অনুমতি চাওয়া
৭৯/১. অধ্যায়ঃ
সালামের সূচনা
সহিহ বুখারী : ৬২২৭
সহিহ বুখারীহাদিস নম্বর ৬২২৭
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ جَعْفَرٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، عَنْ مَعْمَرٍ، عَنْ هَمَّامٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ، طُولُهُ سِتُّونَ ذِرَاعًا، فَلَمَّا خَلَقَهُ قَالَ اذْهَبْ فَسَلِّمْ عَلَى أُولَئِكَ النَّفَرِ مِنَ الْمَلاَئِكَةِ جُلُوسٌ، فَاسْتَمِعْ مَا يُحَيُّونَكَ، فَإِنَّهَا تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ ذُرِّيَّتِكَ. فَقَالَ السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ. فَقَالُوا السَّلاَمُ عَلَيْكَ وَرَحْمَةُ اللَّهِ. فَزَادُوهُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ، فَكُلُّ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ آدَمَ، فَلَمْ يَزَلِ الْخَلْقُ يَنْقُصُ بَعْدُ حَتَّى الآنَ ".
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা আদম (আঃ)-কে তাঁর যথাযোগ্য গঠনে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর উচ্চতা ছিল ষাট হাত। তিনি তাঁকে সৃষ্টি করে বললেনঃ তুমি যাও। উপবিষ্ট ফেরেশতাদের এই দলকে সালাম করো এবং তুমি মনোযোগ সহকারে শোনবে তারা তোমার সালামের কী জবাব দেয়? কারণ এটাই হবে তোমার ও তোমার বংশধরের সম্ভাষণ (তাহিয়্যা)।তাই তিনি গিয়ে বললেনঃ ‘আসসালামু আলাইকুম’। তাঁরা জবাবে বললেনঃ ‘আসসালামু আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহ’। তাঁরা বাড়িয়ে বললেনঃ ‘ওয়া রহমাতুল্লাহ’ বাক্যটি।তারপর নবী (ﷺ) আরও বললেনঃ যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে তারা আদম (আঃ)-এর আকৃতি বিশিষ্ট হবে। তারপর থেকে এ পর্যন্ত মানুষের আকৃতি ক্রমশ কমে আসছে।
আধুনিক প্রকাশনী- ৫৭৮৬, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৬৮১
৭৯/২. অধ্যায়ঃ
আল্লাহ তা'আলার বাণী: হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না, অনুমতি প্রার্থনা এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম দেয়া ব্যতীত। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যাতে তোমরা উপদেশ লাভ কর। সেখানে যদি কাউকে না পাও, তাহলে তাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া হয়। আর যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ‘ফিরে যাও, তাহলে ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্য বেশি পবিত্র’। তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি অবগত। সে ঘরে কেউ বাস করে না, তোমাদের মালমাত্তা থাকে, সেখানে প্রবেশ করলে তোমাদের কোন পাপ হবে না, আল্লাহ জানেন তোমরা যা প্রকাশ কর আর যা তোমরা গোপন কর। (সূরা আন-নূর ২৪/২৭-২৯)
” এ আয়াত নাযিল হওয়ার উপলক্ষ ছিল এই যে, একজন মহিলা সাহাবী রসূলে কারীম (ﷺ)-এর দরবারে হাজির হয়ে বললেনঃ...“সেই ঘরে যদি কোনো লোক না পাও তবে তাতে তোমরা প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না তোমাদেরকে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়া হবে। আর যদি তোমাদেরকে ফিরে যেতে বলা হয়, তাহলে অবশ্যই ফিরে যাবে। এ হচ্ছে তোমাদের জন্য অধিক পবিত্রতর নীতি। তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আল্লাহ পূর্ণ মাত্রায় অবহিত রয়েছেন।” (সূরা নূর আয়াত: ২৮)আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। নবী কারীম (ﷺ) বলেছেন:يَابُنَيَّ إِذَا دَخَلْتَ عَلَى اَهْلِكَ فَسَلِّمْ تَكُوْنُ بَرَكَةً عَلَيْكَ وَعَلٰى اَهْلِ بَيْتِكَ- (ترمذي“হে প্রিয় পুত্র, তুমি যখন তোমার ঘরের লোকদের সামনে যেতে চাইবে, তখন বাইরে থেকে সালাম কর। এ সালাম করা তোমার ও তোমার ঘরের লোকদের পক্ষে বড়ই বারাকাতের কারণ হবে।কারো ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে প্রথমে সালাম দেবে, না প্রথমে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইবে, এ নিয়ে দু’রকমের মত পাওয়া যায়। কুরআনে প্রথমে অনুমতি চাওয়ার নির্দেশ হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন যে, প্রথমে অনুমতি চাইবে, পরে সালাম দিবে। কিন্তু এ মত বিশুদ্ধ নয়। কুরআনে প্রথমে অনুমতি চাওয়ার কথা বলা হয়েছে বলেই যে প্রথমে তাই করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কুরআনে তো কী কী করতে হবে তা এক সঙ্গে বলে দেয়া হয়েছে। এখানে পূর্বাপরের বিশেষ কোনো তাৎপর্য নেই। বিশেষত বিশুদ্ধ হাদীসে প্রথমে সালাম করার উপরই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।”বনী ‘আমের গোত্রীয় এক সাহাবী হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন: আমি রাসূল (ﷺ)-এর ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলাম। রাসূল তাঁর দাসীকে নির্দেশ দিলেন বেরিয়ে গিয়ে তাকে বল: আপনি আসসালামু আলাইকুম বলে বলুন: আমি কি প্রবেশ করব? কারণ সে কীভাবে প্রবেশ করতে হয় ভাল করে তা জানে না ...। [হাদীসটি সহীহ, দেখুন “সহীহ আবী দাউদ” (৫১৭৭), “সহীহ আদাবিল মুফরাদ” (১০৮৪)]।‘আত্বা বলেন: আমি আবূ হুরাইরা (রা.)-কে বলতে শুনেছি: কেউ যদি বলে: আমি কি [ঘরে] প্রবেশ করব আর সালাম প্রদান না করে তাহলে তুমি তাকে না বল যে পর্যন্ত সে চাবি না নিয়ে আসে। আমি বললাম: আসসালাম। তিনি বললেন: হ্যাঁ। [“সহীহ আদাবিল মুফরাদ” (১০৮৩)]।ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত তিনি বলেন: ‘উমার নবী (ﷺ)-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করতে গিয়ে বলেছিলেন: আসসালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম ‘উমার কি প্রবেশ করবে? [“সহীহ আদাবিল মুফরাদ” (১০৮৫)]।কালদা ইবনে হাম্বল (রা.) বলেন: আমি রাসূলের ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলাম, কিন্তু প্রথমে সালাম করিনি বলে অনুমতিও পাইনি। তখন নবী (ﷺ) বললেন: اِرْجِعْ فَقُلِ السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ ءَاَدْخُلُ- (ابو ادؤد، ترمذى)ফিরে যাও, তারপর এসে বল আসসালামু ‘আলাইকুম, তার পরে প্রবেশের অনুমতি চাও।জাবের বর্ণিত হাদীসে রাসূলে কারীম (ﷺ) বললেন: (بهقى) -لاَتَأْذَنُوْا لِمَنْ لَّمْ يَبْدَاُ بِالسَّلاَمِযে লোক প্রথমে সালাম করেনি, তাকে ঘরে প্রবেশ করার অনুমতি দিও না।জাবের বর্ণিত অপর এক হাদীসে বলা হয়েছে:اَلسَّلاَمُ قَبْلَ الْكَلاَمِ - (ترمذي) (কথার পূর্বে সালাম দাও।আবূ মূসা আশ‘আরী ও হুযাইফা (রা.) বলেছেন: اِسْتَأْذَنَ عَلٰى ذَوَاتِ الْمَحَارِمِ-মাহরাম মেয়েলোকদের কাছে যেতে হলেও প্রথমে অনুমতি চাইতে হবেএক ব্যক্তি রসূলে কারীম (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলেন:আমার মায়ের ঘরে যেতে হলেও কি আমি অনুমতি চাইব?রসূলে কারীম (ﷺ) বললেন: অবশ্যই। সে লোকটি বলল: আমি তো তার সঙ্গে একই ঘরে থাকি-তবুও? রাসূল (ﷺ) বললেনঃ হ্যাঁ, অবশ্যই অনুমতি চাইবে। সেই ব্যক্তি বলল: আমি তো তার খাদেম।তখন রসূলে কারীম (ﷺ) বললেন: اِسْتَأْذَنَ عَلَيْهَا اَتُحِبُّ اَنْ تَرَاهَا عُرْيَانَةً-অবশ্যই পূর্বাহ্নে অনুমতি চাইবে, তুমি কি তোমার মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পছন্দ কর?তার মানে, অনুমতি না নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলে মাকে উলঙ্গ অবস্থায় দেখতে পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে সালাম করতে হবে এবং পরে প্রবেশের অনুমতি চাইতে হবে। অনুমতি না পেলে ফিরে যেতে হবে। এ ফিরে যাওয়া অধিক ভাল, সম্মানজনক প্রবেশের জন্য কাতর অনুনয়-বিনয় করার হীনতা থেকে।ইবন আব্বাস (রা.) হাদীসের ইলম লাভের জন্যে কোনো কোনো আনসারীর ঘরের দ্বারদেশে গিয়ে বসে থাকতেন, ঘরের মালিক বের হয়ে না আসা পর্যন্ত তিনি প্রবেশের অনুমতি চাইতেন না। এ ছিল উস্তাদের প্রতি ছাত্রের বিশেষ আদব, শালীনতা।কারো বাড়ির সামনে গিয়ে প্রবেশের অনুমতির জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হলে দরজার ঠিক সোজাসুজি দাঁড়ানও সমীচীন নয়। দরজার ফাঁক দিয়ে ভিতরে নজর করতেও চেষ্টা করবে না। কারণ, নবী কারীম (ﷺ) থেকে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে: আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর বলেন:كَانَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ اِذَا اَتٰى بَابَ قَوْمٍ لَّمْ يَسْتَقْبِلِ الْبَابَ مِنْ يِّلْقَاءِ وَجْهِه وَلٰكِنْ مِّنْ رُّكْنِهِ الْاَيْمَنِ اَوِالْاَيْسَرِفَيَقُوْلُ اَلسَّلاَمُ عَلَيْكُمْ (ابو داؤدনবী কারীম (ﷺ) যখন কারো বাড়ি বা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াতেন, তখন অবশ্যই দরজার দিকে মুখ করে সোজা হয়ে দাঁড়াতেন না। বরং দরজার ডান কিংবা বাম পাশে সরে দাঁড়াতেন এবং সালাম করতেন।এক ব্যক্তি রসূলে কারীমের বিশেষ কক্ষপথে মাথা উঁচু করে তাকালে রসূলে কারীম (ﷺ) তখন ভিতরে ছিলেন এবং তাঁর হাতে লৌহ নির্মিত চাকুর মত একটি জিনিস ছিল। তখন তিনি বললেন:لَوْ اَنَّ امْرَأً اطَّلَعَ عَلَيْكَ بِغَيْرِ اِذْنٍ فَخَذَفْتَه بِحَصَاةٍ فَفَقَاتَ عَيْنَهُ مَاكَانَ عَلَيْكَ ضُلْعٌ-কেউ যদি তোমার অনুমতি ছাড়াই তোমার ঘরের মধ্যে উঁকি মেরে তাকায়, আর তুমি যদি পাথর মেরে তার চোখ ফুটিয়ে দাও, তাহলে তাতে তোমার কোনো দোষ হবে না।তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরও যদি অনুমতি পাওয়া না যায়, তাহলে ফিরে চলে যেতে হবে। আবূ সা‘ঈদ খুদরী একবার ‘উমার ফারূকের দাওয়াত পেয়ে তাঁর ঘরের দরজায় এসে উপস্থিত হলেন এবং তিনবার সালাম করার পরও কোনো জবাব না পাওয়ার কারণে তিনি ফিরে চলে গেলেন। পরে সাক্ষাত হলে ‘উমার ফারূক বললেন:“তোমাকে দাওয়াত দেয়া সত্তেও তুমি আমার ঘরে আসলে না কেন?”তিনি বললেন:“আমি তো এসেছিলাম, আপনার দরজায় দাঁড়িয়ে তিনবার সালামও করেছিলাম। কিন্তু কারো কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে আমি ফিরে চলে এসেছি। কেননা নবী কারীম (ﷺ) আমাকে বলেছেন, তোমাদের কেউ কারো ঘরে যাওয়ার জন্যে তিনবার অনুমতি চেয়েও না পেলে সে যেন ফিরে যায়।” (বুখারী, মুসলিম)ইমাম হাসান বসরী বলেছেন:“তিনবার সালাম করার মধ্যে প্রথমবার হল তার আগমন সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া। দ্বিতীয়বার সালাম প্রবেশের অনুমতি লাভের জন্যে এবং তৃতীয়বার হচ্ছে ফিরে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা।”কেননা তৃতীয়বার সালাম দেয়ার পরও ঘরের ভেতর থেকে কারো জবাব না আসা সত্যই প্রমাণ করে যে, ঘরে কেউ নেই, অন্তত ঘরে এমন কোনো পুরুষ নেই, যে তার সালামের জবাব দিতে পারে।আর যদি কেউ ধৈর্য ধরে ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়েই থাকতে চায়, তবে তারও অনুমতি আছে, কিন্তু শর্ত এই যে, দুয়ারে দাঁড়িয়েই অবিশ্রান্তভাবে ডাকা-ডাকি ও চিল্লাচিল্লি করতে থাকতে পারবে না।একথাই বলা হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতাংশে:“তারা যদি ধৈর্য ধারণ করে অপেক্ষায় থাকত যতক্ষণ না তুমি ঘর থেকে বের হচ্ছ, তাহলে তাদের জন্যে খুবই কল্যাণকর হত।” (সূরা হুজরাত ৪৯ : ৫)আয়াতটি যদিও বিশেষভাবে রাসূলে কারীম প্রসঙ্গে; কিন্তু এর আবেদন ও প্রয়োগ সাধারণ। কোনো কোনো কিতাবে এরূপ উল্লেখ পাওয়া যায় যে, ইবন আব্বাস (রা.) যিনি ইসলামের বিষয়ে মস্তবড় মনীষী ও বিশেষজ্ঞ ছিলেন– উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর বাড়িতে কুরআন শেখার উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতেন। তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতেন, কাউকে ডাক দিতেন না, দরজায় ধাক্কা দিয়েও ঘরের লোকদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলতেন না। যতক্ষণ না উবাই (রা.) নিজ ইচ্ছেমত ঘর থেকে বের হতেন, ততক্ষণ এমনিই দাঁড়িয়ে থাকতেন।"
