১৩/১১. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৩২৭৫-[২] - ঋতুস্রাব অবস্থায় তালাকের বিধান
খুলা (খুলা তালাক) ও তালাক প্রসঙ্গে - প্রথম অনুচ্ছেদ
খুলা‘ শব্দটি ‘আরবীخُلْعُِ الثوبথেকে নেয়া হয়েছে, ‘আরবেরা এ কথা তখনই বলেاذا ازالهযখন কাপড় খুলে ফেলানো হয়। কেননা নারী পুরুষের পোষাক স্বরূপ, অনুরূপ পুরুষও নারীর পোষাক স্বরূপ। আল্লাহর বাণী : ’‘স্ত্রীগণ তোমাদের পোষাক স্বরূপ তোমরাও তাদের পোষাক।’’ (সূরা আল বাকারাহ্ ২ : ১৮৭)ইসলামের পরিভাষায় মহিলা তার স্বামীর নিকট থেকে কোনো কিছুর (মোহরের) বিনিময়ে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়াকে খুলা‘ বলা হয়।কুরআন ও সহীহ হাদীসে খুলা‘ করার বৈধতা রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ’‘অতঃপর যদি তোমাদের ভয় হয় যে, তারা উভয়েই আল্লাহর নির্দেশ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে সেক্ষেত্রে স্ত্রী যদি কিছু বিনিময় দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় তবে উভয়ের কারো পাপ হবে না।’’ (সূরা আল বাকারহ্ ২ : ১২৯)নিম্নের বিশুদ্ধ হাদীসটিসহ একাধিক বিশুদ্ধ হাদীসও খুলা‘ বৈধ হওয়ার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। খুলা‘ তালাক কিনা? এ নিয়ে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ বিদ্যমান।ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-সহ কতিপয় ইমামের মতে খুলা‘ তালাক। পক্ষান্তরে ইমাম আহমাদসহ আরো কতিপয় ফকীহরে মতে খুলা‘ তালাক নয়। বরং ‘ফাস্খে নিকাহ’ বা বিবাহ বাতিল করা। পূর্বে উল্লেখিত আভিধানিক অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখেও বলা যায়। খুলা‘ হলো বিবাহ খুলে ফেলানো।মিশকাতের আধুনিক ভাষ্যগ্রন্থ আনোয়ারুল মিশকাতের ব্যাখ্যাকার ইমাম আহমাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তিনি বলেছেন, খুলা‘ তালাক নয়, বরং ‘বিচ্ছেদ।’ কেননা আল্লাহর কালামে বলা হয়েছে- অর্থাৎ ’‘তালাক দু’বার ..., অতঃপর সে যদি তালাক দেয়’’- (সূরা আত্ব তালাক ৬৫ : ২৯-৩০)। এ শেষ বাক্যের পূর্বে খুলা‘র কথা বর্ণনা করা হয়েছে।এতে বুঝা যায় যে, খুলা‘ তালাক নয়। কেননা প্রথমে ২ তালাক, খুলা‘কে যদি তালাক ধরা হয় তাহলে সেটা এক তালাক, পরের বাক্যে (এক) তালাক উল্লেখ হয়েছে, এতে মোট ৪ তালাক হয়। অথচ এটা কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং খুলা‘ তালাক নয় বরং ‘ফাসখে নিকাহ’ বা বিবাহ ভঙ্গ মাত্র। অবশ্য খুলা‘কে ত্বলাক (তালাক)ের বর্ণনার মধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র।তালাক ও তাহলীল গ্রন্থকার হাফিয ইবনু কইয়িম-এর বরাত দিয়ে লিখেছেন, তিনি বলেন, খুলা‘ যে তালাক নয়, তার প্রমাণ হলো ত্বলাক (তালাক)ের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা যে তিনটি বিধানের কথা বলেছেন, যেগুলোর সব কটি খুলা‘তে পাওয়া যায় না। সে তিনটি নিম্নরূপ :(১) ত্বলাক (তালাক)ে রজ্‘ই-এর পর স্বামী তার স্ত্রীকে ‘ইদ্দাতের মধ্যে বিনা বিবাহ ও (বিনা বাধায়) ফিরিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু খুলা‘ হলে স্ত্রীর সম্মতি ব্যতীত তা পারবে না।(২) ‘তালাক’ তিন পর্যন্ত সীমিত। তালাক সংখ্যা পূর্ণ হয়ে গেলে স্ত্রীর অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ ও মিলন না হওয়া পর্যন্ত প্রথম স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কিন্তু খুলা‘য় স্ত্রীকে অপর কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই প্রথম স্বামীর কাছে নতুন বিবাহের মাধ্যমে ফিরে যেতে পারবে।(৩) খুলা‘র ‘ইদ্দত হলো এক ঋতু। পক্ষান্তরে সহবাসকৃত স্ত্রীর ‘ইদ্দত হলো তিন তুহর।(‘তালাক ও তাহলীল’ ১১-১২ পৃঃ, ড. আসাদুল্লাহ আল গালীব)এ ছাড়াও ঋতুকালে কিংবা পবিত্রকালে, ঋতু পরবর্তী সহবাসকৃত কিংবা সহবাসহীন, সকল অবস্থায়ই খুলা‘ করতে পারে, কিন্তু ঋতুকালে তালাক দেয়ার বিধান নেই। অনুরূপ ঋতুর পর সহবাসের পূর্বে তালাক দিতে হবে সহবাসের পরে নয়।স্বামী স্ত্রী উভয়ের যদি দাম্পত্য জীবন মনোমালিন্য, অসহনীয় এবং অপছন্দনীয় হয়; স্বামী যদি বিচ্ছিন্ন হতে চায় তবে সেটা তার হাতে এবং সে তা প্রয়োগ করবে। আর যদি স্ত্রী বিচ্ছিন্ন হতে চায়, তবে তার হাতে রয়েছে খুলা‘ এবং সে এটা প্রয়োগ করবে। সুতরাং খুলা‘ ও তালাক ভিন্ন বস্তু তা স্পষ্ট।(ফিকহুস্ সুন্নাহ্ ২য় খন্ড, পৃঃ ২৯৯, বৈরুত)
ঋতুস্রাব অবস্থায় তালাক নয়, নিয়ম মেনে তালাক
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৩২৭৫-[২]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৩২৭৫-[২]
وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ: أَنَّهُ طَلَّقَ امْرَأَةً لَهُ وَهِيَ حَائِضٌ فَذَكَرَ عُمَرُ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَتَغَيَّظَ فِيهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ: «ليراجعها ثمَّ يمْسِكهَا حَتَّى تطهر ثمَّ تحيض فَتطهر فَإِن بدا لَهُ أَنْ يُطْلِّقَهَا فَلْيُطْلِّقْهَا طَاهِرًا قَبْلَ أَنْ يَمَسَّهَا فَتِلْكَ الْعِدَّةُ الَّتِي أَمَرَ اللَّهُ أَنْ تُطْلَّقَ لَهَا النِّسَاءُ». وَفِي رِوَايَةٍ: «مُرْهُ فَلْيُرَاجِعْهَا ثُمَّ لْيُطَلِّقْهَا طَاهِرًا أَوْ حَامِلًا»
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
একবার তিনি স্বীয় স্ত্রীকে মাসিক (ঋতুস্রাব) অবস্থায় তালাক দেন। এ বিষয়টি উমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট জানালেন। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, সে যেন তাকে রুজু করে (অর্থাৎ- প্রত্যাহার করে) নেয় এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রেখে দেয়। অতঃপর একান্তই তালাক দিতে চাইলে, তবে এক ঋতুস্রাব হতে পবিত্রাবস্থায় উপনীত হলে সহবাসের পূর্বে সে তালাক দিতে পারে। এটাই তালাকের ‘ইদ্দাত, আল্লাহ তা'আলা যা নির্দেশ করেছেন। অপর বর্ণনায় আছে- তাকে রজ্ আহ্ (প্রত্যাহার) করার আদেশ দাও। অতঃপর (একান্ত প্রয়োজনে) সে যেন পবিত্রাবস্থায় অথবা গর্ভাবস্থায় তালাক দেয়।
[১] সহীহ : বুখারী ৫২৫১, মুসলিম ১৪৭১, আবূ দাঊদ ২১৭৯, নাসায়ী ৩৩৯০, আহমাদ ৫২৯৯, দারিমী ২৩০৮, ইরওয়া ২০৫৯, সহীহ আল জামি‘ ৫৩৬৭।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৩২৭৫-[২]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ)-এর ঘটনা এসেছে। তিনি তাঁর স্ত্রীকে ঋতুস্রাব অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। উমর (রাঃ) বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم)-কে জানালে নবীজি (صلى الله عليه وسلم) এতে ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে স্ত্রীকে রুজু করতে বলেন। এরপর নির্দেশ দেন, সে স্ত্রীকে পবিত্র হওয়া পর্যন্ত নিজের কাছে রাখবে, তারপর আবার ঋতুস্রাব হবে, এরপর পবিত্র হলে যদি তালাক দিতে চায়, তবে সহবাসের আগে পবিত্র অবস্থায় তালাক দেবে। অন্য বর্ণনায় পবিত্রাবস্থা বা গর্ভাবস্থায় তালাকের কথা এসেছে। এই হাদিস তালাকের নিয়ম, ইদ্দত এবং আবেগের বদলে শৃঙ্খলাপূর্ণ সিদ্ধান্তের শিক্ষা দেয়। তালাক হালকা বিষয় নয়; সময়, অবস্থা এবং নিয়ম মানা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- ঋতুস্রাব অবস্থায় তালাক দেওয়া থেকে সতর্ক করা হয়েছে।
- ভুলভাবে তালাক দিলে রুজুর নির্দেশ এসেছে।
- তালাকের ক্ষেত্রে পবিত্রাবস্থা ও সহবাসের আগে সময়ের কথা এসেছে।
- দাম্পত্য বিচ্ছেদেও নিয়ম ও সংযম মানতে হয়।
