২৫/২০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫১০৬-[৩] - জান্নাতবাসী ও অহংকারীর পরিচয়
রাগ ও অহংকার - প্রথম অনুচ্ছেদ
(আরবি) শব্দটি বাবে (আরবি) এর মাসদার। মূল অক্ষর (আরবি) অর্থ গর্ব করা, গৌরব করা। এটা দু’ প্রকার: ১. নিন্দনীয়। যেমন- প্রতারণার উদ্দেশে বা পার্থিব কোন ব্যক্তির স্বার্থ চরিতার্থের জন্য মিথ্যা বংশ গৌরব করা। এটা অবৈধ।২. প্রশংসনীয়। যেমন, কাফির মুশরিকদের সাথে যুদ্ধের সময় বীরত্ব প্রকাশের উদ্দেশে গৌরবের কথা প্রকাশ করা। এটা জায়িয। মহান আল্লাহ বলেন, (আরবি) “তুমি তোমার রবের নি‘আমাতের কথা বর্ণনা কর।” (সূরাহ্ আয্ যুহা- ৯৩ : ১১) নিন্দনীয় গর্ব করা থেকে সাবধান করতে নাবী (ﷺ) বলেন, (আরবি) আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : মহান আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার ও পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করার প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন।মু‘মিন হলো আল্লাহভীরু আর পাপী হলো দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদাম সন্তান আর আদাম (আরবি) মাটির তৈরি। লোকেদের উচিত বিশেষ গোত্রেরভুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে অহংকার না করা। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। অন্যথায় তোমরা মহান আল্লাহর নিকট ময়লার সেই কীটের চেয়ে জঘন্য হবে যে তার নাক দিয়ে ময়লা ঠেলে নিয়ে যায়। (আবূ দাউদ ৫১১৬, তিরমিযী ৪২৩৩ : হাসান)মির্‘আতুল মাফাতীহ-এর মধ্যে আল্লামাহ মুবারকপূরী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: বংশীয় বা গোত্রীয় অহংকার বলা হয়, বাপ দাদার অথবা বংশের নাম উল্লেখ করে গর্ব করাকে। এ কাজ অন্যকে ছোট করে নিজের মর্তবাকে উঁচু করে তোলার জন্য করা হয়। সেজন্য এ কাজ জায়িয নেই। অন্যের গোত্রকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এ কাজে অন্যকে ছোট করা হয় বা লজ্জায় ফেলা হয়।আর (আরবি) শব্দের অর্থ হলো-স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্ব করা। পরিভাষায় রক্তের বন্ধনে আবদ্ধতার অনুভূতি এবং সেই অনুভূতির কারণে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করাকে (আরবি) বলা হয়। আধুনিক পরিভাষায় একে গোত্রবাদ বা সাম্প্রদায়িকতাও বলা যেতে পারে। এটি একটি জাহিলী প্রথা। এ ব্যাপারে হাদীসে রয়েছে, আল হাবিস আল আশ্‘আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, নাবী (ﷺ) বলেছেন : (আরবি) আর যে লোক জাহিলিয়্যাতের ‘আমালের রীতি-নীতির দিকে আহ্বান করে সে জাহান্নামীদের দলভুক্ত।জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে সলাত আদায করলেও, সিয়াম পালন করলেও? তিনি (ﷺ) বললেন: হ্যাঁ। সে সলাত আদায় করলেও, সিয়াম পালন করলেও। সুতরাং তোমরা সেই আল্লাহ তা‘আলার ডাকেই নিজেদেরকে ডাকবে যিনি তোমাদেরকে মুসলিম, মু‘মিন ও আল্লাহ তা‘আলার বান্দা নাম রেখেছেন। (তিরমিযী ২৮৬৩, মিশকাত ৩৬৯৪)
জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীর কিছু লক্ষণ
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৫১০৬-[৩]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৫১০৬-[৩]
وَعَنْ حَارِثَةَ بْنِ وَهْبٌ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ؟ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعِّفٍ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ. أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ؟ كُلُّ عُتُلٍّ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ». مُتَّفق عَلَيْهِ. وَفِي رِوَايَة مُسلم: «كل جواظ زنيم متكبر»
হারিসাহ্ ইবনু ওয়াহব (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : আমি তোমাদেরকে জান্নাতবাসী লোকেদের কথা বলে দেব কি? তারা হলেন বৃদ্ধ ও দুর্বল লোক। তারা যদি আল্লাহর দরবারে কসম করে, তখন আল্লাহ তাদের সে শপথকে সত্যে পরিণত করে দেন। তিনি (ﷺ) আরো বলেছেন : আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসী লোকেদের কথা বলে দেব? তারা হলো, মিথ্যা ও তুচ্ছ বস্তু নিয়ে খুব বিবাদকারী, শান্ত মস্তিষ্কে ধন-সম্পদ সঞ্চয়কারী ও অহংকারী। মুসলিম-এর এক বর্ণনায় রয়েছে, প্রত্যেক সম্পদ সঞ্চয়কারী কৃপণ, জারজ ও অহংকারী।
[১] সহীহ : বুখারী ৪৯১৮, ৬৬৫৭; মুসলিম ৪৬-(২৮৫৩), তিরমিযী ২৬০৫, ইবনু মাজাহ ৪১১৬, সহীহুল জামি‘ ২৫৯৮, আহমাদ ১৮৭২৮, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা ৬১২৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৬৭৯, শু‘আবুল ঈমান ৮১৭৪, আল মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৩১৭৯, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ২১৩২৬।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫১০৬-[৩]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসী লোকদের কিছু লক্ষণ বলেছেন। তিনি জানান, জান্নাতবাসীদের মধ্যে এমন বৃদ্ধ ও দুর্বল মানুষ থাকে, যারা বাহ্যিকভাবে বড় শক্তিশালী নয়; কিন্তু আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা আছে। তারা আল্লাহর দরবারে কসম করলে আল্লাহ তাদের শপথ সত্য করে দেন। এরপর তিনি জাহান্নামবাসীদের লক্ষণ হিসেবে বলেছেন: মিথ্যা ও তুচ্ছ বিষয়ে বেশি বিবাদকারী, সম্পদ জমাতে ব্যস্ত এবং অহংকারী। মুসলিমের এক বর্ণনায় সম্পদ সঞ্চয়কারী কৃপণ ও অহংকারীর কথা এসেছে। এখানে অহংকারের পরিণতি এবং বিনয়ী দুর্বল মানুষের মর্যাদা স্পষ্ট। এই হাদিস আমাদের চোখে বড় হওয়া নয়, আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য গুণ অর্জনের শিক্ষা দেয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- বাহ্যিক দুর্বলতা মানুষের আল্লাহর কাছে মর্যাদা কমায় না।
- অহংকার ও তুচ্ছ বিষয়ে বিবাদ করা ভয়ংকর অভ্যাস।
- সম্পদ জমিয়ে কৃপণতা করা নিন্দনীয় গুণ।
- আল্লাহর কাছে মর্যাদা পেতে বিনয়ী চরিত্র দরকার।
