সফরের নামাজ
মোট হাদিস ১৪৪
সফরের নামাজ আদায়ের সঠিক নিয়ম ও সহীহ হাদিস
ইসলাম সফর বা ভ্রমণের সময় মহান আল্লাহর ইবাদত সহজ করার জন্য বিশেষ সুযোগ দিয়েছে। বর্ণিত হাদিসগুলো থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিভিন্ন বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ করে সফর বা ভ্রমণের সময় দুই ওয়াক্তের সালাত একত্রে আদায় করতেন। বিদায় হজ্জের সময় তিনি মাগরিব ও ইশার নামাজ একত্রে আদায় করেছিলেন। আবার কখনো মদীনায় অবস্থানকালে বৃষ্টির রাতে কিংবা তাবুক যুদ্ধের সফরে যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ইশা নামাজ একত্রে বা মিলিয়ে পড়েছেন। এছাড়া সফরে রওনা হওয়ার সময়ের ওপর ভিত্তি করেও তিনি নামাজ একত্র করতেন। যেমন, সূর্য ঢলে পড়ার আগে রওনা হলে যোহর বিলম্বে আসরের সাথে পড়তেন, আর পরে রওনা হলে যোহর পড়ে যাত্রা শুরু করতেন। ইসলামের এই সহজ নিয়মগুলো আমাদের সফরের নামাজ আদায়কে সহজ ও সুন্দর করে তোলে।
حَدَّثَنَا أَبُو مَعْمَرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ، قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَبِي إِسْحَاقَ، قَالَ سَمِعْتُ أَنَسًا، يَقُولُ خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ ﷺ مِنَ الْمَدِينَةِ إِلَى مَكَّةَ، فَكَانَ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ رَكْعَتَيْنِ حَتَّى رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ. قُلْتُ أَقَمْتُمْ بِمَكَّةَ شَيْئًا قَالَ أَقَمْنَا بِهَا عَشْرًا.
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আমরা নবী (ﷺ)-এর সাথে মদীনা হতে মক্কার উদ্দেশে বের হলাম। মদীনা ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি দু’রাক’আত, দু’রাক’আত সালাত আদায় করেছেন। (রাবী বলেন) আমি (আনাস রাঃ)-কে বললাম, আপনারা (হজ্জকালীন সময়) মক্কায় কয় দিন অবস্থান করেছিলেন? তিনি বললেন, সেখানে আমরা দশ দিন অবস্থান করেছিলাম।
حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، وَإِبْرَاهِيمَ بْنِ مَيْسَرَةَ، عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ صَلَّيْتُ الظُّهْرَ مَعَ النَّبِيِّ ﷺ بِالْمَدِينَةِ أَرْبَعًا، وَبِذِي الْحُلَيْفَةِ رَكْعَتَيْنِ.
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আমি আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে মদীনায় যুহরের সালাত চার রাক’আত আদায় করেছি এবং যুল-হুলাইফায় আসরের সালাত দু’ রাক’আত আদায় করেছি।
حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ، حَدَّثَنَا حَرْبٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى، قَالَ حَدَّثَنِي حَفْصُ بْنُ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَنَسٍ، أَنَّ أَنَسًا ـ رضى الله عنه ـ حَدَّثَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ كَانَ يَجْمَعُ بَيْنَ هَاتَيْنِ الصَّلاَتَيْنِ فِي السَّفَرِ. يَعْنِي الْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ.
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আল্লাহ্র রাসূল (ﷺ) সফরে এ দু’ সালাত একত্রে আদায় করতেন অর্থাৎ মাগরিব ও ‘ইশা।
أَبُوْ نُعَيْمٍ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ ح حَدَّثَنَا قَبِيْصَةُ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِيْ إِسْحَاقَ عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ أَقَمْنَا مَعَ النَّبِيِّ ﷺ عَشْرًا نَقْصُرُ الصَّلَاةَ.
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে মক্কায় দশদিন অবস্থান করেছিলাম। সে সময় আমরা সালাত কসর করতাম।
[৭২] আল্লাহ তা'আলা আল-কুরানে ঘোষণা দিয়েছেন- ''যখন তোমরা যমীনে ভ্রমণ করবে তখন সালাত কসর করলে তাতে কোন সমস্যা নেই।'' (সূরা অন-নিসাঃ ১০১) উক্ত আয়াতে এরূপ প্রমাণ মিলে না যে, কি পরিমাণ সফর করলে কসর করা যাবে। এ কারণেই সহাবীগণের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। ইবনু 'উমার ও ইবনু 'আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, 'তাঁরা চার বুরুদ (১৬ ফারসাখ সমান ৪৮ মাইল) পরিমাণ সফর করলে সালাত কসর করতেন এবং সাওম ভেঙ্গে দিতেন। পক্ষান্তরে ইবনু 'উমার হতে সহীহ বর্ণনায় সাব্যস্ত হয়েছে তিনি বলেন, "তিন মাইল সফর করলে সালাত কসর করা যাবে''। সহীহ সানাদে তাঁর থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে, 'তিনি মাক্কায় অবস্থানকালীন যখন মিনায় যেতেন তখন কসর করতেন'। এমনকি সহীহ সুত্রে ইবনু 'উমার হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, 'আমি যদি এক মাইল পথের জন্য বের হতাম তাহলেও সালাত করতাম'। তিনি আরো বললেন, আমি দিনের কিছু সময় সফর করতাম এবং কসর করতাম। এসব আসারের সুত্রগুলো সহীহ। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন ''ফাতহুল বারী'' ও শাইখ আলবানীর ''ইরওয়াউল গালীল'' (৩/১৪-২০) এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, সহাবীগণ এ বিষয়ে একমত ছিলেন না। বরং তাঁদের মধ্যে মতভেদ সংঘটিত হয়েছিল। অতএব আমাদেরকে দেখা দরকার এ ব্যাপারে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর 'আমল কি ছিল? আমরা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর 'আমলের এর দিকে লক্ষ্য করলে দেখছি ইবনু 'উমর (রাঃ) এর 'আমল তাঁর 'আমলের সাথে অনেকাংশেই মিলে যাচ্ছে। যদিও তাঁর থেকে এ ব্যাপারে কোন মৌখিক হাদীস বর্ণিত হয়নি। কারণ আনাস (রাঃ) নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আমল বর্ণনা করেছেন। ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াযিদ আল হুনাই বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে কসর করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিন মাইল বা তিন ফারসাখ পরিমাণ পথ সফর করলেই দু'রাক'আত সালাত আদায় করতেন। (নিম্নের বর্ণনাকারী শু'বাহ সন্দেহ বশতঃ তিন মাইল বা তিন ফারসাখ বলেছেন)। হাদীসটি ইমাম মুসলিম (২/১৪৫), আবু আওয়ানাহ (২/৩৪৬), আবু দাউদ, ইবনু আবী শাইবাহ (২/১০৮/১-২), বায়হাক্বী (৩/১৪৬) ও আহমাদ (৩/১২৯) বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ এক ফারসাখ সমান তিন মাইল। অতএব তিন ফারসাখ সমান ৯ মাইল। যেহেতু মুসলিম সহ অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত এ হাদীসটিতে তিন মাইল বা ৯ মাইল এর কথা বলা হয়েছে। যা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর 'আমল হিসেবে প্রমাণিত। অতএব আমরা সতর্কতার স্বার্থে তিন মাইল গ্রহণ না করে ৯ মাইলকে গ্রহণ করব এবং ৯ মাইল পরিমাণ পথ সফর করলেই নির্দ্বিধায় সালাত কসর করব। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন ফিকহুস সুন্নাহ ইরওয়াউল গালীল ৩য় খণ্ড ফতহুল বারী প্রমুখ গ্রন্থসমূহের সালাত অধ্যায়। (দেখুন মুসলিম হাঃ নং ৬৯১, সহীহ আবূ দাউদ ১২০১, আহমাদ ১১৯০৪, সিলসিলা সহীহা হাঃ নং ১৬৩)
أَخْبَرَنِي عَمْرُو بْنُ سَوَّادِ بْنِ الْأَسْوَدِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: أَنْبَأَنَا ابْنُ وَهْبٍ قَالَ: حَدَّثَنَا جَابِرُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ أَنَسٍ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَنَّهُ كَانَ إِذَا عَجِلَ بِهِ السَّيْرُ يُؤَخِّرُ الظُّهْرَ إِلَى وَقْتِ الْعَصْرِ فَيَجْمَعُ بَيْنَهُمَا، وَيُؤَخِّرُ الْمَغْرِبَ حَتَّى يَجْمَعَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ الْعِشَاء حَتَّى يَغِيبَ الشَّفَقُ»
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আনাস (রাঃ)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে বর্ণিত। সফরে তাড়া থাকলে তিনি যুহরের সালাত 'আসর পর্যন্ত দেরি করতেন। তারপর উভয় সালাতকে একত্রে পড়তেন এবং মাগরিবকে দেরি করে মাগরিব ও 'ইশাকে একত্রে পড়তেন।
أَخْبَرَنَا قُتَيْبَةُ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِي إِسْحَقَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: «خَرَجْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْمَدِينَةِ إِلَى مَكَّةَ فَلَمْ يَزَلْ يَقْصُرُ حَتَّى رَجَعَ فَأَقَامَ بِهَا عَشْرًا»
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে মাদীনাহ্ থেকে মাক্কাহ্ অভিমুখে বের হলাম। তিনি প্রত্যাবর্তন করা পর্যন্ত সর্বদাই সালাত সংক্ষিপ্তভাবে আদায় করতেন। তিনি মাক্কায় দশদিন অবস্থান করেছিলেন।
أَخْبَرَنَا إِسْحَقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ: أَنْبَأَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، قَالَ: حَدَّثَنَا مَعْمَرٌ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «احْتَجَمَ وَهُوَ مُحْرِمٌ عَلَى ظَهْرِ الْقَدَمِ مِنْ وَثْءٍ كَانَ بِهِ»
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পায়ের উপরিভাগে যে ব্যথা ছিল তার জন্য তিনি (ﷺ) ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছিলেন।
حَدَّثَنَا أَبُو النُّعْمَانِ، قَالَ حَدَّثَنَا حَمَّادٌ ـ هُوَ ابْنُ زَيْدٍ ـ عَنْ عَمْرِو بْنِ دِينَارٍ، عَنْ جَابِرِ بْنِ زَيْدٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ صَلَّى بِالْمَدِينَةِ سَبْعًا وَثَمَانِيًا الظُّهْرَ وَالْعَصْرَ، وَالْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ. فَقَالَ أَيُّوبُ لَعَلَّهُ فِي لَيْلَةٍ مَطِيرَةٍ. قَالَ عَسَى.
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মদীনায় অবস্থানকালে (একবার) যুহর ও আসরের আট রাক’আত এবং মাগরিব ও ইশার সাত রাক’আত একত্রে মিলিত আদায় করেন। আইয়ূব (রহঃ) বলেন, সম্ভবত এটা বৃষ্টির রাতে হয়েছিল। জাবির (রহঃ) বললেন, সম্ভবত তাই।
[১] ঝড় বৃষ্টি কিংবা শঙ্কা থাকলে যুহর-আসর এবং মাগরিব-ইশা সালাতকে একসাথে পরপর আদায় করা জায়েজ। সফর অবস্থাতেও যুহর ও আসর কসর করে যুহরের ওয়াক্তে কিংবা আসরের ওয়াক্তে আদায় করা জায়েজ। অনুরূপ অবস্থায় মাগরিবের তিন রাক’আত ও পরক্ষণেই ইশার দু’রাক’আত একসঙ্গে আদায় করা সুন্নাত।
حَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ دِينَارٍ، قَالَ سَمِعْتُ جَابِرَ بْنَ زَيْدٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ صَلَّى النَّبِيُّ ﷺ سَبْعًا جَمِيعًا وَثَمَانِيًا جَمِيعًا.
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) (মাগরিব ও ইশার) সাত রাক’আত ও (যুহর ও আসরের) আট রাক’আত একত্রে আদায় করেছেন।
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ عَاصِمٍ، وَحُصَيْنٍ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ أَقَامَ النَّبِيُّ ﷺ تِسْعَةَ عَشَرَ يَقْصُرُ، فَنَحْنُ إِذَا سَافَرْنَا تِسْعَةَ عَشَرَ قَصَرْنَا، وَإِنْ زِدْنَا أَتْمَمْنَا.
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
নবী (ﷺ) একদা সফরে উনিশ দিন পর্যন্ত অবস্থান কালে সালাত কসর করেন। সেহেতু আমরাও উনিশ দিনের সফরে থাকলে কসর করি এবং এর চেয়ে অধিক হলে পূর্ণ সালাত আদায় করি।
