৪/৩৬. অধ্যায়ঃ

দোয়া কুনুত - প্রথম অনুচ্ছেদ

আরবী (قنوت) ’কুনূত’ শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহার হয়। ইবনুল ’আরাবী (রহঃ) আত্ তিরমিযীর ব্যাখ্যায় এ শব্দের ১০টি অর্থ উল্লেখ করেছেন। তবে এখানেقنوتদ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সালাতে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়ানো অবস্থায় দু’আ করা।প্রিয় পাঠক! জেনে রাখুন যে, এখানে কয়েকটি বিরোধপূর্ণ মাসআলাহ্ রয়েছে।প্রথমঃ বিতরের সালাতে কুনূত পড়বে কি-না।দ্বিতীয়ঃ যখন বিতর সালাতে কুনূত পড়বে, তখন কুনূত রুকূ’র আগে পড়বে না-কি পরে?তৃতীয়ঃ বিতর সালাতে কুনূত পুরা বছরেই পড়তে হবে নাকি। শুধু রমাযান মাসের শেষার্ধেক।চতুর্থঃ কুনূতের শব্দগুলো (অর্থাৎ মূল দু’আ) তবে এ মাসআলার ব্যাপারে আলোচনা অতিবাহিত হয়। উল্লেখ্য যে, বিতর সালাতে কুনূত পড়ার সময় তাকবীর দেয়া (’আল্ল-হু আকবার’বলা) ও তাকবীর দেয়ার সময় তাকবীরে তাহরীমার মতো দু’ হাত উত্তোলন করার মাসআলাটি, যেমনভাবে হানাফীগণ করে থাকেন। তবে এ দু’টোর ব্যাপারে (অর্থাৎ তাকবীর দেয়া এবং দু’ হাত উত্তোলন করা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন ধরনের সহীহ বর্ণনা নেই। হ্যাঁ এ দু’ বিষয়ে (তাকবীর ও দু’ হাত উত্তোলন) কতিপয় সাহাবী (রাঃ)-এর আসার রয়েছে। এ ব্যাপারে মুহাম্মাদ ইবনু নাসর আল মারুযী (রহঃ) কিতাবুল বিতরে ’উমার, ’আলী, ইবনু মাস’ঊদ এবং বারা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা সকলেই বিতর সালাতে রুকূ’র পূর্বে কুনূত পড়ার সময় তাকবীর দিয়েছেন। তবে শায়খ ইবনুল ’আরাবী আত্ তিরমিযীর ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, কুনূতের সময় তাকবীর দেয়ার কোন মারফূ’ হাদীস কিংবা সাহাবীদের নির্ভরযোগ্য কোন আসারও আমি পাইনি এবং তাকবীরে তাহরীমার মতো রফ্’উল ইয়াদায়ন বিষয়েও কোন মারফূ’ হাদীস এ ব্যাপারে পাইনি।তবে ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ)-এর ’আমল যে তারা (হানাফীরা) উল্লেখ করেছে ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর ’’জুয্উ রফ্’উল ইয়াদায়ন’’ ও আল মারুযী (রহঃ)-এর ’’কিতাবুল বিতর’’ থেকে। এছাড়াও ’উমার (রাঃ), আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ), আবূ ক্বিলাবাহ্ ও মাকহূল (রাঃ)-গণের আসার উল্লেখ করেছেন এবং এর দ্বারা কুনূতের সময় দু’হাত উত্তোলনের দলীল গ্রহণ করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তা এ ব্যাপারে কোন দলীল নয়, বরং তা দু’আর সময় যে হাত উঠানো হয় অনুরূপ হাত উঠানোর প্রমাণ বহন করে। মির’আত প্রণেতা বলেন যে, উল্লেখিত আসারগুলো তাদের (হানাফীদের) চাহিদার উপরে কোন দলীল নয় বরং তা দু’আ অবস্থায় কুনূতে হাত উঠানোর দলীল, যেমন একজন দু’আকারী হাত উঠায়। সুতরাং বিতর সালাতে দু’আয়ে কুনূত অবস্থায় হাত উঠানো জায়িয। যা প্রমাণিত হয় ইবনু মাস্’ঊদ, ’উমার (রাঃ), আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) ও আনাস (রাঃ)-এর ’আমলের মাধ্যমে।হাফিয আসক্বালানী তাঁর ’তালখিস’ নামক গ্রন্থে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।পঞ্চম মাসআলাহ্ঃ বিতর ব্যতীত অন্য সালাতে বিনা কারণে কুনূত পড়া শারী’আত সম্মত কিনা? একদল ’আলিম তাদের মধ্যে ইমাম আবূ হানীফা, আহমাদ (রহঃ) তা শারী’আত সম্মত নয় বলে মত দিয়েছেন। তারা বলেন, ফাজ্‌র (ফজর) সালাতেও বিনা কারণে কুনূত পড়া সুন্নাহ মুতাবেক নয়। অপর একদল তার মধ্য ইমাম শাফি’ঈ ও মালিক (রহঃ)-এর মতে ফাজ্‌রের (ফজরের) সালাতে কুনূত পড়া সর্বদাই শারী’আত সম্মত। তবে অন্যান্য চার ওয়াক্ত সালাতে যথাক্রমে যুহর, ’আসর, মাগরিব ও ’ইশার সালাতে বিনা কারণে কুনূত না পড়ার বিষয়ে তারা ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তারা মতবিরোধ করেছেন ফাজ্‌রের (ফজরের) ব্যাপারে, ইমাম শাফি’ঈ ও মালিক (রহঃ)-এর মতে ফজরে সর্বদাই কুনূত বৈধ। আর ইমাম আবূ হানীফাহ্ ও আহমাদ (রহঃ)-এর মতে বিনা কারণে ফজরে কুনূত বৈধ না।ফাজ্‌রের (ফজরের) কুনূত পড়ার পক্ষের ’উলামাগণের দলীল দারাকুত্বনী (২য় খন্ড, ১১৮ পৃঃ), আহমাদ (৩য় খন্ড, ১৬২ পৃঃ), ত্বহাবী (১ম খন্ড, ১৪৩ পৃঃ)..... আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়া পর্যন্ত ফাজ্‌র (ফজর) সালাতে কুনূত পড়তেন। আত্ তানক্বিহ প্রণেতা বলেন, এ হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা কুনূতে নাযিলাহ্ পড়তেন। অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদাই সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) দীর্ঘ করে আদায় করতেন। কেননা (قنوت) শব্দটি আনুগত্য, সালাত, দীর্ঘ ক্বিয়াম (কিয়াম), সালাতে নম্রতা ও নীরবতা ইত্যাদিকে সম্পৃক্ত করে। ইবনুল ক্বইয়্যূম (রহঃ) বলেন, উল্লেখিত হাদীস সহীহ হলেও তা এ নির্দিষ্ট কুনূতের দলীল নয় কারণ সেখানে এমন কথা উল্লেখ নেই যে, এটাই দু’আ কুনুত। বরং তা সালাতে ক্বিয়াম (কিয়াম), নীরবতা, সর্বদাই ’ইবাদাত, দু’আ, তাসবীহ ইত্যাদি বুঝায়। মির’আত প্রণেতা বলেন, আমাদের নিকট ইমাম আবূ হানীফাহ্ ও আহমাদ (রহঃ)-এর মত অধিক বিশুদ্ধ। কেননা বিতর ছাড়া বিনা কারণে কুনূত পড়া ফাজ্‌র (ফজর) কিংবা অন্যান্য সালাতে শারী’আত সম্মত নয়। ফজরে কুনূত পড়াটা কুনূতে নাযিলাহ্ এর সাথে নির্দিষ্ট। কেননা বিতর ব্যতীত অন্য সালাতে কুনূত পড়াটা বিশুদ্ধ মারফূ’ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়।৬ষ্ঠ মাসআলাহ্ঃ যখন মুসলিমগণ কোন বিপদ মুসীবাত বা শত্রুর কিংবা অনুরূপ কোন বিপদের কারণে কুনূতে নাযিলার প্রয়োজন মনে করবে। তখন বিতর ছাড়া অন্য সালাতে কুনূত পড়া কি বৈধ? যদি বৈধ হয় তবে কি তা ফাজ্‌র (ফজর) কিংবা উচ্চস্বরে ক্বিরাআত (কিরআত) বিশিষ্ট সালাতের মধ্য সীমিত থাকবে নাকি পাঁচ ওয়াক্ত সালাতেও তা বৈধ হবে। এ ব্যাপারে জমহূর হাদীস বিশারদগণ ও ইমাম শাফি’ঈ (রহঃ)-এর মতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে কুনূতে নাযিলাহ্ পড়া শারী’আত সম্মত। তবে হানাফী ও হাম্বালীদের মতে তা ফাজ্‌রের (ফজরের) সালাতের সাথে খাস।মির্’আত প্রণেতা বলেন যে, অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো জমহূর হাদীস বিশারদ ও শাফি’ঈ (রহঃ)-এর মত। অর্থাৎ কুনূতে নাযিলাহ্ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতেই বৈধ। কারণ এ ব্যাপারে একাধিক সহীহ হাদীস রয়েছে। কিন্তু কুনূতে নাযিলাহ্ ফাজ্‌র (ফজর) কিংবা জিহরী (জেহরী) ক্বিরাআত (কিরআত) বিশিষ্ট সালাতের সাথে নির্দিষ্ট এ মর্মে কোন কোন সহীহ কিংবা য’ঈফ হাদীসও নেই।সপ্তম মাসআলাহ্ঃ কুনূতে নাযিলাটি রুকূ’র আগে পড়তে হবে, নাকি রুকূ’র পড়ে। ইমাম শাফি’ঈ ও আহমাদ (রহঃ)-এর মতে কুনূতে নাযিলাহ্ রুকূ’র পরে পড়তে হবে। তবে আবূ হানীফাহ্ (রহঃ) তার বিপরীত মত ব্যক্ত করেছেন। মির্’আত প্রণেতা বলেন যে, কুনূতে নাযিলা রুকূ’র পড়ে পড়তে হবে এটাই সর্বপছন্দনীয় মত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এর বিকল্প কোন সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয়নি। তবে রুকূ’র পূর্বে কুনূতে নাযিলা পড়লে তা জায়িয হবে কারণ এ ব্যাপারে সাহাবী (রাঃ)-দের কারো কারো ’আমল রয়েছে।

মিশকাতুল মাসাবিহহাদিস নম্বর ১২৯২-[৩]

وَعَنْ أَبيْ مَالِكٍ الْأَشْجَعِيٍّ قَالَ: قُلْتُ لِأَبِي: يَا أَبَتِ إِنَّكَ قَدْ صَلَّيْتَ خَلْفَ رَسُولِ اللّهِ ﷺ وَأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَان وَعَلِيٍّ هَهُنَا بِالْكُوفَةِ نَحْوًا مِنْ خَمْسِ سِنِينَ أَكَانُوا يَقْنُتُوْنَ؟ قَالَ: أَيْ بُنَيَّ مُحْدَثٌ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَالنَّسَائِيُّ وَابْنُ مَاجَهْ

আবূ মালিক আল আশজা‘ঈ (রহঃ) হতে বর্ণিতঃ

আমি আমার পিতার কাছে প্রশ্ন করেছিলাম, হে পিতা! আপনি রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আবূ বাক্‌র, উমর, উসমান, আর ‘আলী (রাঃ) -এর পেছনে কুফায় প্রায় পাঁচ বছর পর্যন্ত সালাত আদায় করেছেন। এসব মর্যাদাবান ব্যক্তিগণ কি “দু‘আ কুনূত” পড়তেন? তিনি জবাব দিলেন, হে আমার পুত্র! (দু‘আ কুনূত পড়া) বিদ‘আত। (তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ) [১]

[১] সহীহ : নাসায়ী ১০৮০, আত্ তিরমিযী ৪০২, ইবনু মাজাহ্ ১২৪১, ইরওয়া ৪৩৫, আহমাদ ১৫৮৭৯, শারহুস্ সুন্নাহ্ ৬৩৮।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন