২৩/০. অধ্যায়ঃ
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, চিকিৎসাশাস্ত্রের মৌলিক উদ্দেশ্য তিনটি। শারীরিক সুস্থতার সংরক্ষণ, দুর্ভোগ ও কষ্ট লাঘব এবং শরীর হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আলোচ্য অধ্যায়ে দু’ প্রকার চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে।প্রথমত শারীরিক চিকিৎসা, মূলত এটিই এখানে উদ্দেশ্য।দ্বিতীয়ত অন্তরের চিকিৎসা, যার মৌলিক উপাদান হচ্ছে নবী (ﷺ) কর্তৃক আনীত আল্লাহ তা‘আলার বাণী মহাগ্রন্থ আল কুরআন।শারীরিক ব্যাধির চিকিৎসার বিষয়টি হাদীসে বিভিন্নভাবে এসেছে যা ত্বিবিব নবী হিসেবে পরিচিত।অন্যদের থেকেও বর্ণিত হয়েছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়। শারীরিক ব্যাধির এ চিকিৎসা আবার দুই ধরনের। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে প্রাণীকুলের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত কিছু প্রাকৃতিক বিষয়, যেমন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা। অন্যটি চিন্তা-ভাবনা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য।ইসলামী শারী‘আর আলোকে চিকিৎসার আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে ঝাড়ফুঁক। যা বাস্তবসম্মত ও পরীক্ষিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। ইমাম বাযযার (রহিমাহুল্লাহ) ‘উরওয়াহ্ হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললাম, আপনি চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কীয় প্রচুর জ্ঞান কিভাবে অর্জন করলেন? তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিভিন্ন সময়ের ব্যাধিতে ‘আরব চিকিৎসকগণ তাঁর চিকিৎসার প্রাক্কালে আমি এ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছি।ইমাম সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে নবী (ﷺ) হতে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থও রচিত হয়েছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের উৎপত্তি সম্পর্কে অনেক মতামত বিদিত রয়েছে। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ কথা হচ্ছে এ সম্পর্কিত কতক বিষয় নবীগণ ওয়াহীর মাধ্যমে অবগত হয়েছেন। তবে অধিকাংশ বিষয়ই অভিজ্ঞতালব্ধ।ইমাম বাযযার ও ত্ববারানী (রহিমাহুমাল্লাহ) ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণনা করেন যে, নবী (ﷺ) বলেনঃ সুলায়মান (আঃ) যখনই সালাতে দাঁড়াতেন তিনি তাঁর সম্মুখে একটি বৃক্ষ দেখতে পেতেন। তিনি বৃক্ষটিকে বলতেন, তোমার নাম কী? সেটি তার নাম উল্লেখ করলে, আবারো জিজ্ঞেস করতেন। তুমি কী জন্য? সেটি ঔষধি হলে তিনি তা লিখে রাখতেন ও পরে তা রোপণ করতেন।অত্র অধ্যায়ের সারমর্ম এই যে, প্রত্যেক মানুষের সুস্থতা ও অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ হতে লিখিত ভাগ্যলিপির অংশ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَا أَنْزَلَ اللَّهُ دَاء إِلا أنزل لَهُ دَوَاء».رَوَاهُ البُخَارِيّ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : আল্লাহ তা'আলা এমন কোন রোগ নাযিল করেননি, যার ঔষধ পয়দা করেননি।
[১] সহীহ : বুখারী ৫৬৭৮, নাসায়ী আল কুবরা ৬৮৬৫, ইবনু মাজাহ ৩৪৩৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬০৭৫, আহমাদ ৩৫৭৮, সহীহুল জামি‘ ৫৫৫৯, আল জামি‘উস্ সগীর ১০৪৯৬, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৪৫১।
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لِكُلِّ دَاءٍ دَوَاءٌ فَإِذَا أُصِيبَ دَوَاءٌ الدَّاءَ بَرَأَ بِإِذْنِ اللَّهِ» .رَوَاهُ مُسلم
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : প্রত্যেক রোগের জন্য ঔষধ রয়েছে। সুতরাং সঠিক ঔষধ যখন রোগের জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন আল্লাহ তা'আলার হুকুমে রোগী রোগমুক্ত হয়ে যায়।
[১] সহীহ : মুসলিম (২২০৪)-৬৯, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬০৬৩, নাসায়ী আল কুবরা ৭৫৫৬, মুসতাদরাক লিল হাকিম ৮২১৯, আল জামি‘উস্ সগীর ৯২৯৫, সহীহুল জামি‘ ৫১৬৪, মা‘রিফাতুস্ সুনান ওয়াল আসার লিল বায়হাক্বী ৫৯৫৪, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০০৪২।
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الشِّفَاءُ فِي ثَلَاثٍ: فِي شَرْطَةِ مِحْجَمٍ أَوْ شَرْبَةِ عَسَلٍ أَوْ كَيَّةٍ بِنَارٍ وَأَنَا أَنْهَى أُمَّتِي عَنِ الْكَيِّ .رَوَاهُ البُخَارِيّ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : তিন জিনিসের মধ্যে রোগের নিরাময় রয়েছে, শিঙ্গা লাগানো বা মধু পান করা অথবা তপ্ত লোহা দ্বারা দাগ দেয়া। তবে আমি আমার উম্মাতকে দাগ হতে নিষেধ করেছি।
[১] সহীহ : বুখারী ৫৬৮০, ইবনু মাজাহ ৩৪৯১, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১১৫৪, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ১২০৭৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০০২৭, শু‘আবুল ঈমান ১১৬৪, আল জামি‘উস্ সগীর ৬০৪৭, সহীহুল জামি‘ ৩৭৩৪।
وَعَن جابرٍ قَالَ: رُمِيَ أَبِي يَوْمَ الْأَحْزَابِ عَلَى أَكْحَلِهِ فَكَوَاهُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. رَوَاهُ مُسلم
আহযাবের (খন্দাকের) যুদ্ধে উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ)-এর শিরারোগে তীর বিদ্ধ হয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে (ক্ষত স্থানটিতে) দাগিয়েছেন।
[১] সহীহ : মুসলিম (২২০৭)-৭৪, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০০৩২, হিলইয়াতুল আওলিয়া ১০/৪০১ পৃঃ, আহমাদ ১৪২৫২, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ২২৮৫, মুসনাদে ‘আব্দ ইবনু হুমায়দ ১০১৮।
وَعَنْهُ قَالَ: رُمِيَ سَعْدُ بْنُ مُعَاذٍ فِي أكحله فحمسه النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ بِمِشْقَصٍ ثمَّ ورمت فحمسه الثَّانِيَة. رَوَاهُ مُسلم
সা'দ ইবনু মু'আয (রাঃ)-এর শিরারগে তীর বিদ্ধ হয়েছিল। তখন নবী (ﷺ) নিজ হাতে উক্ত স্থানটিতে তীরের ফলক দ্বারা দাগিয়েছেন। অতঃপর তাঁর (সা'দ-এর) হাত ফুলে গিয়েছিল, সুতরাং দ্বিতীয়বার তাঁকে দাগিয়েছেন।
[১] সহীহ : মুসলিম (২২০৮)-৭৫, আহমাদ ১৪৩৪৩, মুসতাদরাক লিল হাকিম ৮২৮৭, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২০০৩৩, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৫১৮৮।
وَعَنْهُ قَالَ: بَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى أُبيِّ بن كَعْب طَبِيبا فَقَطَعَ مِنْهُ عِرْقًا ثُمَّ كَوَاهُ عَلَيْهِ. رَوَاهُ مُسلم
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উবাই ইবনু কা'ব (রাঃ)-এর নিকট একজন চিকিৎসক পাঠালেন, সে তাঁর একটি রগ কেটে পরে তা দাগাল।
[১] সহীহ : মুসলিম (২২০৭)-৭৩, শু‘আবুল ঈমান ১১৬৩, মা‘রিফাতুস্ সুনান ওয়াল আসার লিল বায়হাক্বী ৫৯৫৪, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৩৬২৯, আহমাদ ১৪৩৭৯, ‘বায়হাক্বী’র কুবরা ২০০৩১, মুসতাদরাক লিল হাকিম ৭৪৯৪।
وَعَن أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «فِي الْحَبَّةِ السَّوْدَاءِ شِفَاءٌ مِنْ كُلِّ دَاءٍ إِلَّا السَّامَ». قَالَ ابْنُ شِهَابٍ: السَّامُ: الْمَوْتُ وَالْحَبَّةُ السَّوْدَاءُ: الشُّونِيزُ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : কালোজিরার মধ্যে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আর সকল রোগের চিকিৎসা নিহিত আছে। ইবনু শিহাৰ (রহঃ) বলেছেন : “সাম” অর্থ মৃত্যু। আর “হাব্বাতুস্ সাওদা” অর্থ শূনীয বা কালোজিরা।
[১] সহীহ : বুখারী ৫৬৮৭, ৫৬৮৮; মুসলিম (২২১৫)-৮৮, ইবনু মাজাহ ৩৪৪৭, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ৮৫৯, ১০৬৯; আল জামি‘উস্ সগীর ৭৬৯৬, সহীহুল জামি‘ ৪২৪৭, আহমাদ ৭৫৫৭, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৫৯১৮, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ১০৫, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৪৯৩।
وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَخِي اسْتَطْلَقَ بَطْنُهُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اسقيه عسَلاً» فَسَقَاهُ ثُمَّ جَاءَ فَقَالَ: سَقَيْتُهُ فَلَمْ يَزِدْهُ إِلَّا اسْتِطْلَاقًا فَقَالَ لَهُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ. ثُمَّ جَاءَ الرَّابِعَةَ فَقَالَ: «اسْقِهِ عَسَلًا». فَقَالَ: لَقَدْ سَقَيْتُهُ فَلَمْ يَزِدْهُ إِلَّا اسْتِطْلَاقًا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «صَدَقَ اللَّهُ وَكَذَبَ بَطْنُ أَخِيكَ». فَسَقَاهُ فَبَرَأَ
জনৈক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, আমার ভাইয়ের ডায়রিয়া হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : তাকে মধু পান করাও। সে মধু পান করাল। সে আবার এসে বলল : আমি তাকে মধু পান করিয়েছি, এতে তার ডায়রিয়া আরো বেড়ে গেছে। এভাবে তিনি তাঁকে তিনবার বললেন (অর্থাৎ- ডায়রিয়া ক্রমশ বেড়ে যাওয়ার কথা জানালো)।অতঃপর সে চতুর্থবার এসে অভিযোগ করল। এবারও তিনি (ﷺ) বললেন : তাকে মধু পান করাও। সে বলল : আমি অবশ্যই তাকে মধু পান করিয়েছি, কিন্তু তার ডায়রিয়া আরো বেড়ে গিয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন : আল্লাহ (তাঁর কালামে) যা বলেছেন, তা সত্য, তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যা (অর্থাৎ- পেটে দূষিত কোন কিছু রয়েছে।) অতঃপর আবার তাকে মধু পান করাল এবং সে আরোগ্য লাভ করল।
[১] সহীহ : বুখারী ৫৭১৬, মুসলিম (২২১৭)-৯১, তিরমিযী ২০৮২, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ২৪৩, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৩৬৮৬, আহমাদ ১১১৬২, আবূ ইয়া‘লা ১২৬১, মুসতাদরাক হাকিম ৮২২১, ‘নাসায়ী’র কুবরা ৭৫৬১।
وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ أَمْثَلَ مَا تَدَاوَيْتُمْ بِهِ الْحجامَة والقُسْط البحري»
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: তোমরা যেসব জিনিস দ্বারা চিকিৎসা করো, এর মধ্যে শিঙ্গা লাগানো এবং কুস্ত বাহরি (চন্দন কাঠ) ব্যবহার করা সর্বোত্তম।
[১] সহীহ : বুখারী ৫৬৯৬, মুসলিম (১৫৭৭)-৬৩, আহমাদ ১২০৪৫, মুসনাদুশ্ শাফি‘ঈ ৯৩০, মা‘রিফাতুস্ সুনান লিল বায়হাক্বী ৫৯৪৯, মুসান্নাফ আবূ শায়বাহ্ ২৩৪৩, মুসনাদে ‘আবদ ইবনু হুমায়দ ১৪০৩, বায়হাক্বী’র কুবরা ২০০০৭।
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تُعَذِّبُوا صِبْيَانَكُمْ بِالْغَمْزِ مِنَ الْعُذْرَةِ عَلَيْكُمْ بِالْقُسْطِ»
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : ‘উাহ্ রোগের জন্য তোমাদের শিশুদের জিহ্বার তালু দাবিয়ে তাদেরকে কষ্ট দিয়ো না; বরং তোমরা কুস্ত বাহরি (চন্দন কাঠ) ব্যবহার করো।
[১] সহীহ : বুখারী ৫৬৯৬, মুসলিম (১৫৭৭)-৬৩, ‘নাসায়ী’র কুবরা ৭৫৮২, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ২৭২৬, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১০৫৩, ১০৫৪; আল জামি‘উস্ সগীর ৫৬৩৫, সহীহুল জামি‘ ৩৩২৪, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৪৩৮৩।