২৫/২০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫১০৫-[২] - রাগ নিয়ন্ত্রণই আসল শক্তি
রাগ ও অহংকার - প্রথম অনুচ্ছেদ
(আরবি) শব্দটি বাবে (আরবি) এর মাসদার। মূল অক্ষর (আরবি) অর্থ গর্ব করা, গৌরব করা। এটা দু’ প্রকার: ১. নিন্দনীয়। যেমন- প্রতারণার উদ্দেশে বা পার্থিব কোন ব্যক্তির স্বার্থ চরিতার্থের জন্য মিথ্যা বংশ গৌরব করা। এটা অবৈধ।২. প্রশংসনীয়। যেমন, কাফির মুশরিকদের সাথে যুদ্ধের সময় বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশে গৌরবের কথা প্রকাশ করা। এটা জায়িয। মহান আল্লাহ বলেন, (আরবি) “তুমি তোমার রবের নি‘আমাতের কথা বর্ণনা কর।” (সূরাহ্ আয্ যুহা- ৯৩ : ১১) নিন্দনীয় গর্ব করা থেকে সাবধান করতে নাবী (ﷺ) বলেন, (আরবি) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : মহান আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার ও পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করার প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন।মু‘মিন হলো আল্লাহভীরু আর পাপী হলো দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদাম সন্তান আর আদাম (আরবি) মাটির তৈরি। লোকেদের উচিত বিশেষ গোত্রেরভুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে অহংকার না করা। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। অন্যথায় তোমরা মহান আল্লাহর নিকট ময়লার সেই কীটের চেয়ে জঘন্য হবে যে তার নাক দিয়ে ময়লা ঠেলে নিয়ে যায়। (আবূ দাউদ ৫১১৬, তিরমিযী ৪২৩৩ : হাসান)মির্‘আতুল মাফাতীহ-এর মধ্যে আল্লামাহ মুবারকপূরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: বংশীয় বা গোত্রীয় অহংকার বলা হয়, বাপ দাদার অথবা বংশের নাম উল্লেখ করে গর্ব করাকে। এ কাজ অন্যকে ছোট করে নিজের মর্তবাকে উঁচু করে তোলার জন্য করা হয়। সেজন্য এ কাজ জায়িয নেই। অন্যের গোত্রকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এ কাজে অন্যকে ছোট করা হয় বা লজ্জায় ফেলা হয়।আর (আরবি) শব্দের অর্থ হলো-স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব করা। পরিভাষায় রক্তের বন্ধনে আবদ্ধতার অনুভূতি এবং সেই অনুভূতির কারণে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করাকে (আরবি) বলা হয়। আধুনিক পরিভাষায় একে গোত্রবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাও বলা যেতে পারে। এটি একটি জাহিলী প্রথা। এ ব্যাপারে হাদীসে রয়েছে, আল হাবিস আল আশ্‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী (ﷺ) বলেছেন : (আরবি) আর যে লোক জাহিলিয়্যাতের ‘আমালের রীতি-নীতির দিকে আহ্বান করে সে জাহান্নামীদের দলভুক্ত।জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে সলাত আদায করলেও, সিয়াম পালন করলেও? তিনি (ﷺ) বললেন: হ্যাঁ। সে সলাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও। সুতরাং তোমরা সেই আল্লাহ তা‘আলার ডাকেই নিজেদেরকে ডাকবে যিনি তোমাদেরকে মুসলিম, মু‘মিন ও আল্লাহ তা‘আলার বান্দা নাম রেখেছেন। (তিরমিযী ২৮৬৩, মিশকাত ৩৬৯৪)
রাগের সময় নিজেকে সামলানোই প্রকৃত শক্তি
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৫১০৫-[২]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৫১০৫-[২]
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ». مُتَّفق عَلَيْهِ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : সে ব্যক্তি শক্তিশালী বীর নয়, যে মানুষকে আছাড় দেয় (পরাস্ত করে); বরং সে ব্যক্তিই প্রকৃত শক্তিশালী বীর, যে রাগের সময় নিজেকে সংবরণ করতে সক্ষম।
[১] সহীহ : বুখারী ৬১১৪, মুসলিম ১০৭-(২৬০৯), আহমাদ ৭২১৯, সহীহুল জামি‘ ৫৩৭৫, সহীহ আত্ তারগীব ২৬৮১, সহীহ আল আদাবুল মুফরাদ ৯৯৪, মুওয়াত্ত্বা মালিক ৩৩৬৩, মুসান্নাফ ‘আবদুর রাযযাক ২০২৮৭, মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ্ ২৫৩৮৫, সুনানুন্ নাসায়ী আল কুবরা ১০২২৬, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১৬৫৬।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫১০৫-[২]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) শক্তির অর্থ নতুনভাবে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শক্তিশালী বীর সে নয়, যে মানুষকে আছাড় দেয় বা পরাস্ত করে। বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সাধারণভাবে মানুষ শক্তি বলতে শরীরের জোর বা কাউকে হারানোর ক্ষমতা বোঝে। কিন্তু এই হাদিসে আত্মসংযমকে আসল শক্তি বলা হয়েছে। কারণ রাগের সময় নিজের জিহ্বা, হাত ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। রাগ নিয়ন্ত্রণ হাদিস হিসেবে এটি খুব পরিচিত এবং জীবনঘনিষ্ঠ। ঝগড়া, পরিবার, বন্ধুত্ব বা কাজের জায়গায় রাগ উঠতে পারে। তখন অন্যকে হারানোর চেয়ে নিজের ভেতরের উত্তেজনাকে থামানো বেশি মূল্যবান কাজ।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- শরীরের জোর নয়, আত্মসংযমই আসল শক্তির পরিচয়।
- রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রশংসনীয় কাজ।
- অন্যকে পরাস্ত করার চেয়ে নিজেকে সামলানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
- রাগের সময় কথা ও আচরণে সতর্ক থাকা দরকার।
