২৩/০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৫৩০-[১৭] - শির্কমুক্ত রুকইয়ার বিধান
চিকিৎসা ও মন্ত্র - প্রথম অনুচ্ছেদ
ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ)-এর মতে, চিকিৎসাশাস্ত্রের মৌলিক উদ্দেশ্য তিনটি। শারীরিক সুস্থতার সংরক্ষণ, দুর্ভোগ ও কষ্ট লাঘব এবং শরীর হতে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আলোচ্য অধ্যায়ে দু’ প্রকার চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে।প্রথমত শারীরিক চিকিৎসা, মূলত এটিই এখানে উদ্দেশ্য।দ্বিতীয়ত অন্তরের চিকিৎসা, যার মৌলিক উপাদান হচ্ছে নবী (ﷺ) কর্তৃক আনীত আল্লাহ তা‘আলার বাণী মহাগ্রন্থ আল কুরআন।শারীরিক ব্যাধির চিকিৎসার বিষয়টি হাদীসে বিভিন্নভাবে এসেছে যা ত্বিবিব নবী হিসেবে পরিচিত।অন্যদের থেকেও বর্ণিত হয়েছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়। শারীরিক ব্যাধির এ চিকিৎসা আবার দুই ধরনের। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে প্রাণীকুলের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত কিছু প্রাকৃতিক বিষয়, যেমন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা। অন্যটি চিন্তা-ভাবনা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য।ইসলামী শারী‘আর আলোকে চিকিৎসার আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে ঝাড়ফুঁক। যা বাস্তবসম্মত ও পরীক্ষিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। ইমাম বাযযার (রহিমাহুল্লাহ) ‘উরওয়াহ্ হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললাম, আপনি চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কীয় প্রচুর জ্ঞান কিভাবে অর্জন করলেন? তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিভিন্ন সময়ের ব্যাধিতে ‘আরব চিকিৎসকগণ তাঁর চিকিৎসার প্রাক্কালে আমি এ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছি।ইমাম সুয়ূত্বী (রহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে নবী (ﷺ) হতে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থও রচিত হয়েছে। চিকিৎসাশাস্ত্রের উৎপত্তি সম্পর্কে অনেক মতামত বিদিত রয়েছে। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ কথা হচ্ছে এ সম্পর্কিত কতক বিষয় নবীগণ ওয়াহীর মাধ্যমে অবগত হয়েছেন। তবে অধিকাংশ বিষয়ই অভিজ্ঞতালব্ধ।ইমাম বাযযার ও ত্ববারানী (রহিমাহুমাল্লাহ) ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস হতে বর্ণনা করেন যে, নবী (ﷺ) বলেনঃ সুলায়মান (আঃ) যখনই সালাতে দাঁড়াতেন তিনি তাঁর সম্মুখে একটি বৃক্ষ দেখতে পেতেন। তিনি বৃক্ষটিকে বলতেন, তোমার নাম কী? সেটি তার নাম উল্লেখ করলে, আবারো জিজ্ঞেস করতেন। তুমি কী জন্য? সেটি ঔষধি হলে তিনি তা লিখে রাখতেন ও পরে তা রোপণ করতেন।অত্র অধ্যায়ের সারমর্ম এই যে, প্রত্যেক মানুষের সুস্থতা ও অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ হতে লিখিত ভাগ্যলিপির অংশ। (মিরক্বাতুল মাফাতীহ)
শির্কমুক্ত রুকইয়া: ইসলামে ঝাড়ফুঁকের সীমা
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৪৫৩০-[১৭]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৪৫৩০-[১৭]
وَعَن عوفِ بن مَالك الْأَشْجَعِيّ قَالَ: كُنَّا نَرْقِي فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ كَيْفَ تَرَى فِي ذَلِكَ؟ فَقَالَ: «اعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لم يكن فِيهِ شرك». رَوَاهُ مُسلم
আওফ ইবনু মালিক আল-আশজাঈ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
জাহিলী যুগে আমরা মন্ত্র পড়ে ঝাড়ফুঁক করতাম। সুতরাং (ইসলাম গ্রহণের পর) আমরা জিজ্ঞেস করলাম : হে আল্লাহর রাসূল! এ সমস্ত মন্ত্র সম্পর্কে আপনার মতামত কি? তখন তিনি বললেন : আচ্ছা, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমাকে পড়ে শুনাও। (তবে কথা হলো) মন্ত্র দিয়ে ঝাড়ফুঁক করতে কোন আপত্তি নেই, যদি তার মধ্যে শির্কী কিছু না থাকে।
[১] সহীহ : মুসলিম (২২০০)-৬৪, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬০৯৪, আবূ দাঊদ ৩৮৮৬, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ ১০৬৬, আল মু‘জামুল আওসাত্ব ৩২৫৭, ‘ত্ববারানী’র আল মু‘জামুল কাবীর ১৪৫১৫, মুসতাদরাক হাকিম ৭৪৮৫, বায়হাক্বী’র কুবরা ২০০৮১, আস্ সুনানুল সুগরা ৪২৮৯, মা‘রিফাতুস্ সুনান লিল বায়হাক্বী ৫৯৫৪, আল জামি‘উস্ সগীর ১৯২৮, সহীহুল জামি‘ ১০৪৮।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৪৫৩০-[১৭]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে আউফ ইবনু মালিক আল-আশজাঈ (রা.) বলেন, তারা জাহিলী যুগে মন্ত্র পড়ে ঝাড়ফুঁক করতেন। ইসলাম গ্রহণের পর তারা নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর কাছে এর ব্যাপারে জানতে চান। তিনি বলেন, তোমাদের মন্ত্রগুলো আমাকে শুনাও। তারপর তিনি মূল নীতি জানিয়ে দেন—রুকইয়ায় কোনো আপত্তি নেই, যতক্ষণ তার মধ্যে শির্ক না থাকে। এই হাদিসটি রুকইয়ার বিষয়ে খুব স্পষ্ট সীমা দেয়। যে ঝাড়ফুঁকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ওপর ভরসা, শির্কী শব্দ বা ভুল বিশ্বাস থাকে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আর শির্কমুক্ত দোয়া ও বৈধ কথার মাধ্যমে রুকইয়া করা যায়। শির্কমুক্ত রুকইয়া, ইসলামে ঝাড়ফুঁক এবং রুকইয়ার শর্ত—এসব বিষয়ে এটি মূল হাদিসের মতো।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- রুকইয়া করার আগে তার কথাগুলো যাচাই করা দরকার।
- শির্কমুক্ত রুকইয়ায় হাদিসে আপত্তি করা হয়নি।
- জাহিলী যুগের সব পদ্ধতি অন্ধভাবে গ্রহণ করা যাবে না।
- উপকারের জন্য দোয়া হতে হবে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে।
