১/৩. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৮১-[৩] - আদম-মূসার বিতর্ক ও তাকদীর
তাকদীরের প্রতি ঈমান - প্রথম অনুচ্ছেদ
ক্বদর (কদর) বা তাক্বদীর তাই, যা আল্লাহ ফায়সালা করেছেন এবং কোন বিষয়ে নির্দেশ জারী করেছেন।তাক্বদীরের প্রতি ঈমান আনার অর্থঃ এ বিশ্বাস রাখা যে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তা ভালো হোক আর মন্দ হোক, ক্ষতিকর হোক বা উপকারী হোক তা’ নির্ধারিত। এমনকি বান্দার কর্মকান্ড যার মধ্যে ঈমান আনা, কুফরী করা, আনুগত্য করা, অবাধ্য হওয়া, পথভ্রষ্ট হওয়া ও সৎ পথে চলা- সব কিছুই আল্লাহর ফায়সালা। এসব তাঁরই নির্ধারণ, ইচ্ছা, সৃষ্টি ও প্রভাবের ফল। তবে তিনি ঈমান আনয়নে ও তাঁর আনুগত্যে সন্তুষ্ট হন এবং এজন্য তিনি প্রতিদানের অঙ্গীকারও করেছেন।পক্ষান্তরে কুফরী ও অবাধ্যতায় সন্তুষ্ট হন না বরং এজন্য তিনি শাস্তির ভয়প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা সবকিছু নির্ধারণ করেছেন। অর্থাৎ- তিনি কোন কিছু অস্তিত্বে আনার আগেই তার পরিমাণ, অবস্থা ও তার অস্তিত্বে আসার কাল বা সময় সম্পর্কে অবহিত। অতঃপর তিনি তা অস্তিত্বে এনেছেন। অতএব উর্ধ্বজগতে বা অধঃজগতে আল্লাহ ব্যতীত কোন স্রষ্টা ও নির্ধারণকারী নেই। সবকিছুই তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা ও ইচ্ছানুযায়ী হয়। এতে সৃষ্টি জগতের কারো ইচ্ছা বা প্রভাব নেই।
আদম-মূসার বিতর্কে তাকদীরের শিক্ষা
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৮১-[৩]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৮১-[৩]
وَعَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ : احْتَجَّ اۤدَمُ وَمُوسى عِنْدَ رَبِّهِمَا فَحَجَّ اۤدَمُ مُوسى قَالَ أَنْتَ اۤدَمُ الَّذِي خَلَقَكَ اللّهُ بِيَدِه وَنَفَخَ فِيْكَ مِنْ رُوْحِه وَأَسْجَدَ لَكَ مَلَائِكَتَهٗ وَأَسْكَنَكَ فِي جَنَّتِه ثُمَّ أَهْبَطْتَ النَّاسَ بِخَطِيئَتِكَ إِلَى الْأَرْضِ قَالَ اۤدَمُ أَنْتَ مُوسَى الَّذِي اصْطَفَاكَ اللّهُ بِرِسَالَتِه وَبِكَلَامِه وَأَعْطَاكَ الْأَلْوَاحَ فِيْهَا تِبْيَانُ كُلِّ شَيْءٍ وَقَرَّبَكَ نَجِيًّا فَبِكَمْ وَجَدْتَ اللهَ كَتَبَ التَّوْرَاةَ قَبْلَ أَنْ أُخْلَقَ؟قَالَ مُوسى بِأَرْبَعِينَ عَامًا قَالَ اۤدَمُ فَهَلْ وَجَدْتَ فِيهَا ﴿وَعَصى ادَمُ رَبَّهٗ فَغَوى؟﴾ قَالَ : نَعَمْ. قَالَ أَفَتَلُومُنِيْ عَلى أَنْ عَمِلْتُ عَمَلًا كَتَبَهُ اللّهُ عَلَـيَّ أَنْ أَعْمَلَهٗ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَنِي بِأَرْبَعِينَ سَنَةً؟» قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ : فَحَجَّ اۤدَمُ مُوسى. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন : (আলমে আরওয়াহ্ বা রুহ জগতে) আদাম ও মূসা (আঃ) পরস্পর তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হলেন। এ তর্কে আদাম (আঃ) মূসার উপর জয়ী হলেন। মূসা (আঃ) বললেন, আপনি তো সে আদাম, যাঁকে আল্লাহ (বিনা পিতা-মাতায়) তাঁর নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার মধ্যে তাঁর রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। মালায়িকার দ্বারা আপনাকে সাজদাহ করিয়েছেন এবং আপনাকে তাঁর চিরস্থায়ী জান্নাতে স্থান করে দিয়েছিলেন। অতঃপর আপনি আপনার স্বীয় ত্রুটির কারণে মানবজাতিকে জমিনে নামিয়ে দিয়েছেন।আদাম (আঃ) (প্রত্যুত্তরে) বললেন, তুমি তো সে মূসা যাঁকে আল্লাহ তা’আলা নবূওয়াতের পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। তোমাকে তাওরাত দান করেছেন, যাতে সমস্ত বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে। অধিকন্তু তিনি তোমাকে গোপন কথা দ্বারাও নৈকট্য দান করেছেন। আল্লাহ আমার সৃষ্টির কত বছর পূর্বে তাওরাত লিখে রেখেছিলেন তুমি কি জান? মূসা (আঃ) বললেন,চল্লিশ বছর পূর্বে। তখন আদাম (আঃ) বললেন, তুমি কি তাওরাতে (এ শব্দগুলো লিখিত) পাওনিযে, আদাম তাঁর প্রতিপালকের নাফরমানী করেছে এবং পথভ্রষ্ট হয়েছে? (সূরা ত্ব-হা ২০ : ১২১)মূসা (আঃ) (উত্তর) দিলেন, হাঁ, পেয়েছি। তখন আদাম (আঃ) বললেন, তারপর তুমি আমাকে আমার আমলের জন্য তিরস্কার করছ কেন, যা আমার সৃষ্টিরও চল্লিশ বছর পূর্বে আল্লাহ আমার জন্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। রাসূল (ﷺ) বললেন, সুতরাং আদাম (আঃ) মূসা (আঃ)-এর উপর জয়ী হলেন। [১]
[১] সহীহ : মুসলিম ২৬৫২, বুখারী ৬৬১৪-তে সংক্ষিপ্তভাবে, আবূ দাঊদ ৪৭০১, তিরমিযী ২১৩৪, ইবনু মাজাহ ৮০, আহমাদ ৭৩৮৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১৮০, সহীহ আল জামি‘ ১৮৪। হাদীসটি ইমাম বুখারী (রহঃ) ও তাঁর সহীহুল বুখারীর পাঁচটি স্থানে কিছুটা সংক্ষিপ্ততা সহকারে বর্ণনা করেছেন। সম্ভবত এজন্যই লেখক হাদীসটিকে ইমাম মুসলিম (রহঃ)-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত বা সম্পৃক্ত করেছেন। যদিও সতর্কীকরণসহ সম্পৃক্ত করাই উত্তম।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৮১-[৩]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে আদম (আঃ) ও মূসা (আঃ)-এর তর্কের কথা এসেছে। মূসা (আঃ) আদম (আঃ)-কে তাঁর ভুলের কারণে মানবজাতির জমিনে আসার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। আদম (আঃ) জবাবে বলেন, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির চল্লিশ বছর আগে তাওরাতে এ বিষয় লিখে রেখেছিলেন। তাই তিনি বলেন, যে কাজ আল্লাহ আগে থেকেই লিখে রেখেছেন, সে বিষয়ে তাঁকে কেন তিরস্কার করা হচ্ছে। এখানে মূল শিক্ষা হলো তাকদীর বা আল্লাহর পূর্বলিখনকে বিশ্বাস করা। তবে হাদিসটি মানুষকে পাপের অজুহাত বানাতে বলে না; বরং এখানে নবীদের কথোপকথনের মাধ্যমে আল্লাহর জ্ঞান, লেখা ও সিদ্ধান্তের কথা বোঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) শেষে বলেছেন, আদম (আঃ) মূসা (আঃ)-এর উপর জয়ী হলেন।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- আল্লাহ মানুষের কাজ সম্পর্কে আগে থেকেই জানেন এবং লিখে রেখেছেন।
- তাকদীরের বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে নবীদের বর্ণনা থেকে শিক্ষা নিতে হয়।
- আদম (আঃ)-এর ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহর পূর্বলিখনের কথা স্পষ্ট হয়।
- মানুষের উচিত আল্লাহর জ্ঞান ও সিদ্ধান্তের সামনে বিনয়ী থাকা।
