২/০. অধ্যায়ঃ
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ২১০-[১৩] - নেক কাজ চালুর সাওয়াব ও মন্দ রীতির গুনাহ
ইলম (বিদ্যা) - প্রথম অনুচ্ছেদ
‘ইলমের মর্যাদা এবং ‘ইলম অর্জন করা ও শিক্ষা দেয়ার মর্যাদা বিষয়ে যা কিছু ‘ইলমের সাথে সংশ্লিষ্ট তার বিবরণ, ভাষাগতভাবে ‘ইলম কি? এবং ‘ইলমের ফরয ও নফলের বিবরণ। এছাড়া ‘ইলমের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়, এখানে ‘ইলমের সারবস্ত্ত ও বাস্তবতার বিবরণ আনা হয়নি, কেননা সারবস্ত্ত কিতাবের বিষয় নয়। কিতাবুল ‘ইলম সকল কিতাবের কেন্দ্রবিন্দু। তাই এটিকেই অন্য সব কিতাবের পূর্বভাগে স্থান দেয়া হয়েছে।আবার এটিকে কিতাবুল ঈমান ও এতদসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় যেমন- তাক্বদীর, কবরের শাস্তি, কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূল (ﷺ)-কে আঁকড়ে ধরা কিংবা কুফর এবং ঈমানে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অন্যান্য বিষয়ের পূর্বে স্থান দেয়া হয়নি। কারণ শারী‘আতের দায়িত্ব পালনের যোগ্য ব্যক্তির জন্য সর্বপ্রথম ওয়াজিব এবং সর্বাধিক সম্মানিত বিষয় হচ্ছে ঈমান। এক্ষেত্রে ‘ইলম অন্বেষণকারীর জন্য উচিত হবে ইবনু জামা‘আরتذكرة السامع والمتعلمমৃঃ ৭৩৩ হিজরী, ইবনু ‘আবদুল বার-এরجامع بيان العلمমৃঃ ৪৬২ হিজরী এবং এ বিষয়ের আরো অন্যান্য কিতাব অধ্যয়ন করা।
নেক কাজ চালু করলে অন্যের সাওয়াবেও অংশ
মিশকাতুল মাসাবীহ : ২১০-[১৩]
মিশকাতুল মাসাবীহহাদিস নম্বর ২১০-[১৩]
وَعَنْ جَرِيْرٍ قَالَ كُنَّا فِي صَدْرِ النَّهَارِ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَجَاءَهُ قَوْمٌ عُرَاةٌ مُجْتَابِي النِّمَارِ أَوِ الْعَبَاءِ مُتَقَلِّدِي السُّيُوفِ عَامَّتُهُمْ مِنْ مُضَرَ بَلْ كُلُّهُمْ مِنْ مُضَرَ فَتَمَعَّرَ وَجْهُ رَسُولِ اللهِ ﷺ لِمَا رَأَى بِهِمْ مِنْ الْفَاقَةِ فَدَخَلَ ثُمَّ خَرَجَ فَأَمَرَ بِلَالًا فَأَذَّنَ وَأَقَامَ فَصَلّى ثُمَّ خَطَبَ فَقَالَ ﴿ياَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِىْ خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَّاحِدَةٍ إِلى اخِرِ الْايةِ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيْبًا﴾ وَالْايةَ الَّتِي فِي الْحَشْرِ ﴿اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ﴾ تَصَدَّقَ رَجُلٌ مِنْ دِينَارِه مِنْ دِرْهَمِه مِنْ ثَوْبِه مِنْ صَاعِ بُرِّه مِنْ صَاعِ تَمْرِه حَتّى قَالَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ قَالَ فَجَاءَ رَجُلٌ مِنْ الْأَنْصَارِ بِصُرَّةٍ كَادَتْ كَفُّه تَعْجِزُ عَنْهَا بَلْ قَدْ عَجَزَتْ قَالَ ثُمَّ تَتَابَعَ النَّاسُ حَتّى رَأَيْتُ كَوْمَيْنِ مِنْ طَعَامٍ وَثِيَابٍ حَتّى رَأَيْتُ وَجْهَ رَسُولِ اللهِ ﷺ يَتَهَلَّلُ كَأَنَّه مُذْهَبَةٌفَقَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَه أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَه مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْءٌ وَمَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِه مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْءٌ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ
জারীর ইবনু ‘আবদুল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
একদিন আমরা দিনের প্রথম বেলায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর নিকট ছিলাম। এমন সময় কাঁধে তরবারী ঝুলিয়ে একদল লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর কাছে এসে পৌঁছল। তাদের শরীর প্রায় উলঙ্গ, ‘আবা’ বা কালো ডোরা চাদর দিয়ে কোন রকমে শরীর ঢেকে রেখেছিল। তাদের অধিকাংশ লোক, বরং সকলেই ‘মুযার’ গোত্রের ছিল। তাদের চেহারায় ক্ষুধার লক্ষণ প্রকাশ পেতে দেখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল এবং তিনি খাবারের খোঁজে ঘরে প্রবেশ করলেন। তারপর কিছু না পেয়ে বেরিয়ে আসলেন এবং বিলাল (রাঃ) -কে (আযান ও ইক্বামাত দিতে) নির্দেশ করলেন। বিলাল (রাঃ) আযান ও ইক্বামাত দিলেন এবং সকলকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সালাত আদায় করলেন।অতঃপর তিনি (ﷺ) খুত্বাহ্ দিলেন এবং এ আয়াত পড়লেনঃ ياَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِىْ خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَّاحِدَةٍ إِلى اخِرِ الْايَةِ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيْبًا “হে মানুষেরা! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে একই ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি তা হতে জোড়া সৃষ্টি করেছেন, এরপর এ জোড়া হতে বহু নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেছেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা পরস্পর (নিজেদের অধিকার) দাবি করে থাক এবং আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে সতর্ক থাক। আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা আন্ নিসা ৪:১)অতঃপর রাসূল (ﷺ) সূরা আল্ হাশ্র-এর এ আয়াত পড়লেনঃ اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّমَتْ لِغَدٍ “হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের প্রত্যেকে ভেবে দেখুক আগামীকালের জন্য (ক্বিয়ামাতের জন্য) কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।” (সূরা আল হাশ্র ৫৯:১৮)(অতঃপর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ তোমাদের) প্রত্যেকেরই তাদের দীনার, দিরহাম, কাপড়-চোপড়, গম ও খেজুরের ভাণ্ডার হতে দান করা উচিত। অবশেষে তিনি বললেন, যদি খেজুর এক টুকরাও হয়। বর্ণনাকারী (জারীর) বলেন, এটা শুনে আনসারদের এক ব্যক্তি একটি থলে নিয়ে এলো, যা সে বহন করতে পারছিল না। অতঃপর লোকেরা একের পর এক জিনিসপত্র আনতে লাগল। এমনকি আমি দেখলাম, শস্যে ও কাপড়-চোপড়ে দুইটি স্তুপ হয়ে গেছে এবং দেখলাম, (আনন্দে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর চেহারা ঝকমক করছে, যেন তা স্বর্ণে জড়ানো।অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ইসলামে যে ব্যক্তি কোন নেক কাজ চালু করল সে এ চালু করার সওয়াব তো পাবেই, তার পরের লোকেরা যারা এ নেক কাজের উপর ‘আমাল করবে তাদেরও সম-পরিমাণ সওয়াব সে পাবে। অথচ এদের সওয়াব কিছু কমবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করল, তার জন্য তো এ কাজের গুনাহ আছেই। এরপর যারা এ মন্দ রীতির উপর ‘আমাল করবে তাদের জন্য গুনাহও তার ভাগে আসবে, অথচ এতে ‘আমালকারীদের গুনাহ কম করবে না। [১]
[১] সহীহ : মুসলিম ১০১৭।
মিশকাতুল মাসাবীহ হাদিস ২১০-[১৩]-এর সারসংক্ষেপ
এই হাদিসে দরিদ্র মুযার গোত্রের একদল মানুষের ঘটনা এসেছে। তাদের কষ্ট দেখে রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم-এর চেহারায় দুঃখ ফুটে ওঠে। তিনি সালাতের পর খুতবায় তাকওয়া, কিয়ামতের প্রস্তুতি এবং দানের আহ্বান জানান। তিনি দীনার, দিরহাম, কাপড়, গম, খেজুর—যা পারে তা দান করতে বলেন; এমনকি খেজুরের অর্ধেক হলেও। একজন আনসারী প্রথমে একটি ভারী থলে নিয়ে এলে অন্যরাও দান করতে থাকে। এতে খাদ্য ও কাপড়ের স্তুপ হয়ে যায় এবং রাসূল صلى الله عليه وسلم আনন্দিত হন। এরপর তিনি বলেন, ইসলামে যে ভালো রীতি চালু করে, সে তার সাওয়াব পায় এবং পরে যারা তা করবে তাদের সাওয়াবের সমপরিমাণ পায়। আর মন্দ রীতি চালু করলে তার গুনাহ এবং পরে অনুসরণকারীদের গুনাহের অংশ তার ওপর আসে।
এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা
- দরিদ্র ও অভাবী মানুষের কষ্ট দেখে সাহায্যে এগিয়ে আসা উচিত।
- অল্প দানও মূল্যবান হতে পারে, যদি আন্তরিকভাবে করা হয়।
- ভালো কাজ শুরু করলে অন্যরা উৎসাহ পেতে পারে।
- মন্দ রীতি চালু করার দায় নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
