৪/৩০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ১১৯৫-[২৯] - তাহাজ্জুদের নূরের দোয়া
সুন্নাত ও এর ফজিলত - তৃতীয় অনুচ্ছেদ
তাহাজ্জুদের নূরের দোয়া ও রাতের সালাতের আমল
মিশকাতুল মাসাবীহ : ১১৯৫-[২৯]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ১১৯৫-[২৯]
وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: بِتُّ عِنْدَ خَالَتِي مَيْمُونَةَ لَيْلَةً وَالنَّبِيُّ ﷺ عِنْدَهَا فَتَحَدَّثَ رَسُولُ اللّهِ ﷺ مَعَ أَهْلِه سَاعَةً ثُمَّ رَقَدَ فَلَمَّا كَانَ ثُلُثُ اللَّيْلِ الْاخِرُ أَوْ بَعْضُهُ قَعَدَ فَنَظَرَ إِلَى السَّمَاءِ فَقَرَأَ: ﴿إِنَّ فِيْ خَلْقِ السَّموتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَأَۤيَاتٍ لِّأُوْلِي الْأَلْبَابِ﴾ [آل عمران 3 : 190] حَتّى خَتَمَ السُّورَةَ ثُمَّ قَامَ إِلَى الْقِرْبَةِ فَأَطْلَقَ شِنَاقَهَا ثُمَّ صَبَّ فِي الْجَفْنَةِ ثُمَّ تَوَضَّأَ وُضُوءًا حَسَنًا بَيْنَ الْوُضُوْءَيْنِ لَمْ يُكْثِرْ وَقَدْ أَبْلَغَ فَقَامَ فَصَلّى فَقُمْتُ وَتَوَضَّأْتُ فَقُمْتُ عَنْ يَسَارِه فَأَخَذَ بِأُذُنِي فَأَدَارَنِي عَنْ يَمِيْنِه فَتَتَامَّتْ صَلَاتُه ثَلَاثَ عَشْرَةَ رَكْعَةً ثُمَّ اضْطَجَعَ فَنَامَ حَتّى نَفَخَ وَكَانَ إِذَا نَامَ نَفَخَ فَآذَنَه بِلَالٌ بِالصَّلَاةِ فَصَلّى وَلَمْ يَتَوَضَّأْوَكَانَ فِي دُعَائِه: «اللّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا وَّفِي بَصَرِىْ نُورًا وَّفِي سَمْعِي نُورًا وَّعَنْ يَّمِينِىْ نُورًا وَّعَنْ يَّسَارِىْ نُورًا وَّفَوْقِي نُورًا وَّتَحْتِىْ نُوْرًا وَّأَمَامِىْ نُوْرًا وَّخَلْفِىْ نُورًا وَّاجْعَلْ لِّىْ نُورًا» وَزَادَ بَعْضُهُمْ: «وَفِي لِسَانِي نُورًا» وَذُكِرَ: «وَعَصَبِىْ وَلَحْمِىْ وَدَمِىْ وَشَعْرِىْ وَبَشَرِىْ). (مُتَّفق عَلَيْهِ)وَفِي رِوَايَةٍ لَهُمَا: «وَاجْعَلْ فِي نَفْسِي نُورًا وَّأَعْظِمْ لِي نُورًا» وَفِي أُخْرى لِمُسْلِمٍ: «اللّهُمَّ أَعْطِنِىْ نُوْرًا
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
একবার আমি আমার খালা উম্মুল মু'মিনীন মায়মূনাহ্ (রাঃ)-এর বাড়ীতে রাত কাটালাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সে রাত্রে তাঁর বাড়ীতে ছিলেন। 'ইশার পর কিছু সময় তিনি তাঁর স্ত্রী মায়মূনার সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। তারপর শুয়ে পড়েন। রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশে অথবা রাতের কিছু সময় অবশিষ্ট থাকতে তিনি সজাগ হলেন।আকাশের দিকে লক্ষ করে এ আয়াত পাঠ করলেন : إِنَّ فِيْ خَلْقِ السَّموتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَأَۤيَاتٍ لِّأُوْلِي الْأَلْبَابِ অর্থাৎ "আকাশ ও জমিন সৃষ্টি করা, রাত ও দিনের ভিন্নতার (কখনো অন্ধকার কখনো আলোকিত, কখনো গরম কখনো শীত, কখনো বড়ো কখনো ছোট) মাঝে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্যে আল্লাহর নিদর্শন"-(সূরা আলি 'ইমরান ৩ : ১৯০)তিনি সূরাটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করেন। তারপর উঠে তিনি পাত্রের কাছে গেলেন। এর বাঁধন খুললেন। পাত্রে পানি ঢাললেন। তারপর দুই ওজুর মাঝে মধ্যম ধরনের ভাল ওজু করলেন। হাদীস বর্ণনাকারী বলেন, (মধ্যম ধরনের ওজুর অর্থ) খুব অল্প পানি খরচ করলেন। তবে শরীরে দরকারী পানি পৌঁছিয়েছেন। তারপর তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে লাগলেন।(এসব দেখে) আমি নিজেও উঠলাম। অতঃপর ওজু করে তাঁর বাম পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার কান ধরে তাঁর বাম পাশ থেকে ঘুরিয়ে এনে আমাকে তাঁর ডান পাশে দাঁড় করালেন। তাঁর তের রাকাত সালাত আদায় করা শেষ হলে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। শুয়ে পড়লে তিনি নাক ডাকতেন। তাই তাঁর নাক ডাকা শুরু হলো। ইতোমধ্যে বেলাল এসে সালাত প্রস্তুতির ঘোষণা দিলেন। তিনি সালাত আদায় করালেন। কোন ওজু করলেন না।তাঁর দোয়ার মাঝে ছিল, "আল্ল-হুম্মাজ্'আল ফী ক্বলবী নূরাওঁ ওয়াফী বাসারী নূরাওঁ ওয়াফী সাম্'ঈ নূরাওঁ ওয়া'আই ইয়ামীনী নূরাওঁ ওয়া'আই ইয়াসা-রী নূরাওঁ ওয়া ফাওক্বী নূরাওঁ ওয়া তাহ্তী নূরাওঁ ওয়া আমা-মী নূরাওঁ ওয়া খলফী নূরাওঁ ওয়াজ্'আল্ লী নূরা-" (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমার হৃদয়ে, আমার চোখে, আমার কানে, আমার ডানে, আমার বামে, আমার উপরে, আমার নিচে, আমার সম্মুখে, আমার পেছনে নূর দিয়ে ভরে দাও। আমার জন্যে কেবল নূরই নূর সৃষ্টি করে দাও।)কোন কোন বর্ণনাকারী এ শব্দগুলোও নকল করেছেন, "ওয়াফী লিসা-নী নূরা-" (অর্থাৎ- আমার জিহবায় নূর পয়দা করে দাও)। (অন্য বর্ণনায় এ শব্দগুলোও) উল্লেখ করেছেন, "ওয়া 'আসাবী ওয়া লাহ্মী ওয়াদামী ওয়া শা'রী ওয়া বাশারী" (অর্থাৎ- আমার শিরা উপশিরায়, আমার গোশতে, আমার রক্তে, আমার পশমে, আমার চামড়ায় নূর তৈরী করে দাও)।(বুখারী, মুসলিম) বুখারী ও মুসলিমেরই আর এক বিবরণে এ শব্দগুলোও আছে, "ওয়াজ্'আল ফী নাফ্সী নূরাওঁ ওয়া আ'যিম লী নূরা-" (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমার মনের মধ্যে নূর সৃষ্টি করে দাও এবং আমার মাঝে নূর বাড়িয়ে দাও)। মুসলিমের এক বিবরণে আছে, "আল্ল-হুম্মা আ'ত্বিনী নূরা-" (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি আমাকে নূর দান করো)।
[১] সহীহ : বুখারী ৬৩১৬, মুসলিম ৭৬৩।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ১১৯৫-[২৯]-এর সারসংক্ষেপ
ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর এই দীর্ঘ বর্ণনায় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর রাতের সালাতের বিস্তারিত ছবি এসেছে। তিনি মায়মূনাহ (রাঃ)-এর ঘরে রাত কাটান। নবী (সা.) ইশার পর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন, তারপর ঘুমান। রাতের শেষ অংশে জেগে আকাশের দিকে তাকিয়ে সূরা আলে ইমরানের আয়াত পাঠ করেন। এরপর অল্প পানি খরচ করে ভালোভাবে ওযু করেন এবং সালাতে দাঁড়ান। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বাম পাশে দাঁড়ালে তিনি তাকে ডান পাশে নিয়ে আসেন। তের রাকআত শেষ করে ঘুমান, পরে বিলাল (রাঃ) ডাকলে নতুন ওযু ছাড়া সালাত আদায় করেন। দোয়ায় তিনি হৃদয়, চোখ, কান, ডান-বাম, সামনে-পেছনে এবং নিজের জন্য নূর চেয়েছেন। এই হাদিস তাহাজ্জুদ, ওযু, ইমামের ডান পাশে দাঁড়ানো এবং নূরের দোয়া—সব বিষয়ে সমৃদ্ধ।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- রাতের শেষ অংশে কুরআন পাঠ, ওযু ও সালাতের বর্ণনা এসেছে।
- একজন মুক্তাদি একা হলে ইমামের ডান পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পাওয়া যায়।
- নবী (সা.) দোয়ায় নিজের জন্য নূর চেয়েছেন।
- ইবাদতের আগে পরিবারে স্বাভাবিক কথাবার্তার বর্ণনাও আছে।
