৪/৪১. অধ্যায়ঃ

মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ১৩৪৩-[৩] - সফরে যুহর আসর ও মাগরিব

সফরের সালাত - প্রথম অনুচ্ছেদ

নবী (ﷺ) মুসাফির ব্যক্তির জন্য কতকগুলো বিষয়ে অব্যাহতির নির্দেশ দিয়েছেন, তন্মধ্য হতে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) ক্বসর করা যুহর, ‘আসর এবং মাগরিব, ‘ইশার সালাতের মাঝে সমন্বয় করা, সুন্নাত সালাত ছেড়ে দেয়া, সওয়ারীর উপর ইশারায় সালাত আদায় করা, সেটা যেদিকে মুখ করে থাকুক না কেন এবং এ বিষয়গুলো নফল, ফাজ্‌রের (ফজরের) সুন্নাত ও বিতর সালাতের ব্যাপারে, ফরয সালাতের ক্ষেত্রে নয়।ইবনুর রাশীদ বলেন, সফরে মুসাফিরের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে ক্বসরের গুরুত্ব রয়েছে এবং ‘উলামাগণ মুসাফিরের সালাত ক্বসর করার বৈধতার উপর একমত। তবে একটি শায বা বিরল মত রয়েছে যে, সফরে ভয়ের আশঙ্কা না থাকলে ক্বসর বৈধ নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলার কথা ’‘যদি তোমরা ভয় পাও....’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪: ১০১), যা হোক ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল বলেছেন, সফরে সালাত ক্বসর করাই অগ্রগণ্য ও উত্তম।ইবনু কুদামাহ্ (রহঃ) বলেন যে, আহমাদ থেকে প্রসিদ্ধ বর্ণনা রয়েছে যে, মুসাফির ঐচ্ছিকের উপর থাকবে যদি চায় দু’ রাক্‘আত আদায় করবে এবং যদি ইচ্ছা করে সালাত পূর্ণ করতেও পারবে, তবে ক্বসর করাই উত্তম ও অগ্রগণ্য।সফরে দূরত্বের পরিমাণমুসাফির ব্যক্তি কতদূর পরিমাণ পথ পারি দিলে সালাত ক্বসর করতে হবে, এ দূরত্বের পরিমাণ সম্পর্কে ‘উলামাগণের মাঝে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। ইবনুল মুনযির ও অন্যান্যদের বর্ণনায় এতে প্রায় ২০টি মত রয়েছে।একেবারে স্বল্প দূরত্ব সম্পর্কে যা বলা হয় তা হলো এক মাইল পরিমাণ, যেমন ইবনু আবী শায়বাহ্, ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে সহীহ সানাদে বর্ণনা করেছেন এবং ইবনু হাযম আয্ যাহিরী (রহঃ) এ মত ব্যক্ত করেছেন এবং তিনি কিতাবুল্লাহ ও নবী (ﷺ)-এর সুন্নাহ থেকে মুত্বলাক (তালাক)্বব সফরের দ্বারা দলীল পেশ করেছেন। কারণ আল্লাহ এবং তার রাসূল (ﷺ) কোন সফরকে নির্দিষ্ট করেননি।তবে আহলু জাহিরিয়্যাহগণ মতামত দিয়েছেন, যেমন- ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেনঃ ক্বসরের সর্বনিম্ন সীমা হলো ৩ মাইল, তারা দলীল পেশ করেছেন সহীহ মুসলিম ও আবূ দাঊদে বর্ণিত আনাস (রাঃ)-এর হাদীস, নবী (ﷺ) ৩ মাইল অথবা ৩ ফারসাখ পরিমাণ দূরত্বে বের হতেন তখন সালাত ক্বসর করতেন। হাফিয আসক্বালানী (রহঃ) বলেনঃ এ বিষয়ে সেটাই অধিক বিশুদ্ধ হাদীস।আর যারা এ মতের বিরোধী তারা বলেন যে, আলোচ্য হাদীস দ্বারা ক্বসর শুরু উদ্দেশ্য, সফরের শেষ গন্তব্য নয়। অর্থাৎ যখন সে দীর্ঘ সফরের ইচ্ছা করবে এবং তিন মাইল দূরত্বে পৌঁছার পর থেকে সে ক্বসর করবে, যেমন- অন্য শব্দে তিনি বলেনঃ(إن النبيﷺ صلى بالمدينة أربعاً وبذي الحليفة ركعتين)অর্থাৎ নবী (ﷺ) মদীনায় চার রাক্‘আত সালাত আদায় করলেন এবং যুল হুলায়ফায় দু’ রাক্‘আত সালাত আদায় করলেন।ইমাম শাফি‘ঈ, মালিক, আহমাদ ও ফিকহবিদ (রহঃ)-গণ বলেনঃ পূর্ণ একদিন সফরের দূরত্বের কমে সালাত ক্বসর করা যাবে না। আর তা হলো চার বারদ, আর চার বারদ হলো ১৬ ফারসাখ অর্থাৎ ৪৮ মাইল। কারণ এক বারদ হলো চার ফারসাখ, আর এক ফারসাখ সমান তিন মাইল।তবে অধিকাংশ ‘উলামাগণ এবং বর্তমানের হাদীসবিশারদ (আহলুল হাদীসগণ) তিন ফারসাখ দূরত্বে ক্বসরের মতামত দিয়েছেন এবং তারা পূর্বে উল্লেখিত আনাস (রাঃ)-এর বর্ণিত হাদীস দলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেনগন্তব্যে অবস্থানের সময়ের পরিমাণমুসাফির যখন সফরের গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, তখন কতদিন অবস্থান করলে সে সালাত ক্বসর করবে এ ব্যাপারে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে, তবে প্রসিদ্ধ মত চারটি। যেমন-প্রথম মতঃ শাফি‘ঈ ও মালিকী মাযহাবীদের মত হলো, যখন চার দিনের অতিরিক্ত অবস্থান করবে তখন সালাত পূর্ণ করবে।দ্বিতীয় মতঃ আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর মাযহাব অনুযায়ী যখন ১৫ দিনের বেশী অবস্থান করবে, তখন পূর্ণ সালাত আদায় করবে।তৃতীয় মতঃ ইমাম আহমাদ ও দাঊদ (রহঃ)-এর মত অনুযায়ী যখন চার দিনের অধিক অবস্থান করবে তখন পূর্ণ সালাত আদায় করবে।চতুর্থ মতঃ ইসহাক্ব ইবনু রাহওয়াইয়াহ্ (রহঃ)-এর মত অনুযায়ী যখন ১৯ দিনের অধিক অবস্থান করবে তখন পূর্ণ সালাত আদায় করবে।ইমাম শাফি‘ঈ ও মালিক (রহঃ)-দ্বয়ের মতে সালাত ক্বসরের সীমা হলো গন্তব্যে প্রবেশ এবং গন্তব্য থেকে বের হওয়ার দিন ব্যতীত তিন দিন। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর নিকট ১৪ দিন, ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর নিকট ৪ দিন, ইসহাক (রহঃ)-এর নিকট ১৯ দিন।মির্‘আত প্রণেতা বলেনঃ আমার নিকট অগ্রগণ্য বা প্রাধান্য মত হলো ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর মত। (আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন)

সফরে যুহর আসর ও মাগরিব সালাতের নিয়ম

মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ১৩৪৩-[৩]

وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِيِّ ﷺ الظُّهْرَ فِي السَّفَرِ رَكْعَتَيْنِ وَبَعْدَهَا رَكْعَتَيْنِ وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِيِّ ﷺ فِي الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ فَصَلَّيْتُ مَعَه فِي الْحَضَرِ الظُّهْرَ أَرْبَعًا وَبَعْدَهَا رَكْعَتَيْنِ وَصَلَّيْتُ مَعَه فِي السَّفَرِ الظُّهْرَ رَكْعَتَيْنِ وَبَعْدَهَا رَكْعَتَيْنِ وَالْعَصْرَ رَكْعَتَيْنِ وَلَمْ يُصَلِّ بَعْدَهَا شَيْئًا وَالْمَغْرِبُ فِي الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ سَوَاءٌ ثَلَاثُ رَكَعَاتٍ وَلَا يَنْقُصُ فِي حَضَرٍ وَلَا سَفَرٍ وَهِيَ وِتْرُ النَّهَارِ وَبَعْدَهَا رَكْعَتَيْنِ. رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ

‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

আমি নবী কারীম (ﷺ)-এর সাথে সফরে দুইরাক্’আত যুহর ও এরপর দুইরাক্’আত সুন্নাত আদায় করেছি। আর এক বর্ণনায় আছে ‘আবদুল্লাহ ইবনু উমর বলেন আবাসে ও সফরে আমি নবী কারীম (ﷺ)-এর সাথে সালাত আদায় করেছি। আবাসে তাঁর সাথে যুহর সালাত আদায় চার রাক্’আত ও এরপর দুইরাক্’আত সুন্নাত আদায় করেছি এবং সফরে যুহর দুইরাক্’আত ও এরপর দুইরাক্’আত সুন্নাত এবং ‘আস্‌র দুইরাক্’আত আদায় করেছি। এর পর নবী (ﷺ) আর কোন সালাত আদায় করেননি। মাগরিবের সালাত আদায় করেছেন আবাসে ও সফরে সমান ভাবে তিন রাক্’আত। আবাসে ও সফরে কোন অবস্থাতেই মাগরিবের কম-বেশি হয় না। এইটা হল দিনের বিত্‌রের সালাত। এরপর তিনি আদায় করেছেন দুইরাক্’আত সুন্নাত। (তিরমিযী) [১]

[১] য‘ঈফ : আত্ তিরমিযী ৫৫২, শারহুস্ সুন্নাহ ১০৩৫। ইমাম আত্ তিরমিযী (রহঃ) বলেছেন, আমি ইমাম বুখারী (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ইবনু আবী লায়লা এর চেয়ে আশ্চর্যজনক হাদীস আর বর্ণনা করেনি।

অনুবাদের উৎস

প্রকাশক:
হাদিস একাডেমী
মতামত ও সংশোধনের শর্তাবলি

মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ১৩৪৩-[৩]-এর সারসংক্ষেপ

এই হাদিসে ইবনু উমর (রাঃ) নবী صلى الله عليه وسلم-এর সাথে সফর ও আবাস অবস্থায় সালাত আদায়ের অভিজ্ঞতা বলেছেন। তিনি বলেন, আবাসে যুহর চার রাকাত এবং সফরে যুহর দুই রাকাত আদায় করেছেন। সফরে যুহরের পর দুই রাকাত সুন্নাতের কথাও বর্ণনায় এসেছে। আসর সফরে দুই রাকাত আদায় করা হয়েছে এবং এরপর আর কোনো সালাত আদায় করা হয়নি। মাগরিব সম্পর্কে বলা হয়েছে, আবাসে ও সফরে তা একই থাকে—তিন রাকাত। মাগরিব কম বা বেশি হয় না, বরং এটিকে দিনের বিতর বলা হয়েছে। এই হাদিস মুসাফিরের সালাত, সফরে যুহর আসর এবং মাগরিব সালাতের আলোচনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা

  • সফরে যুহর ও আসর দুই রাকাত করে আদায়ের বর্ণনা এসেছে।
  • মাগরিব সালাত সফর ও আবাস—দুই অবস্থাতেই তিন রাকাত থাকে।
  • ইবনু উমর (রাঃ) নবী صلى الله عليه وسلم-এর সরাসরি আমল দেখে তা বর্ণনা করেছেন।
  • সফরের সালাত বুঝতে প্রতিটি সালাতের আলাদা বর্ণনা খেয়াল করা দরকার।

সেটিংস

ভাষা

ফন্ট সেটিংস

আরবি ফন্ট ফেস

আরবি ফন্ট সাইজ

২৪

অনুবাদ ফন্ট সাইজ

১৮

রিডিং লেআউট

আল হাদিস অ্যাপ ডাউনলোড করুন

App Banner

ইসলামের জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হোন

আপনার নিয়মিত সহায়তা আমাদের দ্বীনি ভাই-বোনের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে সাহয্য করবে। আমাদের মিশনে আপনিও অংশ নিন এবং বড় পরিবর্তনের অংশীদার হোন।

সাপোর্ট করুন