنَارٍ وَأَنَا أَنْهَى أُمَّتِي عَنِ الْكَيِّ .رَوَاهُ البُخَارِيّ
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : তিন জিনিসের মধ্যে রোগের নিরাময় রয়েছে, শিঙ্গা লাগানো বা মধু পান করা অথবা তপ্ত লোহা দ্বারা দাগ দেয়া। তবে আমি আমার উম্মাতকে দাগ হতে নিষেধ করেছি।
[১] সহীহ : বুখারী ৫৬৮০, ইবনু মাজাহ ৩৪৯১, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১১৫৪, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১২০৭৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০০২৭, শু‘আবুল ঈমান ১১৬৪, আল জামি‘উস্ সগীর ৬০৪৭, সহীহুল জামি‘ ৩৭৩৪।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৫১৬-[৩]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন, তিন জিনিসের মধ্যে রোগের নিরাময় রয়েছে: শিঙ্গা লাগানো, মধু পান করা এবং তপ্ত লোহা দিয়ে দাগ দেওয়া। এরপর তিনি বলেন, তিনি তাঁর উম্মতকে দাগ দেওয়া থেকে নিষেধ করেছেন। এখানে চিকিৎসার কিছু পদ্ধতির কথা এসেছে, তবে দাগ দেওয়ার বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। হাদিসটি চিকিৎসা সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা দেয়। একদিকে নিরাময়ের উপায় হিসেবে শিঙ্গা ও মধুর কথা এসেছে; অন্যদিকে দাগ দেওয়া থাকলেও উম্মতের জন্য তা থেকে নিষেধ এসেছে। তাই এই বর্ণনা পড়লে চিকিৎসা, নববী উপায় এবং সতর্কতার বিষয় একসাথে বোঝা দরকার। হাদিসের বাইরে গিয়ে সব রোগের জন্য একই পদ্ধতি দাবি করা ঠিক নয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- শিঙ্গা লাগানো ও মধু পানকে নিরাময়ের উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
- তপ্ত লোহা দিয়ে দাগ দেওয়ার কথাও এসেছে, তবে উম্মতকে তা থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
- চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাদিসের ভাষা ও সীমা বুঝে কথা বলা দরকার।
- নিরাময়ের উপায় গ্রহণের সঙ্গে নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর নির্দেশনা মানা জরুরি।
