৫৩/৫. অধ্যায়ঃ
সহীহ বুখারী হাদিস ২৬৯৭ - বিদআত প্রত্যাখ্যানের মূলনীতি
অন্যায়ের উপর সন্ধিবদ্ধ হলে তা বাতিল।
বিদআত সম্পর্কে হাদিস: শরীয়তে নেই এমন কাজ প্রত্যাখ্যাত
সহীহ বুখারী : ২৬৯৭
সহীহ বুখারীহাদিস নম্বর ২৬৯৭
حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ، حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ الْقَاسِمِ بْنِ مُحَمَّدٍ، عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ " مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ ".رَوَاهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ جَعْفَرٍ الْمَخْرَمِيُّ وَعَبْدُ الْوَاحِدِ بْنُ أَبِي عَوْنٍ عَنْ سَعْدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ.
'আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত [১]।’ ‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু জা‘ফর মাখরামী (রহঃ) ও ‘আবদুল ওয়াহিদ ইব্নু আবূ ‘আউন, সা‘দ ইব্নু ইব্রাহীম (রহঃ) হতে তা বর্ণনা করেছেন।
[১] অত্র হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হল যে, শরীআর দৃষ্টিতে ওটাকে বিদ’আত বলা হয় যা দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিष्कार। অতএব দুনিয়াবী আবিষ্কার যেমন বাস, ট্রেন, উড়োজাহাজ, পানি জাহাজ প্রভৃতিতে চড়া বিদ’আত নয়। কারণ এগুলোতে চড়ার মাধ্যমে কেউ সাওয়াবের আশা করে না। দুঃখের বিষয় হলেও অতি সত্যকথা যে, আমরা ‘ইবাদাত করতে এত ব্যস্ত যে, ঐ ‘ইবাদাতটি নবীর তরীকা মুতাবিক হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করারও সময় নেই। এজন্যই অজান্তে দেদারসে এমন কিছু ‘আমাল সাওয়াব পাওয়ার নিমিত্তে করে যাচ্ছি যেগুলি জাহান্নামে যাওয়ার অন্যতম কারণ। যেমনঃ মীলাদ, শবে বরাত, চল্লিশা, খতমে জালালী, খতমে ইউনুস, কুরআন খানি, ফাতিহা খানি, শবীনা খতম, দরুদে তাজ, দরুদে লাক্ষী, দু‘আয়ে গাঞ্জুল আরশ, কুম কুম ইয়া হাবীবা ওযীফা, উরস, কবরে চাদর দেয়া, কবর পাকা করা, কবরের উপর লেখা, তাতে ফ্যানের ব্যবস্থা রাখা, সেখানে আগর বাতি-মোমবাতি জ্বালানো, সেখানে নযরানা পেশ করা, মুখে নিয়্যাতের গদ উচ্চারণ করা (নাওয়াইতু আন উসল্লিয়া ----- বলে), ফরজ সালাতান্তে, জানাযা সালাতান্তে সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দু‘আ করা প্রভৃতি। এগুলো এমন ‘আমাল যার মধ্যে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তরীকা বিদ্যমান না থাকায় নিঃসন্দেহে বিদ’আত- যার পরিণাম জাহান্নাম ছাড়া আর কিছু নয়। অনেকে বলে থাকেন, বুঝলাম এগুলো বিদ’আত কিন্তু বিদ’আত তো দুই প্রকার- (১) বিদ‘আতে হাসানাহ (উত্তম বিদ‘আত) (২) বিদ‘আতে সায়্যিআহ (মন্দ বিদ‘আত)। অতএব এগুলো বিদ‘আত হলেও মন্দ বিদ‘আত নয় বরং উত্তম বিদ‘আত। তাই বলি : বিদ‘আতকে উক্ত দুই ভাগে ভাগ করাও একটি বিদ‘আত। কারণ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বিদ‘আতের এই বিভাজন আদৌ প্রমাণিত নেই। বরং তিনি সমস্ত বিদ‘আতকে ভ্রষ্টতা বলেছেন- (নাসায়ী ৩/১৮৮-১৮৯, ইবনু খুযাইমাহ হাঃ ১৭৮৫)। ইবনু ‘উমার (রাঃ) বলেন : সমস্ত বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা যদিও মানুষ তাকে উত্তম মনে করে- (সলাতুত তারাবীহ- আলবানী ৮১ পৃষ্ঠা)। মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়াবী বিষয়ে সকল বিষয়ই বৈধ বা হালাল, শুধুমাত্র কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে যে সকল বস্তুকে হারাম করা হয়েছে সেগুলো ব্যতীত। আর ‘ইবাদাতের ক্ষেত্রে সকল প্রকার ‘ইবাদাত হারাম বা অবৈধ শুধুমাত্র কুরআন ও সুন্নাহয় যেগুলোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেগুলো ব্যতীত। ‘আমাল সহীহ ও সুন্নাতী পদ্ধতিতে হবার জন্য ছয়টি বিষয়ের উপর খেয়াল রাখতে হবে। সেগুলো হলো(১) কারণ : (যেমন চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের কারণে সালাত আছে কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল এর জন্ম বা মৃত্যুর কারণে কোন ‘ইবাদাত নেই, তাই সেখানে ‘ইবাদাত না করা)।(২) প্রকার : (যত প্রকার মহিলাকে বিবাহ করা হারাম তত প্রকার ব্যতীত অন্য সকল প্রকার নারীকে বিবাহ বৈধ, কিংবা যত প্রকারের জানোয়ার আল্লাহ্র রাসূল কুরবানী করেছেন সেগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকা, যেমন আল্লাহ্র রাসূল ঘোড়া কুরবানী করেননি বা মোরগ মুরগী কুরবানী করেননি তাই তা না করা)।(৩) পরিমাণ : (যতটুকু করেছেন তারচেয়ে কম বা বেশী না করা, যেমন যুহরের চার রাকা‘আতে স্থলে ৩ বা ৫ করা যাবে না)।(৪) সময় : (যে সময়ে করেছেন সে সময়ে করা, যেমন সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করা, যুহরের সালাতে ‘আসরের সময় আর ‘আসরের সালাত যুহরে আদায় না করা)।(৫) স্থান : (যে স্থানে করেছেন, যেমন হাজ্জের মীকাত, মীনায় অবস্থান, ‘আরফায় অবস্থান, ফরজ সালাত মসজিদে আদায় ইত্যাদি)।(৬) পদ্ধতি : (যে ভাবে করেছেন সেভাবেই করতে হবে, পদ্ধতি পরিবর্তন না করা)।
সহীহ বুখারী হাদিস ২৬৯৭-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে নবী صلى الله عليه وسلم বলেছেন, কেউ আমাদের এ শরীয়তে নেই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত। কথাটি ছোট, কিন্তু দ্বীনের অনুসরণে খুব বড় মূলনীতি। ইবাদত ও ধর্মীয় আমলে নিজের পছন্দমতো নতুন কিছু যোগ করা নিরাপদ পথ নয়। মুসলিমের কাজ হলো কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত পথে চলা। এই হাদিসে দুনিয়ার সাধারণ আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা নয়; বরং শরীয়তের ভেতর এমন বিষয় ঢোকানো নিয়ে সতর্কতা এসেছে, যা দ্বীনের অংশ হিসেবে চালু করা হয় অথচ শরীয়তে নেই। তাই বিদআত সম্পর্কে হাদিসটি আমাদের শেখায়—ভালো নিয়ত থাকলেও আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নবী صلى الله عليه وسلم-এর শেখানো পথের সঙ্গে মিল থাকা জরুরি।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- শরীয়তে নেই এমন ধর্মীয় সংযোজন প্রত্যাখ্যাত।
- ইবাদতে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ জরুরি।
- ভালো নিয়ত থাকলেও আমলের ভিত্তি সঠিক হতে হবে।
- দ্বীনের নামে নতুন কিছু চালুর আগে প্রমাণ দেখা দরকার।
