আজান ও ইকামত

মোট হাদিস ২০৭

ইসলামে আজান ও ইকামত প্রচলনের ইতিহাস ও সহীহ হাদিসের বিধান

মুসলিমরা যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন সালাতের নির্দিষ্ট সময় ও তা জানানোর কোনো মাধ্যম নির্ধারিত ছিল না। সাহাবীগণ একত্রিত হয়ে সালাতের সময় ঘোষণার জন্য বিভিন্ন উপায় যেমন— ঘন্টা বাজানো বা আগুন জ্বালানোর প্রস্তাব করেন। পরবর্তীতে ওমর (রাঃ)-এর পরামর্শে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিলাল (রাঃ)-কে সালাতের জন্য ডাকার নির্দেশ দেন, যা আজান নামে পরিচিত হয়। হাদীস অনুযায়ী, বিলাল (রাঃ)-কে আজানের শব্দসমূহ জোড় সংখ্যায় (দু’বার করে) এবং ইকামতের শব্দসমূহ বেজোড় সংখ্যায় (একবার করে) উচ্চারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে ইকামতের ক্ষেত্রে 'কাদ কামাতিস সালাহ' শব্দটি এর ব্যতিক্রম হিসেবে দুইবার উচ্চারণ করার বিধান রয়েছে। এই সহীহ বর্ণনাগুলো আমাদের আজান ও ইকামতের সঠিক সুন্নাত পদ্ধতি ও এর গৌরবময় সূচনা শিক্ষা দেয়।

حَدَّثَنَا عِمْرَانُ بْنُ مَيْسَرَةَ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ، حَدَّثَنَا خَالِدٌ الْحَذَّاءُ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ ذَكَرُوا النَّارَ وَالنَّاقُوسَ، فَذَكَرُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى، فَأُمِرَ بِلاَلٌ أَنْ يَشْفَعَ الأَذَانَ وَأَنْ يُوتِرَ الإِقَامَةَ.

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

(জামা’আতে সালাত আদায়ের জন্য) সাহাবা-ই-কিরাম (রাঃ) আগুন জ্বালানো অথবা নাকূস বাজানোর কথা আলোচনা করেন। আবার এগুলোকে (যথাক্রমে) ইয়াহুদী ও নাসারাদের প্রথা বলে উল্লেখ করা হয়। অতঃপর বিলাল (রাঃ)-কে আযানের বাক্য দু’বার করে ও ইক্বামাতের বাক্য বেজোড় করে বলার নির্দেশ দেয়া হয়।

[১] বুখারী ছাড়াও মুসলিম ও আবূ দাউদে ইক্বামাতের বাক্যগুলো একবার করে বলার সহীহ হাদীস বিদ্যমান। তথাপিও আধুনিক প্রকাশনীর টীকায় লেখা “হানাফীগণ অন্য এক হাদীসের ভিত্তিতে ইক্বামাতের বাক্যগুলো দু’বার করে বলেন।” এ কথার জবাবে সাধারণ পাঠকের উদ্দেশে মুহাদ্দিসীনদের কতিপয় মতামত পেশ করা হলঃ হাফিয আবূ ‘উমর বিন ‘আবদুর রব বলেন, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইসহাক বিন রাহওয়াইহি, দাউদ বিন আলী, মোহাম্মদ বিন জরীর প্রভৃতি ইক্বামাতের শব্দগুলি একবার বা দু’বার করে বলার উভয়বিধ অভিমত গ্রহণ করেছেন। তাঁদের দৃষ্টিতে উভয় নিয়মই বিশুদ্ধ, বৈধ ও গ্রহণযোগ্য এবং ঐচ্ছিক ব্যাপার-যে ইচ্ছা করবে একবারও বলতে পারবে এবং অপরপক্ষে যে ইচ্ছা করবে দু’বার করেও বলতে পারবে। (তুহফা সহ তিরমিযী ১ম খণ্ড ১৭৪পৃঃ) হাফিয আবু আওয়ানাহ তদীয় মসনদ গ্রন্থে ১ম খণ্ড ৩৩০ পৃষ্ঠায় বলেন, বিলালের আযানের ইক্বামাত একবার করে বলার নিয়ম মনসূখ হয়নি। আবূ মাহযূরাহ্‌র হাদীস হতে ইক্বামাত দু’বার করে বলা প্রমাণিত হলেও তা হতে অধিক সহীহ আনাসের হাদীসে একবার করে বলা প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং উসূলে হাদীস শাস্ত্রের বিধান ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে বিরোধক্ষেত্রে যা অধিক সহীহ তা-ই গ্রহণ করা উত্তম ও একান্ত বাঞ্ছনীয়। ইমাম আবদুল ওয়াহহাব শা’রানী হানাফী ‘কাশ্‌ফুল গুম্মা’ ১ম খণ্ড ১২৮ পৃষ্ঠায় আবদুল্লাহ বিন যায়দের আযানের সাথে উল্লেখিত ইক্বামাতের শব্দগুলি একবার করে বলার নিয়মের উল্লেখ করেছেন। উক্ত গ্রন্থে ১২৯ পৃষ্ঠায় তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিলালকে আযানের শব্দগুলি দু’বার করে এবং ইক্বামাতের শব্দগুলো একবার করে বলার নির্দেশ সম্বলিত হাদীসের উল্লেখ করেছেন। শায়খ আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) তদীয় সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘গুনিয়াতুত তালেবীন’-এর ৮ পৃষ্ঠায় ইক্বামাতের শব্দগুলি একবার করে বলার স্বপক্ষে তাঁর নিজের মন্তব্য পেশ করেছেন। মোটের উপর আমরা ইমাম আহমাদ, ইসহাক বিন রাহওয়াইহি এবং অন্যান্য ওলামায়ে কিরামের ন্যায় ইক্বামাতের শব্দগুলি একবার করে অথবা দু’বার করে বলার উভয়বিধ অভিমতের বৈধতা ও প্রামাণিকতা স্বীকার করি; অধিকন্তু আমরা উভয়বিধ আমলকে জায়েজ বলে মনে করি। কিন্তু যেহেতু ইক্বামাতের শব্দগুলি দু’বার করে বলার নির্দেশ সম্বলিত হাদীস হতে একবার করে বলার নির্দেশ সম্বলিত হাদীস অধিক প্রামাণ্য ও বিশুদ্ধ এবং তা বহু সূত্রে বর্ণিত এমনকি ইমাম বুখারী ও মুসলিম উভয় কর্তৃক গৃহীত, কাজেই আমরা ইক্বামাতের শব্দগুলি একবার করে বলা সর্বোত্তম মনে করি।

حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ، قَالَ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ سِمَاكِ بْنِ عَطِيَّةَ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ أُمِرَ بِلاَلٌ أَنْ يَشْفَعَ، الأَذَانَ وَأَنْ يُوتِرَ الإِقَامَةَ إِلاَّ الإِقَامَةَ.

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

বিলাল (রাঃ)-কে আযানের শব্দ দু’ দু’বার এবং قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ ব্যতীত ইক্বামাতের শব্দগুলো বেজোড় করে বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا خَالِدٌ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ أُمِرَ بِلاَلٌ أَنْ يَشْفَعَ، الأَذَانَ، وَأَنْ يُوتِرَ الإِقَامَةَ. قَالَ إِسْمَاعِيلُ فَذَكَرْتُ لأَيُّوبَ فَقَالَ إِلاَّ الإِقَامَةَ.

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

বিলাল (রাঃ)-কে আযানের বাক্যগুলো দু’ দু’বার এবং ইক্বামাতের বাক্যগুলো বেজোড় করে বলার নির্দেশ দেয়া হয়। ইসমাঈল (রহঃ) বলেন, আমি এ হাদীস আইয়ূবের নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেন, তবে ‘কাদ্‌কামাতিস্ সালাতু’ ছাড়া।

حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ، وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ الْمُبَارَكِ، قَالاَ حَدَّثَنَا حَمَّادٌ، عَنْ سِمَاكِ بْنِ عَطِيَّةَ، ح وَحَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا وُهَيْبٌ، جَمِيعًا عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ أُمِرَ بِلاَلٌ أَنْ يَشْفَعَ، الأَذَانَ وَيُوتِرَ الإِقَامَةَ . زَادَ حَمَّادٌ فِي حَدِيثِهِ إِلاَّ الإِقَامَةَ .

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

বিলাল কে আযান জোড় ও ইক্বামাত বেজোড় সংখ্যায় বলার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। হাম্মাদ তাঁর হাদীসে আরো বলেন, কিন্তু ‘ক্বাদ ক্বামাতিস সলাহ’ বাক্যটি ছাড়া (অর্থাৎ এ বাক্যটি দু’বার বলতে হবে)।

حَدَّثَنَا حُمَيْدُ بْنُ مَسْعَدَةَ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، عَنْ خَالِدٍ الْحَذَّاءِ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، مِثْلَ حَدِيثِ وُهَيْبٍ . قَالَ إِسْمَاعِيلُ فَحَدَّثْتُ بِهِ، أَيُّوبَ فَقَالَ إِلاَّ الإِقَامَةَ .

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

পূর্বোক্ত হাদীসের অনুরূপ বর্ণিত আছে। ইসমাঈল বলেন, আমি এ হাদীস আইউবের নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেন, কিন্তু ক্বাদ ক্বামাতিস সলাহ (বাক্যটি জোড় সংখ্যায় বলবে)।

حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ، عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ صُهَيْبٍ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ أُقِيمَتِ الصَّلاَةُ وَرَسُولُ اللَّهِ ﷺ نَجِيٌّ فِي جَانِبِ الْمَسْجِدِ فَمَا قَامَ إِلَى الصَّلاَةِ حَتَّى نَامَ الْقَوْمُ .

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

(‘ইশার) সালাতের ইক্বামাত দেয়ার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মসজিদের কোণে এক লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন। তিনি সালাত শুরু করতে আসায় বিলম্ব করায় অপেক্ষমাণ লোকজন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

হাদীস থেকে শিক্ষাঃ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কোন কাজে ব্যস্ততার কারণে সালাতকে প্রথম ওয়াক্তের পর (কিছুটা) বিলম্ব করে আদায় করা জায়িয আছে। তবে সেরকম কিছু না হলে সালাতে বিলম্ব করা মোটেই ঠিক হবে না। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

حَدَّثَنَا نَصْرُ بْنُ عَلِيٍّ الْجَهْضَمِيُّ، حَدَّثَنَا عُمَرُ بْنُ عَلِيٍّ، عَنْ خَالِدٍ الْحَذَّاءِ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ أُمِرَ بِلاَلٌ أَنْ يَشْفَعَ، الأَذَانَ وَيُوتِرَ الإِقَامَةَ .

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

বিলাল (রাঃ)-কে আজানের শব্দাবলী জোড়া সংখ্যায় এবং ইকামাতের শব্দাবলী বেজোড় সংখ্যায় বলার নির্দেশ দেয়া হয়।

[৭২৮]বুখারী ৬০৩, ৬০৫-৭, ৩৪৫৭; মুসলিম ৩৭১-৩, তিরমিযী ১৯৩, নাসায়ী ৬২৭, আবূ দাঊদ ৫০৮, আহমাদ ১১৫৯০, ১২৫৫৯; দারিমী ১১৯৪-৯৫, মাজাহ ৭২৯। তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ। তাখরীজ আলবানী: সহীহাহ্ ২৭১, সহীহ আবূ দাউদ ৫২৫।

حَدَّثَنَا خَلَفُ بْنُ هِشَامٍ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، ح وَحَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى، أَخْبَرَنَا إِسْمَاعِيلُ ابْنُ عُلَيَّةَ، جَمِيعًا عَنْ خَالِدٍ الْحَذَّاءِ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ أُمِرَ بِلاَلٌ أَنْ يَشْفَعَ، الأَذَانَ وَيُوتِرَ الإِقَامَةَ . زَادَ يَحْيَى فِي حَدِيثِهِ عَنِ ابْنِ عُلَيَّةَ فَحَدَّثْتُ بِهِ أَيُّوبَ فَقَالَ إِلاَّ الإِقَامَةَ .

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

বিলাল (রাঃ)-কে আযানের শব্দ জোড় সংখ্যায় এবং ইকামাতের শব্দ বেজোড় বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইয়াহিয়া তার বর্ণনায় ইবনু ‘উলাইয়্যাহ্‌-এর সূত্রে বলেছেন, তিনি আইয়ূব (রহঃ)-এর কাছে এ হাদীস বর্ণনা করলে তিনি বললেন, কিন্তু ‘কাদ্‌কা- মাতিস্‌ সলা-হ্‌’ শব্দটি ব্যতীত (এটি দু’বার বলবে। ) বাকী শব্দগুলো একবার করে বলবে

ই. ফা. ৭২২, ই. সে. ৭৩৭

وَحَدَّثَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ الْقَوَارِيرِيُّ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ بْنُ سَعِيدٍ، وَعَبْدُ الْوَهَّابِ بْنُ عَبْدِ الْمَجِيدِ، قَالاَ حَدَّثَنَا أَيُّوبُ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ أُمِرَ بِلاَلٌ أَنْ يَشْفَعَ، الأَذَانَ وَيُوتِرَ الإِقَامَةَ .

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

বিলাল (রাঃ)-কে আজান জোড় সংখ্যায় এবং ইকামাত বেজোড় সংখ্যায় বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ই. ফা. ৭২৫, ই. সে. ৭৪০

أَخْبَرَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَهَّابِ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ أَبِي قِلَابَةَ، عَنْ أَنَسٍ قَالَ: «إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ بِلَالًا أَنْ يَشْفَعَ الْأَذَانَ، وَأَنْ يُوتِرَ الْإِقَامَةَ»

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিলাল (রাঃ)-কে আযান (এর বাক্যগুলো) দুবার করে বলার এবং ইকামাত (এর বাক্যগুলো) একবার করে বলার নির্দেশ দিলেন।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন