২৮/৪. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫৫৭৩-[৮] - ঈমানদারদের জন্য শাফা‘আত
হাউজে কাওসার ও শাফায়াতের বর্ণনা - প্রথম অনুচ্ছেদ
কুরতুবী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দুটি হাওয থাকবে। একটি পুলসিরাতের পূর্বে অবস্থানের জায়গায়, অন্যটি থাকবে জান্নাতে। উভয় হাওযের নাম কাওসার। তাদের ভাষায় কাওসার অর্থ অধিক কল্যাণ। সঠিক কথা হলো হাওযের ব্যবস্থা হবে মীযানের পূর্বে। কারণ মানুষেরা কবর থেকে পিপাসার্ত হয়ে বের হবে। অতঃপর তারা নবীদের অবস্থানস্থলে হাওয থাকবে। আমি বলি, জামি‘তে রয়েছে, হে নবী (ﷺ) আপনার জন্য হাওযে কাওসার রয়েছে।তারা গর্ব করে বলবে যে, কারা বেশি আগমন করেছে? আমি আশা করি যে, আমি তাদের মাঝে সর্বাধিক সংখ্যা নিয়ে আগমনকারী হব। রাগিব (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, (الشَّفْعُ) বলা হয় কোন জিনিসকে অনুরূপ জিনিসের সাথে যুক্ত করা এখান থেকে (الشَّفَاعَةُ) নির্গত হয়েছে। আর তা বলা হয় অন্যকে সাহায্য করার জন্য তার সাথে যোগদান করা তার থেকে গোপন হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণের তুলনায় বেশি মর্যাদাবান ব্যক্তির যুক্ত হওয়া তার চাইতে কম মর্যাদার লোকের সাথে শাফা‘আত সংঘটিত হবে কিয়ামতে। (মিরকাতুল মাফাতীহ)
শাফা‘আত: ঈমানের কারণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৫৫৭৩-[৮]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৫৫৭৩-[৮]
وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ مَاجَ النَّاسُ بَعْضُهُمْ فِي بَعْضٍ فَيَأْتُونَ آدم فَيَقُولُونَ: اشفع لنا إِلَى رَبِّكَ فَيَقُولُ: لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِإِبْرَاهِيمَ فَإِنَّهُ خَلِيلُ الرَّحْمَنِ فَيَأْتُونَ إِبْرَاهِيمَ فَيَقُولُ لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِمُوسَى فَإِنَّهُ كَلِيمُ الله فَيَأْتُونَ مُوسَى فَيَقُولُ لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِعِيسَى فَإِنَّهُ رُوحُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ فَيَأْتُونَ عِيسَى فَيَقُولُ لَسْتُ لَهَا وَلَكِنْ عَلَيْكُمْ بِمُحَمَّدٍ فَيَأْتُونِّي فَأَقُولُ أَنَا لَهَا فَأَسْتَأْذِنُ عَلَى رَبِّي فَيُؤْذَنُ لِي وَيُلْهِمُنِي مَحَامِدَ أَحْمَدُهُ بِهَا لَا تَحْضُرُنِي الْآنَ فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ الْمَحَامِدِ وَأَخِرُّ لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تشفع فَأَقُول يارب أُمَّتِي أُمَّتِي فَيُقَالُ انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ شَعِيرَةٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَنْطَلِقُ فأفعل ثمَّ أَعُود فأحمده بِتِلْكَ المحامدوأخر لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَقُولُ يارب أُمَّتِي أُمَّتِي فَيُقَالُ انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ أَوْ خَرْدَلَةٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَنْطَلِقُ فَأَفْعَلُ ثُمَّ أَعُودُ فَأَحْمَدُهُ بِتِلْكَ المحامدوأخر لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَقُولُ يارب أُمَّتِي أُمَّتِي فَيُقَالُ انْطَلِقْ فَأَخْرِجْ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ أَدْنَى أَدْنَى أَدْنَى مِثْقَالِ حَبَّةِ من خَرْدَلَةٍ مِنْ إِيمَانٍ فَأَخْرِجْهُ مِنَ النَّارِ فَأَنْطَلِقُ فأفعل ثمَّ أَعُود الرَّابِعَة فأحمده بِتِلْكَ المحامدوأخر لَهُ سَاجِدًا فَيُقَالُ يَا مُحَمَّدُ ارْفَعْ رَأْسَكَ وَقُلْ تُسْمَعْ وَسَلْ تُعْطَهْ وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَقُولُ يارب ائْذَنْ لِي فِيمَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ قَالَ لَيْسَ ذَلِكَ لَكَ وَلَكِنْ وَعِزَّتِي وَجَلَالِي وَكِبْرِيَائِي وَعَظَمَتِي لَأُخْرِجَنَّ مِنْهَا مَنْ قَالَ لَا إِلَه إِلَّا الله . مُتَّفق عَلَيْهِ متفق علیہ، رواہ البخاری (7510) و مسلم (326 / 193)، (475) ۔ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন মানুষ একে অপরে সমবেত অবস্থায় উদ্বেলিত ও উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়বে। তাই তারা সকলে আদাম (আঃ) -এর কাছে গিয়ে বলবে, আমাদের জন্য আপনার প্রভুর কাছে শাফা'আত করুন। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের উপযুক্ত নই, বরং তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহর খলীল। তাই তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর কাছে যাবে। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের যোগ্য নই, বরং তোমরা মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও। কারণ তিনি কালীমুল্লাহ (যিনি আল্লাহর সাথে কথোপকথন করেছেন)।এবার তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে যাবে। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের যোগ্য নই, বরং তোমরা ‘ঈসা (আঃ) -এর কাছে যাও। কারণ তিনি আল্লাহর আত্মা ও কালিমাহ্। তখন তারা ‘ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাবে। তিনিও বলবেন, আমি এ কাজের যোগ্য নই। তোমরা বরং মুহাম্মাদ (ﷺ) এর কাছে যাও। তখন তারা সকলে আমার কাছে আসবে। তখন আমি বলব, আমিই এ কাজের জন্য।এবার আমি আমার প্রভুর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে অনুমতি দেয়া হবে। এ সময় আমাকে প্রশংসা ও স্তুতির এমন সব বাণী ইলহাম করা হবে, যা এখন আমার জানা নেই। আমি ঐ সকল প্রশংসা দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব এবং তাঁর উদ্দেশে সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার বক্তব্য শুনা হবে। প্রার্থনা কর, যা চাবে তা দেয়া হবে। আর শাফা'আত কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলব, হে প্রভু! আমার উম্মত, আমার উম্মত! (অর্থাৎ আমার উম্মতের উপর রহম করুন, আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন) বলা হবে, যাও, যাদের হৃদয়ে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। তখন আমি গিয়ে তাই করব।অতঃপর ফিরে আসব এবং ঐ প্রশংসা বাণী দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব, তারপর সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার বক্তব্য শুনা হবে। চাও, যা চাবে তা দেয়া হবে। আর শাফা'আত কর গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলব, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত আমার উম্মত! (আমাকে) বলা হবে, যাও যাদের হৃদয়ে এক অণু বা সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। অতএব আমি গিয়ে তাই করব।তারপর আবার ফিরে আসব এবং উক্ত প্রশংসা বাণী দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাব। তখন আমাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার কথা শুনা হবে। চাও, যা চাইবে তা দেয়া হবে। সুপারিশ কর, তোমার শাফা'আত গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলব, হে আমার প্রভু! আমার উম্মত আমার উম্মত! (আমাকে) বলা হবে, যাও যাদের হৃদয়ে ক্ষুদ্রাণুক্ষুদ্র পরিমাণ ঈমান আছে, তাদের সকলকেই জাহান্নাম থেকে বের করে আন। তখন আমি গিয়ে তাই করব।তিনি (ﷺ) বলেন, অতঃপর আমি চতুর্থবার ফিরে আসব এবং ঐ সকল প্রশংসা বাণী দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও এবং বল, তোমার কথা শুনা হবে। চাও, যা চাইবে তা দেয়া হবে। সুপারিশ কর, তোমার শাফা'আত গ্রহণ করা হবে। আমি বলব, হে প্রভু! যারা শুধু ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ বলেছেন, আমাকে তাদের জন্যও শাফা'আত করার অনুমতি দিন। তখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমার ‘ইয্যত ও জালাল এবং আমার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের শপথ করে বলছি, যারা ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ বলেছে, আমি নিজেই তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করব।
সহীহ: বুখারী ৪৭১২, মুসলিম ৩২৭-(১৯৪), তিরমিযী ২৪৩৪, সহীহুল জামি ১৪৬৬, আত্ তারগীব ওয়াত তারহীব ৩৬৪১, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ৩১৬৭৪, মুসনাদে বাযযার ৭৬, মুসনাদে আহমাদ ৯৬২১, আবূ ইয়ালা ৫৬, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬৪৬৫, আস্ সুনানুল কুবরা লিন্ নাসায়ী ১১২৮৬।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫৫৭৩-[৮]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে কিয়ামতের দিনে শাফা‘আতের ধাপগুলো বর্ণিত হয়েছে। মানুষ অস্থির হয়ে আদম (আঃ), ইবরাহীম (আঃ), মূসা (আঃ) ও ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাবে। তাঁরা প্রত্যেকে মুহাম্মাদ (صلى الله عليه وسلم)-এর দিকে পাঠাবেন। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলবেন, ‘আমি এ কাজের জন্য।’ এরপর তিনি আল্লাহর অনুমতি নিয়ে সিজদা করবেন, আল্লাহর প্রশংসা করবেন এবং উম্মতের জন্য বলবেন, ‘আমার উম্মত, আমার উম্মত।’ এরপর যাদের অন্তরে যবের দানা, সরিষা দানা বা তার চেয়েও কম ঈমান থাকবে, তাদের জাহান্নাম থেকে বের করার অনুমতি দেওয়া হবে। শেষে যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ নিজেই তাঁর দয়া ঘোষণা করবেন। এই হাদিস ঈমান, তাওহীদ এবং আল্লাহর রহমতের বড় শিক্ষা দেয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- শাফা‘আত আল্লাহর অনুমতি ছাড়া হবে না।
- রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) উম্মতের জন্য গভীর দরদ দেখিয়েছেন।
- অন্তরের ঈমান আখিরাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
- তাওহীদ আল্লাহর দয়ার বড় কারণ।
