১/৩. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৮২-[৪] - মাতৃগর্ভে তাকদীর লেখা
তাকদীরের প্রতি ঈমান - প্রথম অনুচ্ছেদ
ক্বদর (কদর) বা তাক্বদীর তাই, যা আল্লাহ ফায়সালা করেছেন এবং কোন বিষয়ে নির্দেশ জারী করেছেন।তাক্বদীরের প্রতি ঈমান আনার অর্থঃ এ বিশ্বাস রাখা যে, পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তা ভালো হোক আর মন্দ হোক, ক্ষতিকর হোক বা উপকারী হোক তা’ নির্ধারিত। এমনকি বান্দার কর্মকান্ড যার মধ্যে ঈমান আনা, কুফরী করা, আনুগত্য করা, অবাধ্য হওয়া, পথভ্রষ্ট হওয়া ও সৎ পথে চলা- সব কিছুই আল্লাহর ফায়সালা। এসব তাঁরই নির্ধারণ, ইচ্ছা, সৃষ্টি ও প্রভাবের ফল। তবে তিনি ঈমান আনয়নে ও তাঁর আনুগত্যে সন্তুষ্ট হন এবং এজন্য তিনি প্রতিদানের অঙ্গীকারও করেছেন।পক্ষান্তরে কুফরী ও অবাধ্যতায় সন্তুষ্ট হন না বরং এজন্য তিনি শাস্তির ভয়প্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা সবকিছু নির্ধারণ করেছেন। অর্থাৎ- তিনি কোন কিছু অস্তিত্বে আনার আগেই তার পরিমাণ, অবস্থা ও তার অস্তিত্বে আসার কাল বা সময় সম্পর্কে অবহিত। অতঃপর তিনি তা অস্তিত্বে এনেছেন। অতএব উর্ধ্বজগতে বা অধঃজগতে আল্লাহ ব্যতীত কোন স্রষ্টা ও নির্ধারণকারী নেই। সবকিছুই তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা ও ইচ্ছানুযায়ী হয়। এতে সৃষ্টি জগতের কারো ইচ্ছা বা প্রভাব নেই।
মাতৃগর্ভে তাকদীর লেখা ও শেষ আমলের শিক্ষা
মিশকাতুল মাসাবীহ : ৮২-[৪]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ৮২-[৪]
وَعَنِ ابْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ حَدَّثَنَا رَسُولُ اللهِ ﷺ وَهُوَ الصَّادِقُ الْمَصْدُوقُ : «إِنَّ خَلْقَ أَحَدِكُمْ يُجْمَعُ فِي بَطْنِ أُمِّه أَرْبَعِينَ يَوْمًا نُطْفَةً ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذلِكَ ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذلِكَ ثُمَّ يَبْعَثُ اللهُ إِلَيْهِ مَلَكًا بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ فَيَكْتُبُ عَمَلَهٗ وَرِزْقَهٗ وَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ ثُمَّ يَنْفُخُ فِيهِ الرُّوحَ فَوَالَّذِيْ لَا إِلهَ غَيْرُهٗ إِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ الْجَنَّةِ حَتّى مَا يَكُونُ بَيْنَهٗ وَبَيْنَهَا اِلَّا ذِرَاعٌ فَيَسْبِقُ عَلَيْهِ الْكِتَابُ فَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ النَّارِ فَيَدْخُلُهَا وَإِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَعْمَلُ بِعَمَلِ أَهْلِ النَّارِ حَتّى مَا يَكُونُ بَيْنَهٗ وَبَيْنَهَا اِلَّا ذِرَاعٌ فَيَسْبِقُ عَلَيْهِ الْكِتَابُ فَيَعْمَلُ بِعَمَلَ أَهْلِ الْجَنَّةِ فَيَدْخُلُهَا». مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
ইবনে মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
সত্যবাদী ও সত্যবাদী বলে স্বীকৃত আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন: তোমাদের প্রত্যেকেরই জন্ম হয় এভাবে যে, তার মায়ের পেটে (প্রথমে তার মূল উপাদান) শুক্ররূপে চল্লিশ দিন পর্যন্ত থাকে। অতঃপর তা চল্লিশ দিন পর্যন্ত লাল জমাট রক্তপিণ্ডরূপ ধারণ করে। তারপর পরবর্তী চল্লিশ দিনে মাংসপিণ্ডের রূপ ধারণ করে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা একজন মালাককে চারটি বিষয় লিখে দেয়ার জন্য পাঠান। সে মালাক লিখেন তার-(১) আমল [সে কি কি আমল করবে],(২) তার মৃত্যু,(৩) তার রিয্ক ও(৪) তার নেককার বা দুর্ভাগা হওয়ার বিষয় আল্লাহর হুকুমে তার তাকদীরে লিখে দেন, তারপর তন্মধ্যে রূহ্ প্রবেশ করান।অতঃপর সে সত্তার কসম, যিনি ব্যতীত প্রকৃত আর কোন ইলাহ নেই! তোমাদের মধ্যে কেউ জান্নাতবাসীদের আমল করতে থাকে, এমনকি তার ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, এমন সময় তার প্রতি তাকদীরের লিখা তার সামনে আসে। আর তখন সে জাহান্নামীদের কাজ করতে থাকে এবং জাহান্নামে প্রবেশ করে। তোমাদের কোন ব্যক্তি জাহান্নামীদের মত আমল করতে শুরু করে, এমনকি তার ও জাহান্নামের মধ্যে এক হাত দূরত্ব অবশিষ্ট থাকে। এমন সময় তার প্রতি সে লেখা (তাকদীর) সামনে আসে, তখন সে জান্নাতীদের কাজ করতে শুরু করে, ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। [১]
[১] সহীহ : বুখারী ৩২০৮, মুসলিম ২৬৪৩, আবূ দাঊদ ৪৭০৮, ইবনু মাজাহ ৭৬, তিরমিযী ২১৩৭, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১৭৪, আহমাদ ৩৯৩৪।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ৮২-[৪]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে মানুষের জন্মের ধাপ ও তাকদীর লেখার কথা এসেছে। রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) বলেছেন, মানুষ মাতৃগর্ভে প্রথমে চল্লিশ দিন শুক্ররূপে থাকে, এরপর একই সময় জমাট রক্ত, তারপর মাংসপিণ্ড হয়। এরপর আল্লাহ একজন মালাক পাঠান। তিনি মানুষের আমল, রিযক, মৃত্যু এবং সে সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগা—এসব লিখে দেন। তারপর রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়। হাদিসের শেষ অংশে শেষ আমলের গুরুত্বও এসেছে। কেউ জান্নাতীদের কাজ করতে করতে শেষ দিকে জাহান্নামীদের কাজ করতে পারে, আবার কেউ জাহান্নামীদের কাজ করতে করতে শেষে জান্নাতীদের কাজ করতে পারে। তাই তাকদীরের প্রতি ঈমান রাখার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত সঠিক পথে থাকার জন্য সতর্ক থাকা জরুরি।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- মানুষের সৃষ্টি আল্লাহর নির্ধারিত ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়।
- রিযক, মৃত্যু, আমল ও পরিণতি আল্লাহর নির্দেশে লেখা হয়।
- শেষ আমল মানুষের পরিণতির ক্ষেত্রে বড় বিষয়।
- ভালো আমলে অবিচল থাকা এবং খারাপ পথ থেকে ফিরে আসা দরকার।
