নিয়তের হাদিস (গ্রন্থকারের ভূমিকা)

০/০. অধ্যায়ঃ

মূল গ্রন্থকারের ভূমিকা

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যই। আমরা তাঁরই প্রশংসা করছি, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি। আমরা আমাদের মনের কুমন্ত্রণা ও মন্দ কাজ হতে তাঁর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দান করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন কেউ তাকে হিদায়াত করার সামর্থ্য রাখে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ’’আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন মা’বূদ নেই’’। এটা আমার নাজাতের ওয়াসীলাহ্ এবং মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হবে। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রসূল। মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁকে এমন সময় দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, যখন ঈমানের পথের সমস্ত নিশানা মুছে গিয়েছিল, ঈমানী আলোসমূহ নিভে গিয়েছিল, তার স্তম্ভসমূহ দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং মানুষ সে সবের স্থান পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিল। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এসে ঐসব জিনিসকে মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন এবং ঈমানের মশালকে উঁচু করে ধরলেন। যারা গুমরাহীর রোগে মরতে বসেছিল, তাদেরকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাওহীদের কালিমাহ্ দ্বারা আরোগ্য করলেন, যারা হিদায়াতের পথ খুঁজছিল তাদেরকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পথ দেখালেন এবং যারা সৌভাগ্য ভান্ডারের মালিক হতে চেয়েছিল, তাদের জন্য তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সে পথ পরিষ্কার করে দিলেন।অতঃপর নিশ্চয়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্ষ থেকে প্রকাশিত বিষয়াবলীর অনুসরণ ব্যতীত তাঁর আদর্শকে আঁকড়ে ধরাটা পরিপূর্ণ হবে না এবং আল্লাহর রজ্জু তথা কুরআনকে মজবুত করে ধারণ করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যাখ্যা ব্যতীত পূর্ণতা লাভ করবে না। ইমাম মুহয়্যিইউস্ সুন্নাহ্ আবূ মুহাম্মাদ হুসায়ন ইবনু মাস্’ঊদ ফাররা বাগাবী (মৃঃ ১৫৬ হিঃ) কর্তৃক রচিত ’’মাসা-বীহ’’ শীর্ষক গ্রন্থটি বিরল হাদীসসমূহকে অন্তর্ভুক্তধারী হাদীস বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। সংকলক (রহঃ) সানাদসমূহ বিলুপ্ত করার মাধ্যমে হাদীস সংকলনে সংক্ষিপ্ততার পথ অবলম্বন করলে কতিপয় সমালোচক এতে সমালোচনা করেন। যদিও তাঁর মতো একজন নির্ভরশীল (সিক্বাহ্) ব্যক্তির হাদীস বর্ণনা করাই ’সানাদতুল্য’। কিন্তু সানাদবিহীন গ্রন্থ সানাদবিশিষ্ট গ্রন্থের মতো নয়। তাই আল্লাহর নিকট সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রার্থনা করে তিনি (ইমাম বাগাবী) যেগুলো সানাদবিহীন অবস্থায় উল্লেখ করেছেন আমি সে হাদীসগুলোতে সানাদ তথা সাহাবীর নাম সংযুক্ত করেছি, যেমনভাবে(১) আবূ ’আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইসমা’ঈল বুখারী,[1](২) আবুল হাসান মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল কুশায়রী,[2](৩) আবূ ’আবদুল্লাহ মালিক ইবনু আনাস আল আসবাহী,[3](৪) আবূ ’আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইদ্রীস আশ্ শাফি’ঈ,[4](৫) আবূ ’আবদুল্লাহ আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হাম্বাল আশ্ শায়বানী,[5](৬) আবূ ’ঈসা মুহাম্মাদ ইবনু ’ঈসা আত্ তিরমিযী,[6](৭) আবূ দাঊদ সুলায়মান ইবনুল আশ্’আস আস্ সিজিস্তানী,[7](৮) আবূ ’আবদুর রহমান আহমাদ ইবনু শু’আয়ব আন্ নাসায়ী,[8](৯) আবূ ’আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযীদ ইবনু মাজাহ্ আল্ কাযভিত্নী,[9](১০) আবূ মুহাম্মাদ ’আবদুল্লাহ ইবনু ’আবদুর রহমান আদ্ দারিমী,[10](১১) আবুল হাসান ’আলী ইবনু ’উমার আদ্ দারাকুত্বনী,[11](১২) আবূ বকর আহমাদ ইবনুল হুসায়ন আল বায়হাক্বী,[12](১৩) আবুল হাসান রযীন ইবনু মু’আবিয়াহ্ আল্ ’আবদারী (রহিমাহুমুল্লাহ)[13] প্রমুখ ন্যায়, দক্ষ ও বিশ্বস্ত ইমামগণ বর্ণনা করেছেন। সুতরাং আমি কোন হাদীসের শেষে ইমামের নাম উল্লেখ করলে মনে করতে হবে যে, আমি হাদীসের পূর্ণ সানাদ বর্ণনা করছি। কারণ, তাঁরা তাঁদের কিতাবে এ (পূর্ণ সানাদ বর্ণনা করার) কাজ সম্পন্ন করে এর দায়িত্ব থেকে আমাদেরকে অব্যাহতি দিয়েছেন।তিনি (মাসা-বীহ গ্রন্থকার) তাঁর কিতাবকে যেভাবে বিভিন্ন ’বাব’ বা অধ্যায়ে সাজিয়েছেন, আমিও তা-ই করেছি এবং এ ব্যাপারে তারই পথ অনুসরণ করেছি। তবে আমি প্রায় ’বাব’কেই তিনটি ’ফাস্‌ল’ বা অনুচ্ছেদে ভাগ করেছি (অবশ্য তিনি করেছিলেন দু’ ভাগ)।প্রথম ভাগ : যা বুখারী ও মুসলিম (শায়খায়ন) উভয়ে অথবা তাঁদের কোন একজন বর্ণনা করেছেন। তবে, যেহেতু হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে শায়খায়নের মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে, তাই তাঁদের নামের সাথে অন্য নাম উল্লেখের প্রয়োজন হয় না, এজন্য আমি তাঁদের নামের সাথে অন্য কারো নাম উল্লেখ করিনি, যদিও সে সকল হাদীস অন্যরাও বর্ণনা করেছেন।দ্বিতীয় ভাগ : এতে রয়েছে বুখারী, মুসলিম ব্যতীত অন্যান্য ইমামগণের বর্ণিত হাদীস।তৃতীয় ভাগ : (আমার পরিবর্ধিত এ ভাগে) বাবের (অধ্যায়ের) বিষয় সংশ্লিষ্ট কিছু নতুন হাদীস সংগ্রহ করেছি।[14] যার কোন কোনটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী নয়; বরং কোন সাহাবী অথবা তাবি’ঈর বাণী।[15]যদি [ইমাম বাগাবী (রহঃ)-এর সংগৃহীত] কোন হাদীস কোন বাব বা অধ্যায়ে না পাওয়া যায়, তাহলে মনে করতে হবে যে, অন্য কোন অধ্যায়ে এরূপ হাদীস রয়েছে বলেই আমি তাকে বাদ দিয়েছি। এমনিভাবে যদি কোন হাদীসের কোন অংশবিশেষকে বাদ দিয়ে থাকি অথবা কোন অংশ বৃদ্ধি করে থাকি, তাহলে বুঝতে হবে যে, প্রয়োজনবোধেই আমি এরূপ করেছি। এছাড়া ইমাম বাগাবী (রহঃ)-এর সাথে আমার যদি এরূপ কোন মতভেদ দেখা যায় যে, আমি প্রথম ফাসলে শায়খায়ন ব্যতীত অন্য কারো নামের উদ্ধৃতি দিয়েছি অথবা দ্বিতীয় ফাসলে শায়খায়নের মধ্যে কারো নাম উল্লেখ করেছি। তার কারণ এই যে, আমি হুমায়দী’র[16] ’’আল জাম্’উ বায়নাস্ সহীহায়ন’’ (যাতে তিনি শায়খায়নের হাদীস একত্র করেছেন) ও ’’জা-মি’উল উসূল’’[17] গ্রন্থদ্বয় পর্যবেক্ষণের পরই কেবল শায়খায়নের মূল কিতাবের উপরই নির্ভর করেছি।এতদ্ব্যতীত যদি কোন হাদীসের কোন বিষয়ে এরূপ মতভেদ দেখা যায় যে, তিনি (মাসা-বীহ গ্রন্থকার) তাকে এক শব্দে বর্ণনা করেছেন, আর আমি বর্ণনা করেছি ভিন্ন শব্দে, তার কারণ হলো, হাদীসের সানাদ বিভিন্ন। তিনি যে সানাদে বর্ণনা করেছেন সে সানাদ আমার হস্তগত হয়নি; আমি যে সানাদে যে শব্দ পেয়েছি তা-ই বর্ণনা করেছি। এরূপ স্থান খুব কমই দেখা যাবে যে, যেখানে আমি বলেছিঃ ’এটা হাদীসের কোন প্রসিদ্ধ কিতাবে পাওয়া যায়নি অথবা আমি এর বিপরীত পেয়েছি।’ যদি কোথাও এরূপ দেখা যায় তাহলে মনে করবেন, এটা আমার অনুসন্ধানেরই ত্রুটি; ইমাম বাগাবী (রহঃ)-এর নয়। আল্লাহ সে বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করুন যে এরূপ সানাদ অবগত হয়ে আমাকে তা’ অবহিত করবে। অবশ্য আমিও আমার সাধ্যানুযায়ী অনুসন্ধানে চেষ্টার ত্রুটি করিনি। তিনি যেখানে (কোন হাদীস বা শব্দ সম্পর্কে) বর্ণনার বিভিন্নতা দেখিয়েছেন, আমিও সেখানে তা-ই করেছি।এছাড়া তিনি যে সকল হাদীসকে ’গরীব’ বা ’য’ঈফ’ বলে অভিহিত করেছেন, অধিকাংশ স্থলে আমি তার কারণ ও ব্যাখ্যা দিয়েছি। আর যেখানে কোন হাদীসকে কোন প্রসিদ্ধ ইমাম গরীব বা ’য’ঈফ’ প্রভৃতি বলা সত্ত্বেও তিনি তার প্রতি ইঙ্গিত করেননি, আমিও সেখানে সেরূপই রেখে দিয়েছি। অবশ্য কোন কোন জায়গায় আবশ্যকবোধে এর ব্যতিক্রমও করেছি। কোন কোন জায়গায় এরূপও পাওয়া যাবে যে, সেখানে আমি কারো উদ্বৃতি দেইনি; বরং হাদীসের শেষে স্থান শূন্য রেখে দিয়েছি। তার কারণ এই যে, আমি তার সন্ধান কোথাও পাইনি। যদি কেউ কোথাও তার সন্ধান পান, তাহলে দয়া করে উদ্ধৃতি দিয়ে দিবেন [অবশ্য পরবর্তী মুহাদ্দিসগণ উদ্ধৃতি দিয়ে এ সকল শূন্যতা পূর্ণ করে দিয়েছেন]। আল্লাহ আপনাদেরকে এর জাযা (প্রতিদান) দিবেন। অবশেষে আমি এ কিতাবের নামকরণ করলাম ’মিশকা-তুল মাসা-বীহ’। আমরা আল্লাহর নিকট তাওফীক্ব, সাহায্য, হিদায়াত, নিরাপত্তা ও আমাদের উদ্দেশ্যের সহজতা প্রার্থনা করছি, তিনি যেন এর দ্বারা আমার এবং সমস্ত মুসলিম নর-নারীর ইহ ও পরজগতে উপকার সাধন করেন। আমীন!আল্লাহর সাহায্যই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম অভিভাবক। তিনি ছাড়া কারো কোন শক্তি বা সামর্থ্য নেই, তিনি সুউচ্চ ও সুমহান।[1] হাফিয (রহঃ) ‘‘আত্ তাক্বরীব’’ গ্রন্থে বলেন, ‘‘ইমাম বুখারী হলেন মুখস্থ বিদ্যার পাহাড়, দুনিয়ায় ইমাম এবং হাদীসশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব।’’ তিনিই হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সহীহ হাদীসগুলোকে আলাদাভাবে সংকলন করেছেন ঐ সমস্ত হাদীস থেকে পৃথক করে যেগুলো সহীহ’র স্তরে পৌঁছেনি। তিনি ১৯৪ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং দশ বৎসর বয়সেই হাদীস মুখস্থ করা আরম্ভ করেন। তিনি বিস্ময়কর স্মরণশক্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁর নিকট লোকজন ‘ইলম শিক্ষা করতেন অথচ তখনো তিনি আঠারো বৎসর বয়সে উপনীত হননি। হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহের উদ্দেশে ইমাম বুখারী (রহঃ) বহু দেশ ও শহর পরিভ্রমণ করেন এবং প্রায় এক হাজার উস্তাযের কাছ থেকে হাদীস শ্রবণ করেন।তিনি ফিক্বহ শাস্ত্রের মুজতাহিদ ইমামগণের অন্যতম একজন। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বহু ফিক্বহী অভিমত রয়েছে এবং রয়েছে অমূল্য রচনাবলী। যার মধ্যকার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘জামি‘উস্ সহীহ আল বুখারী’ গ্রন্থ সংকলন। যে গ্রন্থটি সাধারণভাবে সমগ্র হাদীস গ্রন্থাবলীর চেয়ে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য বলে পরিগণিত হয়। তিনি ২৫৬ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করে।[2] তিনি একজন নির্ভরযোগ্য হাফিয, ইমাম, গ্রন্থ প্রণেতা এবং ফিক্বহের বিজ্ঞ ‘আলিম। তিনি ইমাম বুখারীর ছাত্র। তিনি ২০৪ হিজরী সনে খুরাসান অন্তঃপাতী নীসাপূরে জন্মগ্রহণ করেন। হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহের উদ্দেশে তিনি মুসলিম জাহানের সব কয়টি কেন্দ্রেই গমন করেন। তাঁর মহামূল্যবান বহু গ্রন্থ রয়েছে। তন্মধ্যে তাঁর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে ‘‘আল্ জামি‘উস সহীহ মুসলিম’’। মর্যাদা ও নির্ভরযোগ্যতার দিক দিয়ে গ্রন্থটির অবস্থান সহীহুল বুখারীর পরে। কিন্তু সহীহুল বুখারীর তুলনায় গ্রন্থটির ব্যতিক্রম বৈশিষ্ট্য এই যে, এতে ধারাবাহিকভাবে সজ্জায়ন সৌন্দর্য অত্যন্ত চমৎকার এবং হাদীসসমূহের পুনরাবৃত্তিও কম। ইমাম মুসলিম ২৬১ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন।[3] তিনি একজন সম্মানিত ইমাম, ফাক্বীহ ও মুজতাহিদ। মদীনার ‘আলিম ও মুহাদ্দিস। সুপরিচিত ফাক্বীহ মাযহাবের কর্ণধার। আনদালুস শহরে বিচারকার্য ও ফাতাওয়াতে তাঁর মাযহাব প্রাধান্য লাভ করে। আজও তাঁর মাযহাব পশ্চিমা দেশে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।ইমাম মালিক (রহঃ) ৯৩ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খুবই দীনদার ও পরহেযগার ছিলেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। খলীফাহ্ মানসূর লোকেদেরকে ‘ইলম শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশে ইমাম মালিককে একটি কিতাব উপস্থাপনের আবেদন জানালে তিনি স্বীয় ‘‘মুয়াত্ত্বা’’ গ্রন্থটি পেশ করেন। তিনি ১৭৯ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন।[4] মুহাম্মাদ ইবনু ইদ্রীস শাফি‘ঈ আল্ কুরাশী আল্ হাশিমী (রহঃ) দু’শ হিজরী শতকের একজন বড় ইমাম ফাক্বীহ, মুজতাহিদ, মুহাদ্দিস ও দীনের মুজাদ্দিদ ছিলেন। তিনি ১৫০ হিজরী সনে (ফিলিস্তীন) গাজাহ্ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। দু’বৎসর বয়সে তাঁকে সেখান থেকে মক্কায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি দু’বার বাগদাদ সফর করেন এবং ১৯৯ হিজরী সনে মিসরে যান। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি ছিলেন উঁচুমানের কবি, বিশুদ্ধভাষী, অলংকারশাস্ত্রবিদ, ভাষা, ফিক্বহ ও হাদীসের ইমাম, এমন দক্ষ তীরন্দাজ যার তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হত না, অত্যধিক সততাপরায়ণ এবং আশ্চর্যকর স্মৃতিশক্তির অধিকারী। তিনিই সর্বপ্রথম ‘ইলমু উসূলিল ফিক্বহ’ সম্পর্কে পুস্তিকা রচনা করেন। তাঁর রচিত বহু গ্রন্থ রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে ‘‘আল্ উম্ম’’, যা সাত খণ্ডে সম্পন্ন। তিনি ২০৪ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন।[5] তিনি একজন সম্মানিত ইমাম, মুহাদ্দিস, হাফিয, ফাক্বীহ ও হুজ্জাত। জন্ম ১৬৪ হিজরী সনে বাগদাদ নগরীতে। তিনি ‘ইলম অর্জনে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে গড়ে উঠেন। তিনি ইমাম শাফি‘ঈ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করেন। এটা তাঁর বিবিধ বৈশিষ্ট্যের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য। হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহের উদ্দেশে তিনি অসংখ্যবার সফর করেছেন। তিনি ইমাম বুখারী ও মুসলিমের অন্যতম উস্তায। ‘আব্বাসী খলীফাহ্ মু‘তাসিমের শাসনামলে ‘খলক্বে কুরআন’ মতবাদের ফিতনাকালে তিনি ২৮ মাস কারাবরণ করেন। অতঃপর খলীফাহ্ মুতাওয়াক্কিল তাঁর মর্যাদা উপলব্ধি করে তাঁকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে কারামুক্ত করেন। তাঁর রচিত অনেক কিতাব রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হচ্ছে ‘আল্ মুসনাদ’ গ্রন্থটি। তিনি ২৪১ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন।[6] জন্ম ২০০ হিজরী সনে। তিনি ইমাম বুখারী ও অন্যান্যদের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য ইমাম, হাফিয, হুজ্জাত, গভীর জ্ঞানের অধিকারী, অত্যন্ত আল্লাহভীরু ও পার্থিব ভোগ বিলাসের প্রতি অনাসক্ত। তাঁকে স্মৃতিশক্তির উপমা হিসেবে পেশ করা হত। তাঁর বহু গ্রন্থ রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে তাঁর ‘সুনান’, যা ‘‘আল্ জা-মি‘উত্ তিরমিযী’’ হিসেবে পরিচিত। তিনি ২৭৯ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন।[7] তিনি একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব, হাফিয ও সংকলক। তিনি তাঁর যুগের হাদীস বিশারদদের ইমাম ছিলেন। তাঁর জন্ম ২০২ হিজরী সনে। হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহের উদ্দেশে তিনি বহু দেশ ও শহর ভ্রমণ করেন। তিনি ইমাম আহমাদের ছাত্রদের অন্যতম এবং ইমাম নাসায়ী ও আত্ তিরমিযীর উস্তায। তাঁর অতি প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ হচ্ছে ‘‘আস্ সুনান আবূ দাঊদ’’। যাতে তিনি প্রায় পাঁচ হাজার হাদীস সন্নিবেশিত করেন। এ গ্রন্থটি তিনি ইমাম আহমাদের নিকট পেশ করলে তিনি একে স্বীকৃতি দেন ও উত্তম প্রশংসা করেন। ইমাম আবূ দাঊদ ২৭৫ হিজরী সনে বাসরাতে মৃত্যুবরণ করেন।[8] খুরাসান অন্তঃপাতী নাসা নামক শহরের সঙ্গে সম্পর্কিত করে তাঁকে নাসায়ী বলা হয়। জন্ম ২১৫ হিজরী সনে। তিনি তাঁর যুগের খুরাসান (বর্তমানে ইরান, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কিস্তান এবং উযবেকিস্তান), হিজায (সউদী ‘আরব), ‘ইরাক্ব, মিসর ও শাম (সিরিয়া) দেশের হাদীসের ইমামগণ থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। তিনি ছিলেন হাদীসের শিক্ষা ও উচ্চ সানাদ বিষয়ক জ্ঞানে তাঁর যুগের সেরা ও একক ব্যক্তিত্ব।ইমাম নাসায়ী রচিত বহু গ্রন্থ রয়েছে। তন্মধ্যে অতি প্রসিদ্ধ হচ্ছে ‘‘আস্ সুনান আন্ নাসায়ী’’ গ্রন্থ। গ্রন্থটি বৃহৎ। পরবর্তীতে একে সংক্ষিপ্ত করে ‘‘আর্ মুজতাবা মিনাস্ সুনান’’ নামকরণ করা হয়। ইমাম নাসায়ীর ‘সুনান’ গ্রন্থটি ছয়টি প্রসিদ্ধ গ্রন্থের একটি গণ্য করা হয়। তিনি ৩০৩ হিজরী সনে মক্কাতে মৃত্যুবরণ করেন।[9] তিনি ‘ইলমে হাদীসের অন্যতম ইমাম। কাযভীন শহরের অধিবাসী। জন্ম ২০৯ হিজরী সনে। হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহের উদ্দেশে তিনি বাসরাহ্, বাগদাদ, সিরিয়া, মিসর, হিজায, রায় (ইরান) প্রভৃতি দেশ ও শহরে ভ্রমণ করেন। তাঁর সংকলিত কিতাবাদি হলো ‘‘আস্ সুনান ইবনু মাজাহ্’’, ‘‘আত্ তাফসীর’’ ও ‘‘আত্ তারীখ’’। ইমাম ইবনু মাজাহ্ ২৭৩ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন।[10] তিনি একজন নির্ভরযোগ্য হাফিয, সম্মানিত ব্যক্তি ও সমালোচক। জন্ম ১৮১ হিজরী সনে। তিনি হিজায, সিরিয়া, মিসর, ইরাক্ব, খুরাসানসহ বহু দেশের লোকজন থেকে হাদীস শ্রবণ করেন। তিনি ইমাম মুসলিমের অন্যতম উস্তায।তিনি ছিলেন জ্ঞানী, সেরা ব্যক্তিত্ব, মুফাসসির ও ফাক্বীহ। তিনি সামারকান্দে ‘ইলমে হাদীস প্রচার করেন। তাঁর অনেকগুলো মূল্যবান কিতাব রয়েছে। তন্মধ্যে অতি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে ‘‘আল্ জা-মি‘উস্ সহীহ’’ ও ‘‘আস্ সুনান’’ যা ‘মুসনাদ’ নামে পরিচিত। এ গ্রন্থটি মুহাক্কিকগণের নিকট সুনান ইবনু মাজাহ্’র উপর অগ্রাধিকারযোগ্য। ইমাম দারিমী ২৫৫ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন।[11] তিনি হলেন ‘আলী ইবনু ‘উমার আদ্ দারাকুত্বনী আশ্ শাফি‘ঈ। তিনি তৎকালীন যুগে হাদীসের ইমাম ছিলেন। তিনি বাগদাদের ‘দারুল কুত্বন’ নামক বড় একটি এলাকায় ৩০৬ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মিসরে সফর করেন এবং সেখান থেকে বাগদাদে ফিরে আসেন। অতঃপর সেখানেই ৩৮৫ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে ‘আস্ সুনান’ গ্রন্থটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।[12] আহমাদ ইবনুল হুসায়ন বায়হাক্বী হাদীস বিশারদ ইমামগণের অন্যতম একজন। তিনি ৩৮৪ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেন। হাদীস শিক্ষা ও সংগ্রহের উদ্দেশে তিনি প্রথমে বাগদাদ, অতঃপর কূফা, মক্কা, নীসাপূরসহ বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। তাঁর মৃত্যু হয় ৪৫৮ হিজরী সনে। তাঁর অনেকগুলো মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে। তন্মধ্যে ‘‘সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী’’ অতি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। গ্রন্থটি দশ খণ্ডে সম্পন্ন।[13] তিনি হলেন রযীন ইবনু মু‘আবিয়াহ্ ইবনু ‘আম্মার ‘আবদারী আল্ আন্দালূসী। হারামায়নের ইমাম। তিনি মক্কাতে দীর্ঘদিন বসবাস করেন এবং ৫৩৫ হিজরী সনে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সংকলিত গ্রন্থ অনেক। তন্মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ‘‘আত্ তাজরীদু লিস্ সিহাহ আস্ সিত্তাহ্’’। গ্রন্থটিতে এমন কতগুলো হাদীস রয়েছে যা ছয়টি গ্রন্থে নেই। তন্মধ্যকার কয়েকটির ব্যাপারে শীঘ্রই সতর্ক করা হবে। তাতে বানোয়াট হাদীসও রয়েছে। যেমন- সালাতুর্ রাগায়িব সম্পর্কিত হাদীস।[14] অর্থাৎ- বর্ণিত হাদীসকে হাদীসের বর্ণনাকারী সহাবা (সাহাবা) ও তাবি‘ঈগণের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন এবং উপরোল্লিখিত যে সমস্ত ইমাম হাদীসটি তাঁদের গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন তাঁদের নাম তুলে ধরেছেন।[15] এর উদ্দেশ্য হলো, তিনি এ অধ্যায়ে কেবল মারফূ‘ হাদীস বর্ণনা করাই জরুরী মনে করেননি। বরং বাবের সঙ্গে সংশিস্নষ্ট সহাবা (সাহাবা) অথবা তাবি‘ঈগণের মাওকূফ বর্ণনাগুলোও তুলে ধরেছেন।[16] তিনি হলেন ইমাম ‘আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু আবী নাসর আল্ আন্দালূসী আল্ কুরতুবী। মৃত্যু ৪৮০ হিজরী সনে।[17] অর্থাৎ- উসূলুস সিত্তাহ্ (যেখানে ছয় গ্রন্থের হাদীস একত্র করা হয়েছে)। গ্রন্থটির রচয়িতা হলেন ইমাম আবূ সা‘দাত মুবারক ইবনু মুহাম্মাদ আল্ জাযিরী। তিনি ‘‘আন্ নিহায়া ফী গরীবিল হাদীস ওয়াল আসার’’ গ্রন্থকার ইবনুল আসীর নামে প্রসিদ্ধ। মৃত্যু ৬০৬ হিজরী সনে।

মিশকাতুল মাসাবিহহাদিস নম্বর

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَابِ رَمَرَ فَهُنَهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ مَا إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِامْرِي مَا نَوَى فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُوْلِهِ فَهِجْرَتُهُ إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوِ امْرَأَةٍ يَتَزَوْجُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ ، مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ

‘উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ নিয়্যাতের উপরই কাজের ফলাফল নির্ভরশীল। মানুষ তাঁর নিয়্যাত অনুযায়ী ফল পাবে। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সস্তুষ্টির জন্য হিজরত করবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সস্তুষ্টির জন্যই গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার স্বার্থ প্রাপ্তির জন্য অথবা কোন মহিলাকে বিবাহের জন্য হিজরত করবে সে হিজরত তার নিয়্যাত অনুসারেই হবে যে নিয়্যাতে সে হিজরত করেছে। [১]

[১] সহীহঃ বুখারী ১, মুসলিম ১৯০৭, তিরমিযী ১৬৩৭, নাসায়ী ৭৫, আবূ দাঊদ ২২০১, ইবনু মাজাহ ৪২২৭, আহমাদ ১৬৯, ৩০২।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন