৬৫/১৭১. অধ্যায়ঃ
সহীহ বুখারী হাদিস ৪৬৭৭ - তাবুকের তিন সাহাবির তাওবা
আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ আর ঐ তিন ব্যক্তির প্রতিও তিনি কৃপাদৃষ্টি করলেন যাদের ব্যাপার (তাওবা) স্থগিত রাখা হয়েছিল। এমনকি যখন যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের উপর সংকুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবনও তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়ল। আর তারা বুঝতে পারল যে, আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া ব্যতীত কোন আশ্রয় পাওয়ার উপায় নেই, তখন তিনি তাদের প্রতি কৃপাদৃষ্টি করলেন, যাতে তারা তাওবা করে। নিশ্চয় আল্লাহই মহান তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (সূরা বারাআত ৯/১১৮)
তাবুকের তিন সাহাবির তাওবা ও সত্যের জয়
সহীহ বুখারী : ৪৬৭৭
সহীহ বুখারীহাদিস নম্বর ৪৬৭৭
مُحَمَّدٌ حَدَّثَنَا أَحْمَدُ ابْنُ أَبِيْ شُعَيْبٍ حَدَّثَنَا مُوْسَى بْنُ أَعْيَنَ حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ رَاشِدٍ أَنَّ الزُّهْرِيَّ حَدَّثَهُ قَالَ أَخْبَرَنِيْ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَبْدِ اللهِ بْنِ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ سَمِعْتُ أَبِيْ كَعْبَ بْنَ مَالِكٍ وَهُوَ أَحَدُ الثَلَاثَةِ الَّذِيْنَ تِيْبَ عَلَيْهِمْ أَنَّهُ لَمْ يَتَخَلَّفْ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فِيْ غَزْوَةٍ غَزَاهَا قَطُّ غَيْرَ غَزْوَتَيْنِ غَزْوَةِ الْعُسْرَةِ وَغَزْوَةِ بَدْرٍقَالَ فَأَجْمَعْتُ صِدْقِيْ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ ضُحًى وَكَانَ قَلَّمَا يَقْدَمُ مِنْ سَفَرٍ سَافَرَهُ إِلَّا ضُحًى وَكَانَ يَبْدَأُ بِالْمَسْجِدِ فَيَرْكَعُ رَكْعَتَيْنِ وَنَهَى النَّبِيُّ ﷺ عَنْ كَلَامِيْ وَكَلَامِ صَاحِبَيَّ وَلَمْ يَنْهَ عَنْ كَلَامِ أَحَدٍ مِنَ الْمُتَخَلِّفِيْنَ غَيْرِنَا فَاجْتَنَبَ النَّاسُ كَلَامَنَا فَلَبِثْتُ كَذَلِكَ حَتَّى طَالَ عَلَيَّ الْأَمْرُ وَمَا مِنْ شَيْءٍ أَهَمُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَمُوْتَ فَلَا يُصَلِّيْ عَلَيَّ النَّبِيُّ ﷺ أَوْ يَمُوْتَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ فَأَكُوْنَ مِنْ النَّاسِ بِتِلْكَ الْمَنْزِلَةِ فَلَا يُكَلِّمُنِيْ أَحَدٌ مِنْهُمْ وَلَا يُصَلِّيْ وَلَا يُسَلِّمُ عَلَيَّفَأَنْزَلَ اللهُ تَوْبَتَنَا عَلَى نَبِيِّهِ ﷺ حِيْنَ بَقِيَ الثُّلُثُ الْآخِرُ مِنْ اللَّيْلِ وَرَسُوْلُ اللهِ ﷺ عِنْدَ أُمِّ سَلَمَةَ وَكَانَتْ أُمُّ سَلَمَةَ مُحْسِنَةً فِيْ شَأْنِيْ مَعْنِيَّةً فِيْ أَمْرِيْ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ يَا أُمَّ سَلَمَةَ تِيْبَ عَلَى كَعْبٍ قَالَتْ أَفَلَا أُرْسِلُ إِلَيْهِ فَأُبَشِّرَهُ قَالَ إِذًا يَحْطِمَكُمْ النَّاسُ فَيَمْنَعُوْنَكُمْ النَّوْمَ سَائِرَ اللَّيْلَةِ حَتَّى إِذَا صَلَّى رَسُوْلُ اللهِ ﷺ صَلَاةَ الْفَجْرِ آذَنَ بِتَوْبَةِ اللهِ عَلَيْنَا وَكَانَ إِذَا اسْتَبْشَرَ اسْتَنَارَ وَجْهُهُ حَتَّى كَأَنَّهُ قِطْعَةٌ مِنَ الْقَمَرِ وَكُنَّا أَيُّهَا الثَلَاثَةُ الَّذِيْنَ خُلِّفُوْا عَنِ الْأَمْرِ الَّذِيْ قُبِلَ مِنْ هَؤُلَاءِ الَّذِيْنَ اعْتَذَرُوْا حِيْنَ أَنْزَلَ اللهُ لَنَا التَّوْبَةَ فَلَمَّا ذُكِرَ الَّذِيْنَ كَذَبُوْا رَسُوْلَ اللهِ ﷺ مِنَ الْمُتَخَلِّفِيْنَ وَاعْتَذَرُوْا بِالْبَاطِلِ ذُكِرُوْا بِشَرِّ مَا ذُكِرَ بِهِ أَحَدٌ قَالَ اللهُ سُبْحَانَهُ ﴾يَعْتَذِرُوْنَ إِلَيْكُمْ إِذَا رَجَعْتُمْ إِلَيْهِمْ طقُلْ لَّا تَعْتَذِرُوْا لَنْ نُّؤْمِنَ لَكُمْ قَدْ نَبَّأَنَا اللهُ مِنْ أَخْبَارِكُمْ طوَسَيَرَى اللهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُوْلُه”﴿ الْآيَةَ.
কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আমার পিতা কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে শুনেছি, যে তিনজনের তাওবাহ কবূল হয়েছিল, তার মধ্যে তিনি একজন। তিনি বাদ্রের যুদ্ধ ও তাবূকের যুদ্ধ এ দু’টি ব্যতীত অন্য কোন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পশ্চাতে থাকেননি। কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাবূক যুদ্ধ হতে সূর্যোদয়ের সময় মদিনায় ফিরে আসলে আমি (মিথ্যার পরিবর্তে) সত্য প্রকাশের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করলাম। তিনি [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)] যে কোন সফর হতে সাধারণত সূর্যোদয়ের সময় ফিরে আসতেন এবং সর্বপ্রথম মসজিদে গিয়ে দু’রাক‘আত নাফল সালাত আদায় করতেন।(তাবূকের যুদ্ধ থেকে এসে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার সঙ্গে এবং আমার সঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন, অথচ আমাদের ব্যতীত অন্য যারা যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত ছিল, তাদের সঙ্গে কথা বলায় কোন প্রকার বাধা প্রদান করলেন না। সুতরাং লোকেরা আমাদের সঙ্গে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে লাগলেন। আমার কাছে সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল যে, যদি এ অবস্থায় আমার মৃত্যু এসে যায়, আর নবী (ﷺ) আমার জানাযাহ্র সালাত আদায় না করেন, অথবা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাত হলে আমি মানুষের কাছে এই অবস্থায় থেকে যাব তারা কেউ আমার সঙ্গে কথাও বলবে না, আর আমার জানাযার সালাতও আদায় করবে না।এরপর (পঞ্চাশ দিন পর) আল্লাহ তা‘আলা আমার তওবা কবূল করে তাঁর [নবী (ﷺ)-এর] প্রতি আয়াত অবতীর্ণ করেন। তখন রাতের শেষ-তৃতীয়াংশ বাকী ছিল। সে রাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর কাছে ছিলেন, উম্মু সালামাহ (রাঃ) আমার প্রতি সদয় ও সহানুভূতিশীল ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে উম্মু সালামাহ! কা‘বের তাওবাহ কবূল করা হয়েছে। উম্মু সালামাহ (রাঃ) বললেন, তাকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য কাউকে তার কাছে পাঠাব? নবী (ﷺ) বললেন, এখন খবর পেলে সব লোক এসে জমা হয়ে যাবে। তারা তোমাদের ঘুম নষ্ট করে দিবে।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফাজ্রের সালাত আদায়ের পর আমাদের তওবা কবূল হওয়ার কথা ঘোষণা করে দিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারা খুশীতে এমন চমকাচ্ছিল যেন চাঁদের টুকরা। যেসব মুনাফিক মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অসন্তুষ্টি থেকে] রেহাই পেয়েছিল, তাদের চেয়ে তাওবাহ কবূলের ব্যাপারে আমরা তিনজন পিছনে পড়ে গিয়েছিলাম, এরপর আল্লাহ তা‘আলা আমাদের তওবা কবূল করে আয়াত অবতীর্ণ করেন। (তাবূকের যুদ্ধে) অনুপস্থিতদের মধ্যে যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে মিথ্যা কথা বলেছে এবং যারা মিথ্যা অজুহাত দেখিয়েছে তাদের জঘন্যভাবে নিন্দাবাদ করা হয়েছে।আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, “তারা তোমাদের কাছে ওযর পেশ করবে যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে আসবে। আপনি বলে দিন ঃ তোমরা ওযর পেশ করো না, আমরা কখনও তোমাদের বিশ্বাস করব না; আল্লাহ তো আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন তোমাদের খবর; আর ভবিষ্যতেও আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য রাখবেন এবং তাঁর রাসূলও” (সূরা বারাআত ৯/৯৪)।
সহীহ বুখারী হাদিস ৪৬৭৭-এর সারসংক্ষেপ
এই দীর্ঘ হাদিসে কা‘ব ইবন মালিক (রাঃ)-এর তাবুক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকার ঘটনা এসেছে। তিনি বলেন, বদর ও তাবুক ছাড়া অন্য কোনো যুদ্ধে তিনি নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর পিছনে থাকেননি। নবী (صلى الله عليه وسلم) সফর থেকে ফিরলে সাধারণত সকালে মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত সালাত পড়তেন। কা‘ব (রাঃ) তখন মিথ্যা অজুহাত না দিয়ে সত্য বলার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর নবী (صلى الله عليه وسلم) তাঁর ও দুই সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা নিষিদ্ধ করেন। মানুষও কথা বলা বন্ধ করে দেয়। এই কষ্ট দীর্ঘ হয়। শেষে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাঁদের তাওবা কবুল করেন। ফজরের পর নবী (صلى الله عليه وسلم) সেই সুসংবাদ জানান, আর তাঁর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হাদিসটি সত্যবাদিতা, ধৈর্য ও তাওবার গভীর শিক্ষা দেয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- সত্য বলা কা‘ব (রাঃ)-এর তাওবার পথে বড় কারণ ছিল।
- সমাজের বর্জন তাঁদের জন্য কঠিন পরীক্ষা হয়েছিল।
- আল্লাহ তাঁদের তাওবা কবুল করার পর নবী (صلى الله عليه وسلم) সুসংবাদ ঘোষণা করেন।
