২৯/৮. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫৯৪৬-[৩] - আসহাবে সুফফাহ ও খাবারের বরকত
কারামাত সম্পর্কে বর্ণনা - প্রথম অনুচ্ছেদ
কারামাতশব্দের অর্থ সম্মানিত হওয়া, মর্যাদাবান হওয়া, মহৎ হওয়া ও উদার হওয়া। পরিভাষায় ঐ অলৌকিক কর্মকে কারামাত বলা হয় যা নেককার মু‘মিনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, কিন্তু তা নুবুওয়্যাতের দাবির সাথে হবে না এবং তার উদ্দেশ্য কাফির ও মুশরিকদের বিরোধিতা ও মোকাবেলায়ও হবে না। কেননা যে অলৌকিক কর্ম নুবুওয়্যাতের দাবীর সাথে হয় এবং তার উদ্দেশ্য কাফির ও মুশরিকদের বিরোধিতা ও মোকাবেলা হয়, তাকে মু‘জিযা বলা হয়।এর দ্বারা মু‘জিযাহ্ ও কারামাতের পার্থক্য গেল বুঝা গেল। ওয়ালীদের কারামাতসমূহ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নিকট প্রমাণিত। আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ‘আক্বীদাহ হলো ওয়ালীদের কারামাতের প্রতি ঈমান রাখা। আর তা সত্য। এটা এমন একটা বিষয় যা আল্লাহ তার কোন কোন বান্দাকে যখন দরকার তখন অথবা তার শত্রুদেরকে দেখানোর জন্য ও তাঁর দীনকে বিজয়ী করার জন্য দিয়ে থাকেন।উদাহরণস্বরূপ, যখন তাদের খাদ্য দরকার তখন খাবার দান, পিপাসিত হলে পানি দান; তারা জানে না যে, তা কোথা থেকে আসলো অথবা অনেক দূর থেকে খাবার আসা, এ জাতীয় অনেক কিছু সংঘটিত হওয়া। অথবা খাবারে বরকত হওয়া। এটা প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যভাবে হতে পারে। তবে সে আল্লাহর ওয়ালীকে অবশ্যই আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে। আর যদি সে লোক ইসলামী শারী‘আতের পাবন্দি না করে, তবে তাঁর কর্ম কারামাত বলে পরিগণিত হবে না।এটা তখন শয়তানের কর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে। আর তা শয়তানদের ফিতনাহ্। কারামাত প্রকাশিত হয় কেবল আল্লাহর মুমিন বান্দাদের নিকট থেকে। যারা আল্লাহর দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ও তাঁর শারী‘আতের অনুসারী বলে জানা যায়। এদের দ্বারা আল্লাহ যে বিশেষ কর্ম সম্পাদন করিয়ে নেন তাকে কারামাত বলে।(ইমাম ইবনু বায, নূরুন ‘আলাদ দারব, কওলু আহলিস্ সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আতি ফিল কারামাত)
আসহাবে সুফফাহ, মেহমানদারি ও খাবারের বরকত
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৫৯৪৬-[৩]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৫৯৪৬-[৩]
وَعَن عبد الرَّحْمَن بن أبي بكر إِنَّ أَصْحَابَ الصُّفَّةِ كَانُوا أُنَاسًا فَقُرَاءَ وَإِنَّ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ كَانَ عِنْده طَعَام اثْنَيْنِ فليذهب بثالث وَإِن كَانَ عِنْدَهُ طَعَامُ أَرْبَعَةٍ فَلْيَذْهَبْ بِخَامِسٍ أَوْ سادس» وَأَن أَبَا بكر جَاءَ بِثَلَاثَة فَانْطَلق النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَشَرَةٍ وَإِنَّ أَبَا بكر تعَشَّى عِنْد النبيِّ صلى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ لَبِثَ حَتَّى صُلِّيَتِ الْعِشَاءُ ثُمَّ رَجَعَ فَلَبِثَ حَتَّى تَعَشَّى النَّبِيُّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسلم فَجَاءَ بَعْدَ مَا مَضَى مِنَ اللَّيْلِ مَا شَاءَ الله.قَالَت لَهُ امْرَأَته: وَمَا حَبسك عَن أضيافك؟ قَالَ: أوما عَشَّيْتِيهِمْ؟ قَالَتْ: أَبَوْا حَتَّى تَجِيءَ فَغَضِبَ وَقَالَ: لَا أَطْعَمُهُ أَبَدًا فَحَلَفَتِ الْمَرْأَةُ أَنْ لَا تَطْعَمَهُ وَحَلَفَ الْأَضْيَافُ أَنْ لَا يَطْعَمُوهُ. قَالَ أَبُو بَكْرٍ: كَانَ هَذَا مِنَ الشَّيْطَانِ فَدَعَا بِالطَّعَامِ فَأَكَلَ وَأَكَلُوا فَجَعَلُوا لَا يَرْفَعُونَ لُقْمَةً إِلَّا رَبَتْ مِنْ أَسْفَلِهَا أَكْثَرَ مِنْهَا. فَقَالَ لِامْرَأَتِهِ: يَا أُخْتَ بَنِي فِرَاسٍ مَا هَذَا؟ قَالَتْ: وَقُرَّةِ عَيْنِي إِنَّهَا الْآنَ لَأَكْثَرُ مِنْهَا قَبْلَ ذَلِكَ بِثَلَاثِ مِرَارٍ فَأَكَلُوا وَبَعَثَ بِهَا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذُكِرَ أَنَّهُ أَكَلَ مِنْهَا. مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ وَذُكِرَ حَدِيثُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ: كُنَّا نَسْمَعُ تَسْبِيحَ الطَّعَام فِي «المعجزات» متفق علیہ ، رواہ البخاری (3581) و مسلم (176 / 2057)، (5365) 0 حدیث ابن مسعود تقدم (5910) ۔ (مُتَّفق عَلَيْهِ)
আবদুর রহমান ইবনু আবূ বাক্ সিদ্দীক্ব (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
আসহাবে সুফফাগণ ছিলেন দরিদ্র লোক। এজন্য নবী (ﷺ) বলেছেন : যার কাছে দু'জনের খাদ্য আছে, সে যেন তৃতীয় লোক হিসেবে (আসহাবে সুফফাহ্ হতে) একজনকে নিয়ে যায়। আর যার কাছে চারজনের খাদ্য আছে সে যেন পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ লোককে নিয়ে যায়। এটা শুনে আবূ বাক্ সিদ্দীক্ব (রাঃ) তিনজনকে এবং নবী (ﷺ) দশজনকে নিয়ে গেলেন। এদিকে আবূ বাক্ সিদ্দীক (রাঃ) নবী (ﷺ)-এর ঘরের রাত্রের খাবার গ্রহণ করে ঐখানেই দেরি করলেন। এমনকি ‘ইশার সালাত আদায়ের পর আবার তিনি নবী (ﷺ)-এর ওখানে ফিরে গেলেন এবং নবী (ﷺ) এর খাওয়া শেষ করা অবধি সেখানেই অবস্থান করলেন।তারপর অনেক রাত অতিবাহিত হওয়ার পরে তিনি বাড়ি ফিরলেন। তখন তাঁর স্ত্রী তাঁকে প্রশ্ন করলেন, তোমাকে তোমার মেহমান হতে কিসে আটকে রাখল? আবূ বাক্ সিদ্দীক্ব (রাঃ) বললেন, তুমি কি তাঁদেরকে রাতের খাবার দাওনি? স্ত্রী বললেন, তুমি না আসা পর্যন্ত তাঁরা খেতে অস্বীকার করেছে। এ কথা শুনে আবূ বাক্র সিদ্দীক্ব (রাঃ) রাগান্বিত হয়ে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো খাব না। তাঁর স্ত্রীও শপথ করলেন যে, তিনিও উক্ত খানা খাবেন না। এদিকে মেহমানগণও শপথ করে বললেন যে, তাঁরাও এ খানা খাবেন না।অতঃপর আবূ বাক্র সিদ্দীক্ব (রাঃ) বললেন, এটা (না খাওয়ার শপথ) শয়তানের তরফ হতে। এই বলে তিনি খাবার আনায়ে নিলেন, অতঃপর আবূ বাক্ সিদ্দীক্ব (রাঃ) খেলেন এবং তাঁরাও খেতে লাগলেন। তাঁরা যখনই কোন লোকমা উঠাতেন, তখন সাথে সাথেই তার নিচের দিক হতে ঐ পরিমাণ অপেক্ষা বেড়ে যেত। তখন আবূ বাক্ সিদ্দীক্ব (রাঃ) স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বললেন, হে বানী ফিরাস-এর ভগ্নি! এটা কি? তখন তিনি (আবূ বাক্ব (রাঃ)-এর স্ত্রী) বললেন, আমার চোখের প্রশান্তির কসম! নিঃসন্দেহে এগুলো আগের তুলনায় তিনগুণ অধিক হয়ে গেছে।অতঃপর তাঁরা সকলে খেলেন এবং খাবারের অবশিষ্টাংশ নবী (ﷺ)-এর জন্য পাঠিয়ে দিলেন। এ প্রসঙ্গে এটা বর্ণনা করা হয়েছে যে, নবী (ﷺ) তা হতে খেয়েছেন। (বুখারী মুসলিম) আর ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত كُنَّا نَسْمَعُ تَسْبِيحَ الطَّعَامِ “আমরা খাবারের তাসবীহ পাঠ করা শুনতাম” মু'জিযার অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
সহীহ: বুখারী: ৬০২, ৩৫৮১ মুসলিম ১৭৬-(২০৫৭), মুসনাদে বাযার ২২৬৩, হিলইয়াতুল আওলিয়া ১/৩৩৮, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম ১৪৯৮।
অনুবাদের উৎস
- প্রকাশক:
- হাদিস একাডেমী
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৫৯৪৬-[৩]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে আসহাবে সুফফাহর দরিদ্র অবস্থা এবং তাঁদের প্রতি নবী صلى الله عليه وسلم-এর যত্নের কথা এসেছে। নবী صلى الله عليه وسلم বললেন, যার কাছে দুজনের খাবার আছে, সে যেন তৃতীয় একজনকে নেয়; আর যার কাছে চারজনের খাবার আছে, সে যেন পঞ্চম বা ষষ্ঠ একজনকে নেয়। আবূ বাকর রাঃ তিনজনকে নিয়ে গেলেন, আর নবী صلى الله عليه وسلم দশজনকে নিয়ে গেলেন। পরে আবূ বাকর রাঃ দেরিতে বাড়ি ফিরলে মেহমানরা তাঁর অপেক্ষায় খাবার খায়নি। এক পর্যায়ে না খাওয়ার শপথকে তিনি শয়তানের দিক থেকে মনে করে খাবার আনালেন। তাঁরা যখন খেতে লাগলেন, খাবার কমার বদলে নিচ থেকে বেড়ে উঠতে লাগল। শেষে খাবার আগের চেয়ে বেশি হয়ে যায় এবং তা নবী صلى الله عليه وسلم-এর কাছে পাঠানো হয়। এই ঘটনা মেহমানদারি, দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো এবং খাবারের বরকতের শিক্ষা দেয়।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- নিজের খাবারে দরিদ্র ও মেহমানকে অংশ দেওয়া সুন্দর আমল।
- রাগের সময় করা ভুল সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা উচিত।
- খাবারের বরকত আল্লাহর পক্ষ থেকে আসতে পারে।
- নবী صلى الله عليه وسلم দরিদ্র সাহাবীদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতেন।
