৬/০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ১৭৭২-[১] - দাওয়াত, সালাত ও যাকাতের ধাপে ধাপে শিক্ষা
যাকাত - প্রথম অনুচ্ছেদ
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেনঃ যাকাত ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। এটা শারী‘আতের একটি শক্তিশালী বিষয়। যে ব্যক্তি যাকাতের ফারযিয়্যাতকে অমান্য করবে সে কাফির হয়ে যাবে। যাকাতের লাগবী অর্থ বৃদ্ধি, বারাকাত ও পবিত্র করা। যাকাত আদায় করলে মাল বৃদ্ধি পায় ও মাল পবিত্র হয়। আর যাকাত আদায়কারী গুনাহ থেকে পবিত্র হয়। আর যাকাতের শার‘ঈ অর্থ হলো নিসাব পূর্ণ সম্পদে এক বৎসর অতিবাহিত হলে তা ফকীর, মিসকীন ও অন্যান্যদের মাঝে নির্ধারিত পন্থায় আদায় করা।অতঃপর যাকাতের রুকন, কারণ হিকমাত ও শর্ত রয়েছে। তা ফরয হওয়ার কারণ হলো মালের মালিক হওয়া। যাকাতের শর্ত হলো (মালের ক্ষেত্রে) নিসাব পরিমাণ হওয়া, বৎসর পূর্ণ হওয়া এবং (ব্যক্তির ক্ষেত্রে) বালেগ ও স্বাধীন হওয়া। হিকমাত হলো দুনিয়ার কর্তব্য পালন হওয়া এবং আখিরাতের সাওয়াব ও দরজা অর্জন হওয়া। আর গুনাহ হতে পবিত্র হওয়া এবং কৃপণতার দায় থেকে বাঁচা।প্রকাশ থাকে যে, অধিকাংশ ‘উলামাদের মতে যাকাত হিজরতের পর ফরয হয়। তারা দ্বিতীয় হিজরীতে ফরয হওয়ার মত ব্যক্ত করেন। কেউ কেউ বলেন, হিজরতের পূর্বে ফরয হয়েছে।
মু‘আয (রা.)-কে যাকাত ও দাওয়াতের নববী নির্দেশনা
মিশকাতুল মাসাবীহ : ১৭৭২-[১]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ১৭৭২-[১]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللّهِ ﷺ بَعَثَ مُعَاذًا إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ: «إِنَّكَ تَأتِىْ قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ. فَادْعُهُمْ إِلى شَهَادَةِ أَنْ لَّا إِلهَ إِلَّا اللّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللّهِ. فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوْا لذَلِكَ. فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي الْيَوْمِ وَاللَّيْلَةِ. فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوْا لذلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَن الله قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنَ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ فِىْ فُقَرَائِهِمْ. فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ. فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّه لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ الله حِجَابٌ». (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ)-কে ইয়ামানে পাঠাবার সময় বললেন, মু’আয! তুমি আহলে কিতাবদের (ইয়াহূদী ও খৃস্টান) নিকট যাচ্ছো। প্রথমত তাদেরকে এ লক্ষ্যে দ্বীনের প্রতি আহ্বান করবে, এক আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল। যদি তারা এটা মেনে নেয় তাহলে তাদের সামনে এই ঘোষণা দেবে যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা তাদের ওপর দিনরাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফার্য করেছেন।তারা এটা মেনে নিলে তাদেরকে জানাবে, নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা তাদের ওপর যাকাত ফার্য করেছেন। তাদের ধনীদের কাছ থেকে তা গ্রহণ করে তাদের গরীবদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। যদি তারা এ হুকুমের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তাহলে তুমি (তাদের) ভাল ভাল মাল গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে, মাযলূমের ফরিয়াদ হতে বাঁচার চেষ্টা করবে। কেননা মাযলূমের ফরিয়াদ আর আল্লাহ তা’আলার মধ্যে কোন আড়াল থাকে না। (বুখারী, মুসলিম) [১]
[১] সহীহ : বুখারী ২১৪৯৬, মুসলিম ১৯, আবূ দাঊদ ১৫৮৪, আত্ তিরমিযী ৬২৫, নাসায়ী ২৫২২, ইবনু মাজাহ্ ১৭৮৩, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২২৭৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৭২৭৬, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১৫৫৭, ইরওয়া ৭৮২, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ২২৯৮।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ১৭৭২-[১]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) মু‘আয ইবনু জাবাল (রা.)-কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় দাওয়াতের ধাপ শিখিয়েছেন। প্রথমে আহলে কিতাবকে এক আল্লাহর ইবাদত এবং মুহাম্মাদ (صلى الله عليه وسلم)-এর রিসালাতের সাক্ষ্যের দিকে ডাকতে বলেছেন। তারা তা মানলে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের কথা জানাতে বলেছেন। এরপর যাকাত ফরয হওয়ার কথা জানাতে বলেছেন—ধনীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং গরীবদের মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এখানে যাকাত শুধু অর্থ আদায়ের বিষয় নয়; সমাজের দরিদ্রদের অধিকার পূরণের পথ। নবী (صلى الله عليه وسلم) আরও সতর্ক করেছেন, যাকাত নিতে গিয়ে মানুষের ভালো ভালো মাল বেছে নেওয়া যাবে না। আর মাযলূমের ফরিয়াদ থেকে বাঁচতে বলেছেন, কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো আড়াল নেই।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- দাওয়াতের শুরু তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়ে।
- সালাতের পর যাকাতের ফরয দায়িত্ব জানানো হয়েছে।
- যাকাত ধনীদের কাছ থেকে নিয়ে গরীবদের মধ্যে দেওয়া হবে।
- মাযলূমের ফরিয়াদ থেকে বাঁচতে কঠোর সতর্কতা এসেছে।
