২/৯৫. অধ্যায়ঃ
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৩/৭১৫ - কালিমার দৃঢ় বিশ্বাস ও সুসংবাদ
কোন ভাল জিনিসের সুসংবাদ ও তার জন্য মুবারকবাদ জানানো মুস্তাহাব
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴾ فَبَشِّرۡ عِبَادِ ١٧ ٱلَّذِينَ يَسۡتَمِعُونَ ٱلۡقَوۡلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحۡسَنَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ هَدَىٰهُمُ ٱللَّهُۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمۡ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ١٨ ﴿ [الزمر: ١٧، ١٨]অর্থাৎ “তাদের জন্য আছে সুসংবাদ। অতএব সুসংবাদ দাও আমার দাসদেরকে; যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং যা উত্তম তার অনুসরণ করে। ওদেরকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং ওরাই বুদ্ধিমান।” (সূরা যুমার ১৭-১৮ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ يُبَشِّرُهُمۡ رَبُّهُم بِرَحۡمَةٖ مِّنۡهُ وَرِضۡوَٰنٖ وَجَنَّٰتٖ لَّهُمۡ فِيهَا نَعِيمٞ مُّقِيمٌ ٢١ ﴿ [التوبة: ٢١]অর্থাৎ “তাদের প্রতিপালক তাদেরকে নিজ দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন; যেখানে তাদের জন্য স্থায়ী সুখ-সমৃদ্ধি রয়েছে।” (সূরা তওবা ২১ আয়াত)তিনি অন্যত্র বলেছেন,﴾ وَأَبۡشِرُواْ بِٱلۡجَنَّةِ ٱلَّتِي كُنتُمۡ تُوعَدُونَ ﴿ [فصلت: ٣٠]অর্থাৎ তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার সুসংবাদ নাও। (হা-মীম সিজদা ৩০ আয়াত)তিনি অন্য জায়গায় বলেন,﴾ فَبَشَّرۡنَٰهُ بِغُلَٰمٍ حَلِيمٖ ١٠١ ﴿ [الصافات: ١٠١]অর্থাৎ “অতঃপর আমি তাকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।” সূরা স্বা-ফফাত ১০১ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ وَلَقَدۡ جَآءَتۡ رُسُلُنَآ إِبۡرَٰهِيمَ بِٱلۡبُشۡرَىٰ ﴿ [هود: ٦٩]অর্থাৎ “আর আমার প্রেরিত ফিরিশতারা ইব্রাহীমের নিকট সুসংবাদ নিয়ে আগমন করল।” (সূরা হূদ ৬৯ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ وَٱمۡرَأَتُهُۥ قَآئِمَةٞ فَضَحِكَتۡ فَبَشَّرۡنَٰهَا بِإِسۡحَٰقَ وَمِن وَرَآءِ إِسۡحَٰقَ يَعۡقُوبَ ٧١ ﴿ [هود: ٧١]অর্থাৎ “সে সময় তার স্ত্রী দণ্ডায়মান ছিল, সে হেসে উঠল তখন আমি তাকে (ইব্রাহীমের স্ত্রীকে) সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের এবং ইসহাকের পর ইয়াকূবের।” (সূরা হূদ ৭১ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ فَنَادَتۡهُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَهُوَ قَآئِمٞ يُصَلِّي فِي ٱلۡمِحۡرَابِ أَنَّ ٱللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحۡيَىٰ﴿ [ال عمران: ٣٩]অর্থাৎ “যখন (যাকারিয়া) মিহরাবে নামাযে রত ছিলেন তখন ফেরেশ্তাগণ তাকে সম্বোধন করে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহয়্যার সুসংবাদ দিচ্ছেন।” (আলে ইমরান ৩৯ আয়াত)তিনি আরো বলেছেন,﴾ إِذۡ قَالَتِ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ يَٰمَرۡيَمُ إِنَّ ٱللَّهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٖ مِّنۡهُ ٱسۡمُهُ ٱلۡمَسِيحُ ﴿ [ال عمران: ٤٥]অর্থাৎ “(স্মরণ কর) যখন ফেরেশতাগণ বললেন, হে মারয়্যাম! নিশ্চয় আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তোমাকে একটি কালেমা (দ্বারা সৃষ্টসন্তানে)র সুসংবাদ দিচ্ছেন; যার নাম হবে মসীহ।” (আলে ইমরান ৪৫ আয়াত)এ ছাড়া এ মর্মে অনেক আয়াত রয়েছে, যা অনেকের জানা আছে। আর উক্ত বিষয়ে হাদীসও অনেক বেশী বিদ্যমান, যা বিশুদ্ধ গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে বলে সুপ্রসিদ্ধ। তার মধ্যে কতিপয় নিম্নরূপঃ-
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ: দৃঢ় বিশ্বাসসহ কালিমার সুসংবাদ
রিয়াদুস সালেহীন : ৩/৭১৫
রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ৩/৭১৫
وَعَن أَبي هُرَيرَةَ رضي الله عنه، قَالَ: كُنَّا قُعُوداً حَوْلَ رَسُولِ اللهِ ﷺ، وَمَعَنَا أَبُو بَكرٍ وَعُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنهُمَا في نَفَرٍ، فَقَامَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ مِنْ بَيْنِ أظْهُرِنَا فَأبْطَأَ عَلَيْنَا، وَخَشِينَا أنْ يُقْتَطَعَ دُونَنَا وَفَزِعْنَا فَقُمْنَا، فَكُنْتُ أَوَّلَ مَنْ فَزِعَ، فَخَرَجْتُ أبْتَغِي رَسُولَ اللهِ ﷺ ﷺ، حَتَّى أتَيْتُ حَائِطاً لِلأَنصَارِ لِبَني النَّجَارِ، فَدُرْتُ بِهِ هَلْ أجِدُ لَهُ بَاباً؟ فَلَمْ أجِدْ!فَإذَا رَبِيعٌ يَدْخُلُ في جَوْفِ حَائِطٍ مِنْ بِئْرٍ خَارِجَهُ ـ وَالرَّبِيعُ: الجَدْوَلُ الصَّغِيرُ ـ فَاحْتَفَرْتُ، فَدَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ، فَقَالَ: «أَبُو هُرَيْرَةَ؟» فَقُلتُ: نَعَمْ، يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ، قَالَ: «مَا شأنُكَ؟» قُلْتُ: كُنْتَ بَيْنَ أظْهُرِنَا فَقُمْتَ فَأبْطَأتَ عَلَيْنَا، فَخَشِينَا أنْ تُقْتَطَعَ دُونَنَا، فَفَزِعْنَا، فَكُنْتُ أوّلَ مَنْ فَزِعَ، فَأتَيْتُ هٰذَا الحَائِطَ، فَاحْتَفَرْتُ كَمَا يَحْتَفِرُ الثَّعْلَبُ، وَهَؤُلاَءِ النَّاسُ وَرَائِي.فَقَالَ: يَا أَبَا هُرَيرَةَ وَأعْطَانِي نَعْلَيْهِ، فَقَالَ: «اذْهَبْ بِنَعْلَيَّ هَاتَيْنِ، فَمَنْ لَقِيتَ مِنْ وَرَاءِ هَذَا الحَائِطِ يَشْهَدُ أنْ لاَ إلٰهَ إِلاَّ اللهُ مُسْتَيْقِنَاً بِهَا قَلْبُهُ، فَبَشِّرْهُ بِالجَنَّةِ ...» وَذَكَرَ الحديثَ بِطُوْلِهِ، رواه مسلم.
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর চারিপাশে বসেছিলাম। আমাদের সাথে আবূ বকর ও উমর (রাঃ) তথা অন্যান্য সাহাবীগণও ছিলেন। ইত্যবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের মাঝ থেকে উঠে (বাইরে) চলে গেলেন। যখন তিনি ফিরে আসতে দেরি করে দিলেন, তখন আমাদের আশঙ্কা হল যে, আমাদের অনুপস্থিতিতে তিনি (শত্রু) কবলিত না হন। এ দুশ্চিন্তায় আমরা ঘাবড়ে গেলাম এবং উঠে পড়লাম। তাঁদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। সুতরাং আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম।শেষ পর্যন্ত আমি আনসারদের বনূ নাজ্জারের একটি বাগানে পৌঁছে তার চতুর্দিকে ঘুরতে লাগলাম, যদি কোন (প্রবেশ) দরজা পাই। কিন্তু তার কোন (প্রবেশ) দরজা পেলাম না। হঠাৎ দেখলাম বাইরের একটি কুয়া থেকে সরু নালা ঐ বাগানের ভিতরে চলে গেছে। আমি সেখান দিয়ে জড়সড় হয়ে বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। (দেখলাম,) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সেখানে উপস্থিত।তিনি বলে উঠলেন, ’’আবূ হুরাইরা?’’ আমি বললাম, ’জী হ্যাঁ, হে আল্লাহ রাসূল!’ তিনি বললেন, ’’কী ব্যাপার তোমার?’’ আমি বললাম, ’আপনি আমাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু অকস্মাৎ উঠে বাইরে এলেন। তারপর আপনার ফিরতে দেরি দেখে আমরা এই দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি যে, আমাদের অনুপস্থিতিতে হয়তো আপনি (শত্রু) কবলিত হয়ে পড়বেন। যার ফলে আমরা সকলে ঘাবড়ে উঠলাম। সর্বপ্রথম আমিই বিচলিত হয়ে উঠে এই বাগানে এসে জড়সড় হয়ে শিয়ালের মত ঢুকে পড়লাম। আর সব লোক আমার পিছনে আসছে।’তিনি আমাকে সম্বোধন করে তাঁর জুতা জোড়া দিয়ে বললেন, ’’আবূ হুরাইরা! আমার এ জুতো জোড়া সঙ্গে নিয়ে যাও এবং এ বাগানের বাইরে ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে পাঠকারী যে কোন ব্যক্তির সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে, তাকে জান্নাতের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও।’’ অতঃপর সুদীর্ঘ হাদীস তিনি বর্ণনা করেছেন। (মুসলিম) [১]
মুসলিম ৩১, ২৪০৮, আহমাদ ১৮৭৮০, ১৮৮৪৬, দারেমী ৩৩১৬
রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৩/৭১৫-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে আবূ হুরাইরা রা.-এর একটি ঘটনা এসেছে। সাহাবীরা রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم-এর চারপাশে বসেছিলেন। তিনি উঠে বাইরে গেলে দেরি হওয়ায় সাহাবীরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। আবূ হুরাইরা রা. রাসূল صلى الله عليه وسلم-এর খোঁজে বের হয়ে এক বাগানে তাঁকে পান। রাসূল صلى الله عليه وسلم তাঁকে নিজের জুতা জোড়া দিয়ে বলেন, বাগানের বাইরে যার সঙ্গে দেখা হবে এবং যে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসসহ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সাক্ষ্য দেবে, তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিতে। এখানে মূল শিক্ষা হলো, তাওহীদের কালিমা শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সাহাবীদের রাসূল صلى الله عليه وسلم-এর প্রতি ভালোবাসা, দুশ্চিন্তা ও খোঁজ নেওয়ার মানসিকতা এই ঘটনায় ফুটে ওঠে।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাসসহ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
- সাহাবীরা রাসূল صلى الله عليه وسلم-এর নিরাপত্তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন।
- রাসূল صلى الله عليه وسلم সুসংবাদ পৌঁছে দেওয়ার জন্য আবূ হুরাইরা রা.-কে পাঠান।
