১০/২. অধ্যায়ঃ

মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ২৩২৪-[২] - দিনে একশবার ইস্তিগফার

ক্ষমা ও তাওবা - প্রথম অনুচ্ছেদ

হাফেয বলেনঃالاستغفارশব্দটিالغفرانথেকে, যার মূলالغفرআর তা হল কোন জিনিসকে এমন কিছু পরিধান করানো যা তাকে ময়লাযুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। আর আল্লাহর তরফ থেকে বান্দাকে ক্ষমা করা বলতে বান্দাকে তাঁর শাস্তি থেকে রক্ষা করা।কারী বলেন,الاستغفارশব্দটি কখনো তাওবাকে শামিল করে আবার কখনো তাওবাকে শামিল করে না। এ জন্যالاستغفارশব্দের পরالتوبةশব্দ উল্লেখ করা হয়েছে। অথবাالاستغفارতথা ক্ষমা প্রার্থনা জবান দিয়ে হয়, পক্ষান্তরে তওবা্ অন্তর দিয়ে হয় আর তা হল অবাধ্যতা থেকে আনুগত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করা আর আল্লাহর তরফ থেকে বান্দাকে ক্ষমা করা বলতে ইহকালে বান্দার গুনাহ কাউকে অবহিত করা থেকে গোপন করে রাখা এবং পরকালে সে গুনাহের কারণে তাকে শাস্তি না দেয়া।ইমাম ত্বীবী বলেন, শারী‘আতের পরিভাষায় তওবা্ হল, পাপ দোষণীয় হওয়ার কারণে তা বর্জন করা, এবং কৃত বাড়াবাড়ির কারণে লজ্জিত হওয়া, অভ্যস্ত বিষয় বর্জন ও কর্মের ক্ষতিপূরণে নিজেকে দৃঢ় করে এমন কাজ করা। এটি রাগিবের উক্তি। ইমাম নাবাবী এক্ষেত্রে একটু বেশি বলেছেন, তিনি বলেন, গুনাহ যদি আদম সন্তানের সাথে সম্পর্কিত হয় তাহলে তার আরেকটি শর্ত আছে। আর তা হল, অবিচার করা পরিমাণ বিষয় তার মালিকের কাছে ফেরত দিতে হবে অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমা নিতে হবে।ইবনুল কইয়্যিম মাদারিজুস্ সালিকীন-এ ১ম খণ্ড- ১৬৯ পৃষ্ঠাতে সাধারণ তাওবার তাফসীরের আলোচনাতে বলেন, অনেক মানুষ তাওবার তাফসীর করে থাকেন কোন গুনাহ দ্বিতীয়বার না করার ব্যাপারে দৃঢ়তা ব্যক্ত করা এবং অবিলম্বে সে কাজ থেকে সরে আসা। অতীতের কাজের ব্যাপারে লজ্জিত হওয়া আর যদি ঐ গুনাহটি আদম সন্তানের অধিকার সংক্রান্ত হয় তাহলে চতুর্থ আরেকটি বিষয় প্রয়োজন তা হল আদম সন্তান থেকে ক্ষমা নেয়া।কতকে এ বিষয়টি তাওবার ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন বরং একে শর্ত করেছেন। আমার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কালামের ক্ষেত্রে তওবা্ হল, তা যেমন অনেক মানুষের উল্লেখিত সংজ্ঞাকে শামিল করে তেমনিভাবে নির্দেশিত কাজের ব্যাপারে দৃঢ়তাকে ও তা আঁকড়িয়ে ধরাকে শামিল করে। সুতরাং শুধুমাত্র কোন কাজ করা থেকে সরে আসা, কোন কাজ না করার ব্যাপারে দৃঢ়তা ব্যক্ত করা, কোন কৃতকর্মের ব্যাপারে লজ্জিত হওয়ার মাধ্যমে তওবা্ সংঘটিত হয় না বরং যতক্ষণ না কর্তার তরফ থেকে নির্দেশিত কাজের ব্যাপারে দৃঢ়তা পাওয়া যায়।এটিই হল তাওবার প্রকৃত রূপ। আর তা হল দু’টি বিষয়ের সমষ্টির নাম। কিন্তু তওবা্ যখন নির্দেশিত কাজের সাথে শামিল হবে তখন তা পূর্বে অনেকের উল্লেখিত সংজ্ঞার ভাষ্য হবে আর যখন তা আলাদাভাবে আসবে তখন তা দু’টি বিষয়কে শামিল করবে আর তা ঐ তাকওয়া শব্দের মতো যা একাকী বা আলাদা প্রয়োগ হলে তা আল্লাহর নির্দেশিত কাজ করা এবং নিষেধ করা কাজ বর্জন করাকে বুঝায়।পক্ষান্তরে তা নির্দেশিত কাজের সাথে শামিল হওয়ার সময় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকাকে দাবী করবে। কেননা তাওবার প্রকৃত রূপ হল আল্লাহ যা ভালবাসেন সে কাজ অবলম্বন এবং তিনি যা অপছন্দ করেন তা বর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। সুতরাং প্রিয় বস্ত্তর দিকে প্রত্যাবর্তন করা তাওবার একটি অংশ এবং অপছন্দনীয় জিনিস হতে ফিরে আসা তাওবার আরেকটি অংশ আর এজন্য আল্লাহ সাধারণ সফলতাকে তাওবার মাধ্যমে নির্দেশিত কাজ করা ও নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, যেমন আল্লাহ বলেন, ’‘হে মু‘মিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তওবা্ কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার’’- (সূরা আন্ নূর ২৪ : ৩১)। সুতরাং প্রত্যেক তওবাকারী সফলকাম। আর নির্দেশিত কাজ করা এবং নিষিদ্ধ কাজ বর্জন করা ছাড়া কেউ সফলকাম হতে পারবে না।আল্লাহ আরো বলেন, ’‘আর যারা তওবা্ করেনি তারাই অবিচারকারী’’- (সূরা আল হুজুরাত ৪৯ : ১১)। নির্দেশিত কাজ বর্জনকারী যালিম যেমন নিষিদ্ধ কাজ সম্পাদনকারী যালিম। আর দু’টি বিষয়কে সমন্বয়কারী তওবা্ এর মাধ্যমে যুলমের অপসারণ হয়। তিনি বলেন, তওবাকারীকে তওবাকারী বলে নামকরণ করার কারণ তওবাকারী আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ থেকে তাঁর নির্দেশিত কাজের দিকে প্রত্যাবর্তন এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে আনুগত্যের দিকে ফিরে আসে।আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাকে ভালবাসেন যে তাঁর নির্দেশিত বিষয় সম্পাদন করে এবং তাঁর নিষেধ করা বিষয় থেকে দূরে থাকে। সুতরাং তওবা্ হল, বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণভাবে আল্লাহর নিষেধ করা বিষয় থেকে ফিরে আসা এবং তাঁর পছন্দনীয় বিষয়ের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। এমতাবস্থায় তাওবার নামের মাঝে ইসলাম, ঈমান, ইহসানও প্রবেশ করবে এবং তওবা্ পূর্বোক্ত সকল সংজ্ঞাগুলোকে শামিল করবে।তওবা্ দ্বারা বান্দা আল্লাহর অনুগত হয়। আর এ আনুগত্যের স্তর চারটিঃপ্রথম স্তরঃ সৃষ্টির মাঝে অংশিদারিত্ব আর তা হল প্রয়োজনের অনুগত এবং আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষীতা। সুতরাং আকাশবাসী এবং জমিনবাসী সকলেই তাঁর নিকট মুখাপেক্ষী তাঁর নিকট নিঃস্ব। আর তিনি আল্লাহই একমাত্র সত্তা যিনি তাদের থেকে অমুখাপেক্ষী। আকাশবাসী এবং জমিনবাসী প্রত্যেকেই তার কাছে চায় পক্ষান্তরে তিনি কারো কাছে চান না।দ্বিতীয় স্তরঃ আনুগত্য ও দাসত্বের স্তর আর তা স্বেচ্ছাধীন অনুগত আর এটি হল তার অনুগতদের সাথে নির্দিষ্ট আর এটি দাসত্বের গোপন।তৃতীয় স্তরঃ ভালবাসার অনুগত কেননা যে ভালবাসে সে প্রিয় সত্তার অনুগত। সত্তার প্রতি ব্যক্তির ভালবাসার পরিমাণ অনুপাতে তার ভালবাসা সাব্যস্ত হয় সুতরাং ভালবাসাকে ভিত্তি দেয়া হয়েছে ভালবাসার পাত্রের প্রতি বিনয় প্রদর্শনের উপর।চতুর্থ স্তরঃ অবাধ্যতা ও অপরাধের বশ্যতা।সুতরাং এ চারটি স্তর যখন একত্রিত হয় তখন বিনয় নম্রতা একমাত্র আল্লাহর জন্য ও পূর্ণাঙ্গভাবে সাব্যস্ত হয়। কেননা ব্যক্তি তার ভয়ে, আশংকায়, ভালবাসায়, প্রত্যাবর্তন, আনুগত্যের সাথে এবং তার দিকে মুখাপেক্ষী হয়ে বিনয় প্রকাশ করে।

দিনে একশবার ইস্তিগফার করার শিক্ষা

মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ২৩২৪-[২]

وَعَنِ الْأَغَرِّ الْمُزَنِىِّ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ: «إِنَّه لَيُغَانُ عَلٰى قَلْبِىْ وَإِنِّىْ لَأَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ فِى الْيَوْمِ مِائَةَ مَرَّةٍ». رَوَاهُ مُسْلِمٌ

আগার আল মুযানী (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আমার অন্তরে মরিচা পড়ে, আর (ওই মরিচা পরিষ্কার করার জন্য) আমি দিনে একশবার করে ইস্তিগফার করি। (মুসলিম)[১]

[১] সহীহ : মুসলিম ২৭০২, মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ৮৮৩, মুসতাদারাক লিল হাকিম ১৮৮১, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৩৩৩৪১, শু‘আবূল ঈমান ৬৩১, সহীহ আল জামি‘ ২৪১৫।

মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ২৩২৪-[২]-এর সারসংক্ষেপ

এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাঁর অন্তরে এক ধরনের আবরণ বা মরিচা পড়ে, আর তিনি দিনে একশবার ইস্তিগফার করেন। এখানে আমাদের জন্য বড় শিক্ষা আছে। মানুষের অন্তর নানা চিন্তা, ভুল, ব্যস্ততা ও দুর্বলতায় ভারী হয়ে যেতে পারে। ইস্তিগফার সেই অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনার একটি পথ। নবীজি صلى الله عليه وسلم নিজে নিয়মিত ইস্তিগফার করেছেন—এটি দেখায়, ক্ষমা চাওয়া শুধু অপরাধীর কাজ নয়, বরং আল্লাহর কাছাকাছি থাকার আমল। তাই দৈনিক ইস্তিগফার মুমিনের জীবনে থাকা দরকার। এটি বান্দাকে বিনয়ী করে এবং নিজের অবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • দিনে একশবার ইস্তিগফার করার শিক্ষা এই হাদিসে এসেছে।
  • ইস্তিগফার অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে।
  • নবীজি صلى الله عليه وسلم নিজে ক্ষমা চাইতেন, তাই এটি বড় সুন্নাহ।
  • নিজের দুর্বলতা বুঝে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন