১০/৪. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ২৩৮৫-[৫] - ঘুমের আগে আত্মসমর্পণের দোয়া
সকাল সন্ধ্যা ও শয্যা গ্রহণকালে যা বলবে - প্রথম অনুচ্ছেদ
الصباحবা সকাল হলো- ফজর উদিত হওয়া থেকে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত। আর সন্ধ্যা সূর্য অস্ত হওয়া থেকে। যেমনটি রাগিব (রহঃ) বর্ণনা করেছেন।নাফি‘ ইবনু আযরাক (রহঃ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) এর কাছে এসে বললেনঃ আপনি কুরআনুল কারীমে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পেয়েছেন কি? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। অতঃপর তিলাওয়াত করলেনঃفَسُبْحَانَ اللهِ حِيْنَ تُمْسُوْنَতিনি বলেন, এর দ্বারা মাগরিব ও ‘ইশার সালাত উদ্দেশ্য।وَحِيْنَ تُصْبِحُوْنَএর দ্বারা ফজরের সালাত উদ্দেশ্য,وَعَشِيًّاএর দ্বারা ‘আসরের সালাত এবংوَحِيْنَ تُظْهِرُوْنَএর দ্বারা যুহরের সালাত উদ্দেশ্য। (সূরা আর্ রূম ৩০ : ১৭-১৮)আর এ হলো সাহাবায়ে কিরামদেরصباح(সকাল)مساء(সন্ধ্যা)-এর ব্যাখ্যা। আর মুজাহিদ (রহঃ) হতে অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে যে, সূর্য অস্ত যাওয়ার পর ব্যতীতالمساءবা সন্ধ্যা হবে না। অতএব উক্ত সময়ের জিকিরগুলো(أَمْسَيْنَا وَأَمْسَى الْمُلْكُ لِلّٰهِ) এরূপ হবে। ‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) এ অধ্যায়ের অধীনে উল্লেখিত জিকির-আযকার সম্পর্কে বলেনঃ আমি জানি যে, নিশ্চয় এ অধ্যায়টি অত্যন্ত ব্যাপক, এ অধ্যায়ের তুলনায় ব্যাপক কোন অধ্যায় কিতাবটি (মিশকাতুল মাসাবীহ)-তে নেই। আর আমি এ ব্যাপকতার মাঝেও সংক্ষিপ্তকরণের ক্ষেত্রে কিছু আলোচনা করব ইনশা-আল্ল-হ। সুতরাং যে তার সমস্ত ‘আমল (অধ্যায়ে উল্লেখিত সমস্ত জিকির-আযকার) করতে সক্ষম হবে এটা তার জন্য নিয়ামত, আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে অনুগ্রহ এবং তার জন্য সুখবর। আর যে সমস্ত জিকির-আযকার করতে অক্ষম, সে যেন সংক্ষিপ্তাকারে হলেও এ জিকির-আযকারগুলো করে, এমনকি একটি জিকির হলেও।অতঃপর ‘আল্লামা নাবাবী (রহঃ) সকাল-সন্ধ্যা, ইশরাক, সূর্য উদিত হওয়ার আগে এবং অস্ত যাওয়ার পরের জিকির, তাসবীহ ও দু‘আর নির্দেশ সংক্রান্ত কুরআনুল কারীমের আয়াতে কারীমাগুলো উল্লেখ করলেন।
ঘুমের আগে আত্মসমর্পণের দোয়া ও ডান কাতে শোয়া
মিশকাতুল মাসাবীহ : ২৩৮৫-[৫]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ২৩৮৫-[৫]
وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ: كَانَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ إِذَا أَوَى إِلٰى فِرَاشِه نَامَ عَلٰى شِقِّهِ الْأَيْمَنِ ثُمَّ قَالَ: «اَللّٰهُمَّ أَسْلَمْتُ نَفَسِىْ إِلَيْكَ وَوَجَّهْتُ وَجْهِىْ إِلَيْكَ وَفَوَّضْتُ أَمْرِىْ إِلَيْكَ وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِىْ إِلَيْكَ رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ اٰمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِىْ أَنْزَلْتَ وَنَبِيِّكَ الَّذِىْ أَرْسَلْتَ». وَقَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ: «مَنْ قَالَهُنَّ ثُمَّ مَاتَ تَحْتَ لَيْلَتِه مَاتَ عَلَى الْفِطْرَةِوَفِىْ رِوَايَةٍ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ لِرَجُلٍ: «يَا فُلَانُ إِذَا أَوَيْتَ إِلٰى فِرَاشِكَ فَتَوَضَّأْ وُضُوءَكَ لِلصَّلَاةِ ثُمَّ اضْطَجِعْ عَلٰى شِقِّكَ الْأَيْمَنِ ثُمَّ قُلْ: اَللّٰهُمَّ أَسْلَمْتُ نَفَسِىْ إِلَيْكَ إِلٰى قَوْلِه: أَرْسَلْتَ» وَقَالَ: «فَإِنْ مِتَّ مِنْ لَيْلَتِكَ مِتَّ عَلَى الْفِطْرَةِ وَإِنْ أَصْبَحْتَ أَصَبْتَ خَيْرًا». (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
বারা ইবনু ‘আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিছানায় ডান কাত হয়ে ঘুমাতেন। অতঃপর তিনি (ﷺ) বলতেন, ‘‘আল্ল-হুম্মা আস্লামতু নাফসী ইলায়কা ওয়া ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহী ইলায়কা ওয়া ফাও্ওয়াযতু আমরী ইলায়কা ওয়া আলজা’তু যহরী ইলায়কা রগবাতান ওয়া রহ্বাতান ইলায়কা লা- মালজাআ ওয়ালা- মানজা- মিনকা ইল্লা- ইলায়কা আ-মানতু বিকিতা-বিকাল্লাযী আনযালতা ওয়া নাবিয়্যিকাল্লাযী আরসালতা’’ (অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম, তোমার দিকে চেয়ে থাকলাম, আমার কাজ তোমার উপর সমর্পণ করলাম এবং ভয়ে ও আগ্রহ ভরে তোমার সাহায্যের উপর ভরসা করলাম। তুমি ছাড়া আর কারো কাছে আশ্রয় ও মুক্তি পাওয়ার কোন স্থান নেই। যে কিতাব তুমি অবতীর্ণ করেছ ও যে নবী তুমি পাঠিয়েছ, সম্পূর্ণরূপে আমি এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করি।)।অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি এ দোয়া পড়বে তারপর ঐ রাতেই মারা যাবে, সে ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ করবে। অন্য এক বর্ণনায় আছে, বর্ণনাকারী [বারা (রাঃ)] বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জনৈক ব্যক্তিকে বললেন, হে অমুক! তুমি বিছানায় ঘুমানোর সময় সালাতের ওজুর মতো ওজু করবে এবং ডান কাত হয়ে ঘুমাবে, অতঃপর বলবে, ‘‘আল্ল-হুম্মা আস্লামতু নাফসী ইলায়কা.....আরসালতা’’ (অর্থাৎ- ‘হে আল্লাহ! আমি আমার নিজেকে আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম ...... পাঠিয়েছ’ পর্যন্ত।) অতঃপর তিনি (ﷺ) বললেন, যদি তুমি এ রাতেই মৃত্যুবরণ করো, তাহলে ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ করবে। আর যদি ভোরে (জীবিত) ওঠো, তাহলে কল্যাণের উপর উঠবে।(বুখারী, মুসলিম)[১]
[১] সহীহ : বুখারী ২৪৭, ৭৪৮৮, ৬৩১৫, মুসলিম ২৭১০, তিরমিযী ৩৫৭৪, ইবনু আবী শায়বাহ্ ২৬৫২৬, আহমাদ ১৮৫১৫, শু‘আবূল ঈমান ৪৩৮১, ইবনু হিব্বান ৫৫৩৬, সহীহাহ্ ২৮৮৯, সহীহ আত্ তারগীব ৬০৩, সহীহ আল জামি‘ ২৭৬।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ২৩৮৫-[৫]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিছানায় যাওয়ার সময় ডান কাত হয়ে শোতেন এবং আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার দোয়া পড়তেন। দু‘আতে আছে—নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা, মুখ আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া, নিজের কাজ আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া এবং ভয় ও আশার সঙ্গে তাঁর আশ্রয় নেওয়া। এতে আরও আছে, আল্লাহ ছাড়া নিরাপদ আশ্রয় নেই এবং তাঁর অবতীর্ণ কিতাব ও প্রেরিত নবীর প্রতি ঈমানের ঘোষণা। অন্য বর্ণনায় ঘুমানোর আগে সালাতের ওযূর মতো ওযূ করার কথাও এসেছে। এই ঘুমের দোয়া বান্দাকে ঈমান, ভরসা ও আখিরাতের চিন্তা নিয়ে রাত কাটাতে শেখায়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- ঘুমানোর আগে ওযূ করা এবং ডান পাশে শোয়ার শিক্ষা এসেছে।
- নিজের কাজ আল্লাহর হাতে সমর্পণ করা ঈমানের সুন্দর প্রকাশ।
- আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের আশ্রয় নেই—এ কথা দোয়ায় স্মরণ করা হয়েছে।
- কিতাব ও নবীর প্রতি ঈমানের ঘোষণা দিয়ে রাত শেষ করা শেখানো হয়েছে।
