২/৯৫. অধ্যায়ঃ

রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৪/৭১৬ - ইসলাম পূর্বের পাপ মিটিয়ে দেয়

কোন ভাল জিনিসের সুসংবাদ ও তার জন্য মুবারকবাদ জানানো মুস্তাহাব

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴾ فَبَشِّرۡ عِبَادِ ١٧ ٱلَّذِينَ يَسۡتَمِعُونَ ٱلۡقَوۡلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحۡسَنَهُۥٓۚ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ هَدَىٰهُمُ ٱللَّهُۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمۡ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ١٨ ﴿ [الزمر: ١٧، ١٨]অর্থাৎ “তাদের জন্য আছে সুসংবাদ। অতএব সুসংবাদ দাও আমার দাসদেরকে; যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং যা উত্তম তার অনুসরণ করে। ওদেরকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন এবং ওরাই বুদ্ধিমান।” (সূরা যুমার ১৭-১৮ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ يُبَشِّرُهُمۡ رَبُّهُم بِرَحۡمَةٖ مِّنۡهُ وَرِضۡوَٰنٖ وَجَنَّٰتٖ لَّهُمۡ فِيهَا نَعِيمٞ مُّقِيمٌ ٢١ ﴿ [التوبة: ٢١]অর্থাৎ “তাদের প্রতিপালক তাদেরকে নিজ দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন; যেখানে তাদের জন্য স্থায়ী সুখ-সমৃদ্ধি রয়েছে।” (সূরা তওবা ২১ আয়াত)তিনি অন্যত্র বলেছেন,﴾ وَأَبۡشِرُواْ بِٱلۡجَنَّةِ ٱلَّتِي كُنتُمۡ تُوعَدُونَ ﴿ [فصلت: ٣٠]অর্থাৎ তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার সুসংবাদ নাও। (হা-মীম সিজদা ৩০ আয়াত)তিনি অন্য জায়গায় বলেন,﴾ فَبَشَّرۡنَٰهُ بِغُلَٰمٍ حَلِيمٖ ١٠١ ﴿ [الصافات: ١٠١]অর্থাৎ “অতঃপর আমি তাকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।” সূরা স্বা-ফফাত ১০১ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ وَلَقَدۡ جَآءَتۡ رُسُلُنَآ إِبۡرَٰهِيمَ بِٱلۡبُشۡرَىٰ ﴿ [هود: ٦٩]অর্থাৎ “আর আমার প্রেরিত ফিরিশতারা ইব্রাহীমের নিকট সুসংবাদ নিয়ে আগমন করল।” (সূরা হূদ ৬৯ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ وَٱمۡرَأَتُهُۥ قَآئِمَةٞ فَضَحِكَتۡ فَبَشَّرۡنَٰهَا بِإِسۡحَٰقَ وَمِن وَرَآءِ إِسۡحَٰقَ يَعۡقُوبَ ٧١ ﴿ [هود: ٧١]অর্থাৎ “সে সময় তার স্ত্রী দণ্ডায়মান ছিল, সে হেসে উঠল তখন আমি তাকে (ইব্রাহীমের স্ত্রীকে) সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের এবং ইসহাকের পর ইয়াকূবের।” (সূরা হূদ ৭১ আয়াত)তিনি আরো বলেন,﴾ فَنَادَتۡهُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَهُوَ قَآئِمٞ يُصَلِّي فِي ٱلۡمِحۡرَابِ أَنَّ ٱللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحۡيَىٰ﴿ [ال عمران: ٣٩]অর্থাৎ “যখন (যাকারিয়া) মিহরাবে নামাযে রত ছিলেন তখন ফেরেশ্তাগণ তাকে সম্বোধন করে বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহয়্যার সুসংবাদ দিচ্ছেন।” (আলে ইমরান ৩৯ আয়াত)তিনি আরো বলেছেন,﴾ إِذۡ قَالَتِ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ يَٰمَرۡيَمُ إِنَّ ٱللَّهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٖ مِّنۡهُ ٱسۡمُهُ ٱلۡمَسِيحُ ﴿ [ال عمران: ٤٥]অর্থাৎ “(স্মরণ কর) যখন ফেরেশতাগণ বললেন, হে মারয়্যাম! নিশ্চয় আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তোমাকে একটি কালেমা (দ্বারা সৃষ্টসন্তানে)র সুসংবাদ দিচ্ছেন; যার নাম হবে মসীহ।” (আলে ইমরান ৪৫ আয়াত)এ ছাড়া এ মর্মে অনেক আয়াত রয়েছে, যা অনেকের জানা আছে। আর উক্ত বিষয়ে হাদীসও অনেক বেশী বিদ্যমান, যা বিশুদ্ধ গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে বলে সুপ্রসিদ্ধ। তার মধ্যে কতিপয় নিম্নরূপঃ-

ইসলাম পূর্বের পাপ মিটিয়ে দেয়: আমর ইবনে আস রা.-এর শিক্ষা

রিয়াদুস সালেহীনহাদিস নম্বর ৪/৭১৬

وَعَنِ ابنِ شِمَاسَة، قَالَ: حَضَرْنَا عَمْرَو بنَ العَاصِ رضي الله عنه وَهُوَ في سِيَاقَةِ الْمَوْتِ، فَبَكَى طَوِيلاً، وَحَوَّلَ وَجْهَهُ إِلَى الجِدَارِ، فَجَعَلَ ابْنُهُ، يَقُولُ: يَا أبَتَاهُ، أمَا بَشَّرَكَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ بكَذَا؟ أمَا بَشَّرَكَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ﷺ بِكَذَا؟فَأقْبَلَ بِوَجْهِهِ، فَقَالَ: إنَّ أفْضَلَ مَا نُعِدُّ شَهَادَةُ أنْ لاَ إلٰهَ إِلاَّ الله، وَأنَّ مُحَمَّداً رَسُولُ اللهِ ﷺ، إنِّي قَدْ كُنْتُ عَلَى أطْبَاقٍ ثَلاَثٍ: لَقَدْ رَأيْتُنِي وَمَا أحَدٌ أشَدُّ بُغضاً لِرَسُولِ اللهِ ﷺ مِنِّي، وَلاَ أحَبَّ إليَّ مِنْ أنْ أكُونَ قدِ اسْتَمكَنتُ مِنْهُ فَقَتَلْتُهُ، فَلَوْ مُتُّ عَلَى تِلكَ الحَالِ لَكُنْتُ مِنْ أهْلِ النَّارِ، فَلَمَّا جَعَلَ اللهُ الإسلاَمَ في قَلْبِي أتَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ، فقُلْتُ: اُبسُطْ يَمِينَكَ فَلأُبَايِعُكَ، فَبَسَطَ يَمِينَهُ فَقَبَضْتُ يَدِي، فَقَالَ: «مَا لَكَ يَا عَمْرُو؟» قُلتُ: أَرَدتُ أنْ أشْتَرِطَ، قَالَ: «تَشْتَرِطُ مَاذا؟» قُلْتُ: أنْ يُغْفَرَ لِي، قَالَ: « أمَا عَلِمْتَ أن الإِسلاَمَ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ، وَأن الهِجْرَةَ تَهْدِمُ مَا كَانَ قَبلَهَا، وَأنَّ الحَجَّ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ ؟ ».وَمَا كَانَ أحدٌ أحَبَّ إليَّ مِنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ، وَلاَ أجَلَّ في عَينِي مِنْهُ وَمَا كُنْتُ أُطيقُ أَن أَملأُ عَينَيَّ مِنْهُ؛ إِجلاَلاً لَهُ، وَلَو سُئِلتُ أَن أَصِفَهُ مَا أَطَقتُ، ِلأَنِّي لَمْ أَكُن أَملأُ عَينَيَّ مِنْهُ، وَلَو مُتُّ عَلَى تِلْكَ الحَالِ لَرجَوْتُ أَن أكُونَ مِنْ أهْلِ الجَنَّةِ، ثُمَّ وَلِينَا أشْيَاءَ مَا أدْرِي مَا حَالِي فِيهَا؟ فَإِذَا أنَا مُتُّ فَلاَ تَصحَبَنِّي نَائِحَةٌ وَلاَ نَارٌ، فَإِذَا دَفَنْتُمُونِي، فَشُنُّوا عَليَّ التُّرَابَ شَنّاً، ثُمَّ أَقِيمُوا حَوْلَ قَبْرِي قَدْرَ مَا تُنْحَرُ جَزورٌ، وَيُقْسَمُ لَحْمُهَا، حَتَّى أَسْتَأنِسَ بِكُمْ، وَأنْظُرَ مَا أُرَاجعُ بِهِ رُسُلَ رَبّي. رواه مسلم.

ইবনে শিমাসাহ (রহঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, ’আমর ইবনে ’আস (রাঃ)-এর মরণোন্মুখ সময়ে আমরা তাঁর নিকটে উপস্থিত হলাম। তিনি অনেকক্ষণ ধরে কাঁদতে থাকলেন এবং দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরূপ অবস্থা দেখে তাঁর এক ছেলে বলল, ’আব্বাজান! আপনাকে কি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অমুক জিনিসের সুসংবাদ দেননি? আপনাকে কি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অমুক জিনিসের সুসংবাদ দেননি?’ এ কথা শুনে তিনি তাঁর চেহারা সামনের দিকে করে বললেন, আমাদের সর্বোত্তম পুঁজি হল, এই সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল। আমি তিনটি স্তর অতিক্রম করেছি।(এক) আমার চেয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রতি বড় বিদ্বেষী আর কেউ ছিল না। তাঁকে হত্যা করার ক্ষমতা অর্জন করাই ছিল আমার তৎকালীন সর্বাধিক প্রিয় বাসনা। যদি (দুর্ভাগ্যক্রমে) তখন মারা যেতাম, তাহলে নিঃসন্দেহে আমি জাহান্নামী হতাম।(দুই) তারপর যখন আল্লাহ তা’আলা আমার অন্তরে ইসলাম প্রক্ষিপ্ত করলেন, তখন নবী (ﷺ) এর নিকট হাজির হয়ে নিবেদন করলাম, ’আপনার ডান হাত প্রসারিত করুন। আমি আপনার হাতে বায়’আত করতে চাই।’ বস্তুত তিনি ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আমি আমার হাত টেনে নিলাম। তিনি বললেন, ’’আমর! কী ব্যাপার?’’ আমি নিবেদন করলাম, ’একটি শর্ত আরোপ করতে চাই।’ তিনি বললেন, ’’শর্তটি কী?’’ আমি বললাম, ’আমাকে ক্ষমা করা হোক---শুধু এতটুকুই।’ তিনি বললেন, ’’তুমি কি জানো না যে, ইসলাম পূর্বের সমস্ত পাপরাশিকে মিটিয়ে দেয়, হিজরত পূর্বের সমস্ত পাপরাশিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে এবং হজ্জও পূর্বের পাপসমূহ ধ্বংস করে দেয়?’’তখন থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অপেক্ষা অধিক প্রিয় মানুষ আর কেউ নেই। আর আমার দৃষ্টিতে তাঁর চেয়ে সম্মানীয় ব্যক্তি আর কেউ নেই। তাঁকে সম্মান ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করার অবস্থা এরূপ ছিল যে, তাঁর দিকে নয়নভরে তাকাতে পারতাম না। যার ফলে আমাকে কেউ যদি প্রশ্ন করে যে, ’আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর গঠনাকৃতি কিরূপ ছিল?’ তাহলে আমি তা বলতে পারব না। এ অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয়ে যেত, তাহলে আশা ছিল যে, আমি জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।(তিন) তারপর বহু দায়িত্বপূর্ণ বিষয়াদির খপ্পরে পড়লাম। জানি না, তাতে আমার অবস্থা কী? সুতরাং আমি মারা গেলে কোন মাতমকারিণী অথবা আগুন যেন অবশ্যই আমার (জানাযার) সাথে না থাকে। তারপর যখন আমাকে দাফন করবে, তখন যেন তোমরা আমার কবরে অল্প অল্প করে মাটি দেবে। অতঃপর একটি উট যবেহ করে তার মাংস বণ্টন করার সময় পরিমাণ আমার কবরের পাশে অপেক্ষা করবে। যাতে আমি তোমাদের সাহায্যে নিঃসঙ্গতা দূর করতে পারি এবং আমার প্রভুর প্রেরিত ফেরেশতাদের সঙ্গে কিরূপ বাক্-বিনিময় করি, তা দেখে নিই। (মুসলিম)[১]

মুসলিম ১২১, আহমাদ ১৭৩২৬, ১৭৩৫৭

রিয়াদুস সালেহীন হাদিস ৪/৭১৬-এর সারসংক্ষেপ

এই হাদিসে আমর ইবনে আস রা.-এর মৃত্যুকালের কথা এসেছে। তিনি নিজের জীবনের তিনটি স্তর বর্ণনা করেন। প্রথমে তিনি রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم-এর প্রতি কঠোর বিদ্বেষী ছিলেন। পরে আল্লাহ তাঁর অন্তরে ইসলাম দেন। তিনি নবী صلى الله عليه وسلم-এর হাতে বায়আত করতে গিয়ে ক্ষমার শর্ত চান। তখন রাসূল صلى الله عليه وسلم বলেন, ইসলাম পূর্বের সব পাপ মিটিয়ে দেয়, হিজরত পূর্বের পাপ মিটিয়ে দেয় এবং হজ্জও পূর্বের পাপ ধ্বংস করে দেয়। এরপর আমর রা. বলেন, রাসূল صلى الله عليه وسلم তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ও সম্মানীয় হয়ে যান। মৃত্যুর সময় তিনি মাতমকারিণী ও আগুন না রাখার নির্দেশ দেন এবং দাফনের পর কিছু সময় কবরের পাশে থাকতে বলেন। এই হাদিসে তাওবা, ইসলাম গ্রহণ, রাসূলের প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুর সময় বিনয়ী মনোভাব স্পষ্ট।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে আগের পাপ মিটে যাওয়ার কথা হাদিসে এসেছে।
  • আল্লাহ চাইলে মানুষের অন্তর বদলে দিতে পারেন।
  • রাসূল صلى الله عليه وسلم-এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান মুমিনের হৃদয়ে গভীর জায়গা রাখে।
  • মৃত্যুর সময় বিনয় ও নিজের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করা উচিত।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন